‘একজন কিংবদন্তি অভিনেতাকে হারালাম’

এ টি এম শামসুজ্জামানকে স্মরণ সহশিল্পীদের
By শাহ আলম সাজু

কিংবদন্তি অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামান আজ সকালে মৃত্যুবরণ করেছেন। একুশে পদকে ভূষিত এই গুণী অভিনেতা সুদীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় অভিনয় সঙ্গে নিজেকে জড়িত রেখেছিলেন। অভিনয়ই ছিল তার জীবনের সবকিছু। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে পেয়েছিলেন অসংখ্য সহশিল্পী। এসব সহশিল্পীদের মাঝে তাকে স্মরণ করেছেন- প্রবীর মিত্র, আবুল হায়াত, ফারুক, সোহেল রানা, তারিক আনাম খান, সালাহউদ্দিন লাভলু।

probir.jpg
প্রবীর মিত্র। ছবি: স্টার

আমি বাকরুদ্ধ: প্রবীর মিত্র

আমার শরীরট ভালো নেই। তার মধ্যে প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুর খবর আরও বড় আঘাত দিয়ে গেল। এ টি এম শামসুজ্জামান ছিলেন আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। তাকে হারিয়ে আমি বাকরুদ্ধ। কিছুই বলতে পারছি না। প্রিয় বন্ধুকে হারিয়ে আরও একা হয়ে গেলাম। আমার ভেতরটা ভেঙে যাচ্ছে তার প্রয়াণের খবর শুনে। আমি যে কী হারলাম তা শুধু আমি অনুভব করতে পারছি।

faruq.jpg
আকবর হোসেন পাঠান ফারুক। ছবি: স্টার

আর কোনোদিন তাকে ফোন করা হবে না: ফারুক

এ টি এম শামসুজ্জামানের সঙ্গে কতটা মধুর সম্পর্ক ছিল তা এই ছোট্ট পরিসরে বলে শেষ করা যাবে না। অভিনয়ের প্রতি যে তার কতটা ভালোবাসা ও দরদ ছিল তা কেবল আমরা সহশিল্পীরাই জানি। অভিনয় পাগল একজন শিল্পী ছিলেন তিনি। আমি বলব, একজন জাত শিল্পী ছিলেন তিনি।

আমার জীবনের প্রথম সিনেমা জলছবি থেকে আমার সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার প্রতি আমার ভালোবাসা, সম্মান ছিল সীমাহীন। আমার অনেক সিনিয়র হলেও বন্ধুর মতো আচরণ করতেন। বড় ভাই-ছোট ভাইয়ের মতো সম্পর্ক ছিল আমাদের।

কত দিন, কত রাত, কত বছর একসঙ্গে সিনেমায় কাজ করেছি। কাজের বাইরে তিনি ভিন্ন মানুষ ছিলেন। অসম্ভব আমুদে ছিলেন, আড্ডা দিতে পছন্দ করতেন। আবার ক্যামেরার সামনে পুরাদস্তুর অভিনেতা।

সংসার ঠিক রেখে শিল্পের প্রতি শতভাগ প্রেম কারো থাকলে সেটা তার ছিল। সংসার ভালোবাসতেন আবার অভিনয়ও ভালোবাসতেন। দুই দিক ঠিক রেখে চলা সহজ কাজ নয়। কিন্তু, তিনি তা পেরেছিলেন।

অভিনেতা হিসেবে এদেশে বড় মাপের অনেকেই আছেন। আমি বলব-তিনি তার চেয়েও বড় মাপের অভিনেতা ছিলেন। তার তুলনা তিনি নিজেই।

আজ সকালবেলাও মনে করেছিলাম একটা ফোন করব। ফোনটা আর করা হলো না। আর কোনোদিনও তাকে ফোন করা হবে না।

hayat.jpg
আবুল হায়াত। ছবি: সংগৃহীত

একজন কিংবদন্তি অভিনেতাকে হারালাম: আবুল হায়াত

একজন প্রিয় অভিনেতাকে হারালাম, প্রিয় মানুষকে হারালাম। একজন রসিক মানুষকে হারালাম। একজন কিংবদন্তি অভিনেতাকে হারালাম। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে একজন ভালো মানুষকে হারালাম।

টেলিভিশনে লাল ফকির নাটকটি দেখে তার অভিনয়ের প্রতি আমার ভালোবাসা জন্মেছিল। তারপর তো কাজ করতে করতে একসময় পরিচয় এবং একসঙ্গে অনেক কাজও করেছিলাম আমরা। তার সঙ্গে আউটডোরে কাজ করা মানে ছিল আনন্দের মধ্যে থাকা। কখনো মন খারাপ করার মতো বিষয় কারও ভেতর থাকত না।

সিনেমায় যেমন নাম করেছেন, তেমনি নাটকেও। তাকে খোকন ভাই বলে ডাকতাম। কখনো খোকন দা ডাকতাম। খোকন ভাই আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেলেন। আর কোনোদিন তার মুখের সুন্দর হাসি দেখব না।

খোকন দা আপনি অনেক শান্তিতে থাকুন। মানুষ যেভাবে আপনাকে ভালোবেসেছে, সৃষ্টিকর্তা সেভাবে আপনাকে ভালোবাসা দেবেন- এটাই প্রার্থনা করি।

sohel rana.jpg
সোহেল রানা। ছবি: স্টার

খুব ভালো মানুষ ছিলেন: সোহেল রানা

এ টি এম শামসুজ্জামান শিল্পী হিসেবে যেমন ভালো ছিলেন, মানুষ হিসেবেও খুব ভালো ছিলেন। সেই যে স্বাধীনতার পর ওরা ১১ জন সিনেমা করতে গিয়ে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। তারপর তো একটা জীবনই একসঙ্গে, একই পথে পার করলাম।

শিল্পী অনেকেই, কিন্তু ভালো মানুষ সবাই না। খুব ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। আমাকে খুব পছন্দ করতেন। আমিও তাকে খুব পছন্দ করতাম। আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ। তার প্রতি সে কারণে আলাদা সম্মান ছিল।

তিনি সহজাত শিল্পী ছিলেন। যে কোনো চরিত্রের জন্য মানানসই ছিলেন। যদিও খল অভিনেতা হিসেবে বেশি পরিচিতি পেয়েছিলেন। আবার পজিটিভ চরিত্রে নিজেকে খুব সহজে মানিয়ে নিতেন। একজন বড় শিল্পীর এটাই বড় গুণ।

তিনি আজ চলে গেলেন। যেখানেই থাকুন, শান্তিতে থাকুন, আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন।

tariq.jpg
তারিক আনাম খান। ছবি: সংগৃহীত

আপনি আমাদের তারকা: তারিক আনাম খান

কখনোই বিদায় বলব না আপনাকে। আপনার মতো মানুষের বিদায় হয় না। আমরা যারা অভিনয় করি তাদের তারকা আপনি। অনুস্মরণীয়, অনুকরণীয় আপনি। আপনাকে দেখে শিখেছি। আপনাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছি। আপনার  স্নেহে ধন্য হয়েছি।

আপনি আমাদের সকলের হৃদয়ে থাকবেন। অভিনয় দিয়ে, ভালো ব্যবহার দিয়ে, ভালো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকবেন আমাদের সবার মাঝে।

আপনার অভিনয় কতটা মুগ্ধ হয়ে দেখতাম তা আমিই জানি। যতদিন বেঁচে থাকব আপনার অভিনয়ের প্রতি, আপনার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা  অব্যাহত থাকবে।

lovelu.jpg
সালাহউদ্দিন লাভলু। ছবি: স্টার

তার গুণের শেষ নেই: সালাহউদ্দিন লাভলু

ছোটবেলা থেকে তার অভিনয় দেখে বড় হয়েছি। কোনোদিন তার সঙ্গে পরিচয় হবে সেসব তো ছেলেবেলায় কল্পনাও করিনি। যাই হোক, অনেক পরে এসে সেই প্রিয় মানুষটির সঙ্গে শুধু পরিচয় হয়নি, সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।

আমার পরিচালিত অনেক নাটকে এ টি এম শামসুজ্জামান অভিনয় করেছিলেন। আমার পরিচালিত মোল্লাবাড়ির বউ সিনেমার গল্পও তার। অভিনয়ও করেছিলেন তিনি মোল্লাবাড়ির বউ সিনেমায়।

অভিনয়ের প্রতি কতটা ভালোবাসা ছিল তা আমি দেখেছি কাজ থেকে। শুধু স্ক্রিপ্ট পড়ার পরই তিনি বদলে যেতেন। ওই চরিত্রে নিজেকে ভাবতে শুরু করতেন। ক্যামেরার সামনে তিনি অন্য মানুষ ছিলেন।

আবার রসিকতাও করেছেন। ছোটদের প্রতি ভালোবাসা ছিল তার। বড়দেরও সম্মান করতেন। কখনো কারো বিরুদ্ধে কিছু বলতে শুনিনি। হাসি খুশি থাকতে পছন্দ করতেন।

আমার পরিচালনা জীবনে রঙের মানুষ ধারাবাহিকটি একটি বড় কাজ। এই নাটকজুড়ে ছিলেন তিনি। এখনো চোখে ভাসছে সেসব দৃশ্য। রঙের মানুষ নাটকটি যাদের কারণে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল তিনি তাদের অন্যতম।

একজন মানুষের ভেতরে এত গুণ থাকতে পারে তা কেবল এ টি এম শামসুজ্জামানকে দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম, জানতে পেরেছিলাম। তার গুণের শেষ নেই। আমি বলব, তিনি অনেক বড় মাপের শিল্পী ছিলেন। তার মতো শিল্পী সহজে আর পাওয়া যাবে না।

আরও পড়ুন: