বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: বিএনপি কেন ব্যর্থ বিদ্যুৎ নীতিতে ফিরছে?

কল্লোল মোস্তফা
কল্লোল মোস্তফা

বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ-জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বলেছিল, ক্যাপাসিটি চার্জসহ রেন্টাল ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক ব্যয় কমানো এবং স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা হবে। (বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার, পৃষ্ঠা ৩২)

নির্বাচনে জিতে সরকার গঠনের পরপর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দুই বছরের মধ্যে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছিলেন, ‘সরকার আপাতত বিদ্যুতের দাম বাড়াবে না। তার পরিবর্তে সিস্টেম লস কমাতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেছিলেন, ‘এখন বিদ্যুতের সিস্টেম লস হচ্ছে ৭ শতাংশের বেশি। এটি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারলে সরকারের সাশ্রয় হবে ১০ হাজার কোটি টাকা।’

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছিলেন, বিগত সরকারের সময় দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে, যার চাপ জনগণ বহন করেছে। জনগণের নির্বাচিত সরকার হিসেবে আমরা চাই, বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে কীভাবে সমস্যা সমাধান করা যায়, মানুষকে কষ্ট না দিয়ে কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

বাস্তবে দেখা গেল এসব প্রতিশ্রুতি দেওয়ার তিন মাস পার হতে না হতেই বিদ্যুতের দাম পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ ও গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি করা হলো।

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির এ সিদ্ধান্ত এমন একটি সময়ে নেওয়া হলো, যখন দীর্ঘ দিন ধরে চলতে থাকা মূল্যস্ফীতিতে দেশের মানুষ ব্যাপক চাপে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশের মূল্যস্ফীতি যখন ৫ শতাংশের নীচে, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি তখন ৯ শতাংশের আশপাশে থাকছে।

দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল নির্বাচিত সরকারের আমলে তারা উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই অভিশাপ থেকে রক্ষা পাবে। কিন্তু সরকার যেভাবে জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করলো, তাতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে।

ইতোমধ্যে দেড় মাসের ব্যবধানে সরকার দুই দফায় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করেছে, যার প্রভাবে পরিবহন খরচসহ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। এবার বাড়ানো হলো বিদ্যুতের দাম। এর ফলে গ্রাহককে একদিকে বিদ্যুৎ কিনতে বাড়তি খরচ করতে হবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে উৎপাদিত সব পণ্যের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সেগুলোর জন্যও বাড়তি মূল্য দিতে হবে।

এতে কৃষি, শিল্প, সেবাসহ সবখাতে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার দাম বাড়বে। এর প্রভাব বহুগুণে গোটা অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে মূল্যস্ফীতিতে এমনিতেই বিপর্যস্ত নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের জীবন আরও দুর্বিসহ হবে।

মূল্য বৃদ্ধির উদ্যোগের পেছনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিখাতে ভর্তুকি কমিয়ে সরকারি ব্যয়ের বোঝা কমানো ও আইএমএফের শর্ত পূরণের কথা আসছে। কিন্তু ভর্তুকি কমানোর জন্য মূল্যবৃদ্ধিই একমাত্র উপায় নয়। উৎপাদন খরচ কমিয়েও ভর্তুকি কমানো যায়। তাছাড়া এই ভর্তুকির অর্থ কোথায় যাচ্ছে, তার যৌক্তিকতা কতটুকু এই প্রশ্নেরও সুরাহা প্রয়োজন।

ভর্তুকি কমাতে হলে প্রথমে দেখতে হবে ভর্তুকি কেন দিতে হচ্ছে। ভর্তুকি দিতে হচ্ছে কারণ, আমদানিনির্ভর ও ব্যয়বহুল জ্বালানিভিত্তিক বেসরকারি মালিকানার বিদ্যুৎকেন্দ্র (আইপিপি) থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে পিডিবিকে। এই সমস্যাটি মধ্যপ্রাচ্য সংকটের আগেও ছিল, যুদ্ধের কারণে ভর্তুকির চাপ আগের চেয়ে আরও বেড়েছে কেবল।

ভর্তুকির অর্থের একটা বড় অংশ আবার ব্যয় হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জের পেছনে। জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার একটা বড় অংশ সারা বছর অব্যবহৃত থাকে। কিন্তু বিদ্যুৎ না কিনলেও চুক্তি অনুসারে বিদ্যুতের একক ক্রেতা হিসেবে পিডিবি কর্তৃক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ বা ভাড়া দিতে হয়।

প্রতি বছর বেসরকারিখাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এই ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণ এবং সেইসঙ্গে বেড়েছে পিডিবির লোকসান। আর সেই লোকসান কমানোর কথা বলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেড় দশকে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার ও খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু লোকসান ও ভর্তুকি কমেনি। বরং বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়েছে।

কাজেই ভর্তুকি কমানোর জন্য বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি কোনো টেকসই পথ নয়। টেকসই সমাধান করতে হলে উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে এই উৎপাদন খরচ কমাতে হলে বেসরকারিখাতের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার অসম চুক্তিগুলো সংশোধন করে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা কমাতে হবে।

এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তানের কথা বলা যেতে পারে। পাকিস্তানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানিখাতও উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ ও আমদানি করা ব্যয়বহুল জ্বালানি সমস্যায় জর্জরিত ছিল। দেশটি সম্প্রতি বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিয়ে এই সমস্যার সমাধানে উল্ল্যেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। পাকিস্তান সরকারের উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—

আইপিপির সঙ্গে চুক্তি বাতিল ও সংশোধন: সরকার পাঁচটি বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী আইপিপির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে এবং ১৬টি আইপিপির সঙ্গে চুক্তি সংশোধন করে টেক-অ্যান্ড-পে মডেলে রূপান্তর করেছে এবং ক্যাপাসিটি চার্জ কমিয়েছে।

ডলারের বদলে রূপিতে বিদ্যুতের দর নির্ধারণ: বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্রয় চুক্তি সংশোধন করে বিদ্যুতের মূল্য ডলারের বদলে রূপিতে রুপান্তর করেছে।

রিটার্ন অন ইকুইটি কমানো: রাষ্ট্রায়ত্ত্ব মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর রিটার্ন অন ইকুইটি বা বিনিয়োগের বিপরীতে আয়ের হার ৩০ শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।

এ জন্য পাকিস্তান সরকার আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বলেছে, তোমরা হয় বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি সংশোধনে রাজি হও, না হলে চুক্তি পুরোপুরি বাতিল করে দেব অথবা ফরেন্সিক অডিট করব। এতেই কাজ হয়েছে। শুধুমাত্র ১৪টি আইপিপির সঙ্গে চুক্তি সংশোধনের মাধ্যমে সর্বমোট ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি রূপি সাশ্রয় হয়েছে।

এ ছাড়া, দেশটি দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করে জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমিয়েছে। বিশেষ করে সোলার প্যানেল আমদানির ব্যয় হ্রাস ও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে সরকারি প্রণোদনা দেওয়ায় দেশটিতে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে।

২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সমপরিমাণ সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা গড়ে উঠেছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এলএনজির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় এ পর্যন্ত প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি এড়াতে সক্ষম হয়েছে পাকিস্তান।

বাংলাদেশেও আইপিপিগুলোর সঙ্গে চুক্তি বাতিল ও সংশোধন করে, চুক্তিগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জের বদলে ‘টেক অ্যান্ড পে’ মডেলে কনভার্ট করে, বিদ্যুতের দাম ডলারের বদলে টাকায় নির্ধারণ করে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বৃদ্ধি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ উল্ল্যেখযোগ্য মাত্রায় কমানো সম্ভব।

কিন্তু বিগত অন্তর্বর্তী সরকার সেরকম কিছু বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তবে বিগত আওয়ামী লীগ আমলে বিশেষ আইনে সম্পাদিত বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষের দিকে সেই কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।

কমিটির প্রতিবেদনে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছ থেকে বেশি দরে বিদ্যুৎক্রয় ও বসিয়ে বসিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার সমস্যার কথা তুলে ধরেছে।

কমিটি বলেছে, এসব চুক্তির মাধ্যমে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাজার দরের চেয়ে ৪০–৫০ শতাংশ বেশি এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৪৫ শতাংশ বেশি দরে বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আদানি থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট খরচ ৪-৫ টাকা বেশি পড়ছে। এর একটি অংশ কয়লার দাম হলেও বড় অংশ এসেছে একতরফা শর্ত, উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ, কর ও ঝুঁকি সরকারের ওপর চাপানোর কারণে।

কমিটির হিসাবে, দেশে প্রায় ৭ হাজার ৭০০ থেকে সাড়ে ৯ হাজার মেগাওয়াট অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে বছরে ৯০ কোটি থেকে ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার (১১ হাজার থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা) বাড়তি ব্যয় হচ্ছে।

এই সমস্যা সমাধানে কমিটির সুপারিশ হলো, যেসব চুক্তিতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেগুলো অবিলম্বে বাতিল করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। একইসঙ্গে উচ্চব্যয় ও বিদ্যুৎ কেনার অসম চুক্তিগুলোকে লক্ষ্যভিত্তিকভাবে পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে সংশোধন করতে হবে।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে বছরে পিডিবির আয় বাড়বে ১৪ হাজার কোটি টাকা। অথচ গত অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল ৪২ হাজার কোটি টাকা, যা প্রতি বছরই বাড়ছে। চুক্তি সংশোধন করে টেক অ্যান্ড পে মডেলে রূপান্তর করা হলে এই বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ খরচ কমানো সম্ভব।

কাজেই বিএনপি সরকারের উচিত ছিল দুর্নীতি ও অনিয়মে জর্জরিত চুক্তিগুলো বাতিল বা সংশোধনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমানো। কিন্তু সরকার সে পথে না গিয়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মতোই ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দিল। যা বিএনপি সরকার কর্তৃক বিগত আওয়ামীল লীগ সরকারের মতোই জনস্বার্থের চেয়ে বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ আর আইএমএফের শর্ত রক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নের ইঙ্গিত দিল।

 

কল্লোল মোস্তফা: প্রকৌশলী ও লেখক; তিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবেশ ও উন্নয়ন অর্থনীতি নিয়ে কাজ করেন।
kallol_mustafa@yahoo.com