আদিবাসী ধাত্রীবিদ্যা, জীবনদর্শন ও মহাবয়ানের ডাক
একদিকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর আর সামনে মেঘালয় পাহাড়, মাঝখানে এক প্রাচীন বানাই গ্রাম মোহনপুর। সুনামগঞ্জের মধ্যনগরের বংশীকুন্ডা ইউনিয়নের এ গ্রামের ধারেকাছে কোনো হাসপাতাল নেই। গ্রামের প্রবীণ ধাত্রীরাই সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে একমাত্র ভরসা।
বানাই ভাষায় ধাত্রীদের বলে ‘দাইমাও’। মোহনপুর গ্রামের বিখ্যাত দাইমাও শিবিলা বানাই (৮৫)। তার ধাত্রীবিদ্যার হাতেখড়ি দিদিমা চুইলতামণি বানাই ও সুকুমণি বানাইয়ের কাছে। নাকলা নিকনীর (গোত্র) শিবিলা এ পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশের বেশি নিরাপদ প্রসব করিয়েছেন। বানাই সমাজে দাইমাওয়েরা পবিত্র ও সম্মানিত। তারা একইসঙ্গে ভেষজচিকিৎসা এবং আধ্যাত্মিকতার অনুশীলন করেন। গর্ভের পরিবেশ থেকে পৃথিবীর পরিবেশে মানুষের সংযোগকে জটিল অভিজ্ঞতা ও প্রার্থনার ভেতর দিয়ে তারা সম্ভব করে তোলেন। কিন্তু বানাই সমাজেও দাইমাওদের কাজ কমছে, নতুন দাইমাও গড়ে উঠছে না।
এর কারণ বহুমুখী। নানাভাবে বলপ্রয়োগ, সাংস্কৃতিক হেজিমনি, ভূমি বেদখল আর কৃষিভিত্তিক উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন বানাই সমাজকে করুণভাবে ‘গরিব’ ও ‘অসহায়’ করে তুলেছে। গ্রামে কোনো কাজ নেই, জীবিকার খোঁজে মানুষ ছুটছে দিগ্বিদিক। এমনকি বন্দুকের নলের ডগায় জীবন বন্ধক রেখে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যাচ্ছে কয়লা ও পাথরখনিতে। অভাব, ক্ষীণ স্বাস্থ্য আর জাতিগত প্রান্তিকতার কারণে জারি থাকা ভয় ও শঙ্কার পরিবেশ বানাই সমাজে সন্তান নেওয়ার হারও কমছে। পৃথিবীর এক প্রাচীনবিদ্যা আর বিশ্ববীক্ষা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সিবিলাকেও কঠিন রক্তআগুন সামাল দিয়েই বেঁচে থাকার সংগ্রাম করতে হচ্ছে। রাষ্ট্র বা সমাজ শিবিলাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেয় না। নাগরিক তৎপরতা বা সংস্কারের তুমুল বিবাদ শিবিলাদের জ্ঞান, দর্শন কিংবা সংগ্রামকে ধারণ করে না।
কেবল শিবিলা নয়; দেশের আদিবাসী কিংবা বাঙালি, সব সমাজেই গ্রামীণ ধাত্রী ও লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যা ক্রমশ ভঙ্গুর, অস্বীকৃত, ক্ষতবিক্ষত ও নিশ্চিহ্নের পথে। অথচ পৃথিবী কীভাবে তাদের অবদান অস্বীকার করবে? এ বছর আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘জীবন ও কল্যাণ সুরক্ষায় আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান ও স্বীকৃতি’। আদিবাসী ধাত্রীদের বঞ্চনা ও অবদান, লোকায়ত জ্ঞান ও দর্শন নিয়ে চলতি আলাপটি হাজির হচ্ছে।
লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সুরক্ষা, আদিবাসী ধাত্রীদের স্বীকৃতি ও মর্যাদা, দেশের স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোয় তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং লোকায়ত জ্ঞানের পাশাপাশি গ্রামীণ ধাত্রীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, উপকরণ সরবরাহ ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি।
সর্বশেষ ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’ অনুযায়ী দেশে আদিবাসী জনসংখ্যা দেখানো হয়েছে ১৬ লাখ ৫০ হাজার ১৫৯ জন এবং জাতিসত্তা ৫০টি। এর ভেতর ঐতিহ্যগত বা সরকারি-বেসরকারিভাবে প্রশিক্ষিত ধাত্রীদের সংখ্যা কত আমাদের জানা নেই। গ্রামীণ ধাত্রী বা লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যা বিষয়ে রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান ও দলিলের শূণ্যতাকে সামনে নিয়েই দেশে প্রথমবারের মতো এই আলাপের বিস্তার ঘটছে।
শতজনমের সাক্ষী ও সাক্ষ্য
শতজনমের সাক্ষী হয়ে জীবনচক্রের সাক্ষ্য সমুন্নত রাখলেও আদিবাসী ধাত্রীবিদ্যা নিয়ে গবেষণা কাজ অপ্রতুল। ‘মিডওয়াইভস, ওম্যান অ্যান্ড দেয়ার ফ্যামিলি: অ্যা মৌরি গেজ’ (কেনি: ২০১১), ‘অ্যাবোরিজিনাল মিডওয়াফ: অ্যা মডেল ফর চেঞ্জ’ (স্কে: ২০১০), ‘রিক্লেইমিং বার্থ, হেলথ অ্যান্ড কমিউনিটি’ (২০০৭), ‘অথরাইজিং ট্র্যাডিশন: ভেক্টরস অব কানেকশন ইন হাইল্যান্ড মায়া মিডওয়াইফারি’ (হিনোজোসা: ২০০৪), ‘রিচ্যুয়ালস অ্যান্ড নলেজ অব অ্যান্ডিন মিডওয়াভস ইন ম্যাটারনাল অ্যান্ড নিওন্যাটাল কেয়ার’ (২০২৬)—আদিবাসী ধাত্রীবিদ্যা নিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগুলো দেখানোর চেষ্টা করেছে, ধাত্রীরা জন্মকে প্রকৃতির এক পবিত্র প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন। তারা ঐতিহ্যগত জ্ঞানের মাধ্যমে ভূমি, ভাষা, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে মানুষের সংযোগ তৈরি করেন।
আদিবাসীদের মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে কাজ হলেও লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যা নিয়ে বাংলাদেশে গবেষণা কাজের নজির কম। নাভিল ও হোসাইন (২০১৯) এক গবেষণায় সংক্ষেপে মধুপুরের মান্দি/গারোদের জন্মসংক্রান্ত আচারের কিছু বর্ণনা দিয়েছেন। আমিন ও খান (১৯৮৯) এবং মামুন ও অন্যান্যদের (২০২৫) গবেষণা গ্রামীণ ধাত্রীদের নিয়ে হলেও সেখানে লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যার বিজ্ঞান ও দর্শনের বিবরণ ছিল না।
বাংলাদেশের বঞ্চিত আদিবাসী ধাত্রীরা
বাঙালি সমাজে গ্রামীণ ধাত্রীরা সাধারণভাবে ‘দাই’ বা ‘দাই মা’ হিসেবে পরিচিত। জাতিগতভাবে ধাত্রীদের পরিচয় ও ধাত্রীবিদ্যার ধরণ ভিন্ন ভিন্ন। পার্বত্য চট্টগ্রামের বমদের ভেতর ধাত্রীরা ‘নাউ দমহ্’ নামে পরিচিত। ছোটমণি হিসেবে ছোট-ভাইবোনদের বোঝাতে ‘নাউ’ বলা হয়। দমহ্ মানে কোনো কিছু ধরা, ফা মানে সন্তান। ধাত্রীরাই প্রসবের সময় শিশুকে প্রথম ধরতে পারেন বলে এমন নাম। বান্দরবানের রুমার বেথেলপাড়ার বিখ্যাত নাউ দমহ্ রৌ সুম বমের ধাত্রীজীবনে এখনো কোনো অনিরাপদ প্রসবের ঘটনা ঘটেনি। তবে বিনা বিচারে আটক এবং কারাগারে প্রশ্নহীনভাবে মৃত্যু বম সমাজে সন্তান জন্মদান ও ধাত্রীবিদ্যার কাজকেও প্রভাবিত করেছে।
খুমিদের ভেতর ধাত্রীরা দুই নামে পরিচিত। ‘চা-ন-সিংনাই-নেউমপুই’ এবং ‘ডেউঙদি সাঙন্ডে’। বান্দরবানের রুমার প্রফুংম পাড়ার চিলিং খুমী ও থংবে খুমী বিখ্যাত খুমি ধাত্রী। লুসাই জনগোষ্ঠী ধাত্রীদের ডাকেন ‘নাউ দমতু’।
মারমা ভাষায় ধাত্রীকে বলে ‘ওয়াইব্যইং স্যেমা’। কিন্তু বান্দরবানের মারমারা তাদের আঞ্চলিক টোনে বলেন, ‘ওয়াইনেক ছা:রামা’। বান্দরবানের থানচির ডাকছৈ পাড়ার উনুমে মারমা ও বলিপাড়ার মা মুই চিং মারমা গুরুত্বপূর্ণ ধাত্রী।
মাতৃসূত্রীয় লেঙাম সমাজে ধাত্রীদের বলে ‘মাউ-মুন্নু’। যিনি মাকে চিহ্নিত করেন এবং প্রসবের মাধ্যমে মাধ্যমে কাউকে ‘মা’ করে তোলেন, তিনিই ‘মাউ-মুন্নু’। নেত্রকোণার কলমাকান্দার সন্যাসীপাড়ার চিনচিলি নংব্রেই ছিলেন এক অসাধারণ মাউ-মুন্নু।
মাতৃসূত্রীয় খাসিদের ভেতর ধাত্রীরা ‘কা নংপাইনখ্যা খুন’ নামে পরিচিত। মানে, যারা বাচ্চা প্রসব করান। কিন্তু আঞ্চলিক ওয়ার-সিনতেং ভাষায় ধাত্রীদের ‘সাতার’ ডাকা হয়। মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার ঝিমাই খাসি পুঞ্জির রানি মারলিয়া একজন খাসি ধাত্রী।
আরেক মাতৃসূত্রীয় মান্দি সমাজে ধাত্রীরা ‘খামাল’ বা সাংসারেক পুরোহিতের মর্যাদা পান। তাদের বলে ‘মিচিকসা খামাল’। টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনের ইদিলপুরের মিজি মৃ ছিলেন একজন বিখ্যাত মিচিকসা খামাল, যিনি মধুপুরে আনারস আবাদের প্রচলন ঘটিয়েছিলেন। ত্রিপুরারা ধাত্রীদের ডাকেন ‘গুমাচৌক বা গুমাচোক’। খাগড়াছড়ির গুইমারার ঠাকুরছড়ার রচনা রোয়াজা ও বাইল্যাছড়ির সুচিরোং ত্রিপুরা নামকরা গুমাচৌক।
উপকূলের রাখাইনদের ভেতর ধাত্রীদের বলে ‘ওয়াডেছ্রামা’। তারা সমাজে ‘এমিইগ্রীও’ বা বড়মা হিসেবে মর্যাদা পান। কারণ, ‘এ্যাসেই (নাড়ী)’ ছিন্ন করার অধিকার সমাজ কেবল তাদেরকেই দিয়েছে। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার তুলাতুলীপাড়ার শতবর্ষী সেমাচিং রাখাইন একজন অভিজ্ঞ ধাত্রী।
চাকমাদের ভেতর ধাত্রীদের বলে ‘অজা’। তঞ্চংগ্যারা বলেন ‘অসাপুরী’। রাঙ্গামাটির রাজস্থলীর গাইন্দা ইউনিয়নের তুলাছড়িপাড়ার দয়ামুগী তঞ্চংগ্যা ও ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের আততলীপাড়ার দিবি তঞ্চংগ্যা অসাপুরীর কাজ করেন।
সাঁওতালরা ধাত্রীকে বলেন ‘দৌরগিন বুডহি’। দিনাজপুরের পার্বতীপুরের বারকোণা গ্রামের মালতী হেমব্রম ও ঠাকুরগাঁও সদরের মাতৃগাঁওয়ের দুলহান টুডু অভিজ্ঞ ধাত্রী। মুন্ডারা ধাত্রীকে বলেন ‘ধাইয়ানী বা দাইয়ানি’। মুসহর সমাজে ধাত্রীরা ‘ধাইনি’ নামে পরিচিত। ঠাকুরগাঁও সদরে ফকদনপুরের ধাইনি লিলমনি ঋষি একইসঙ্গে একজন খোদনী (উল্কি আঁকিয়ে)।
লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যার বিজ্ঞান ও দর্শন
বাংলাদেশের প্রবীণ আদিবাসী ধাত্রীরা জানান, কেবল সন্তান প্রসব ও নিরাপদ মাতৃত্বের কাজ নয়, বরং ভূমি ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সংযোগ তৈরির এক আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক দায়িত্ব পালন করেন। একইসঙ্গে সমাজে মহাবয়ানের ডাক ও জীবনবীক্ষার প্রবাহ বংশপরম্পরায় জীবিত রাখেন। এ ক্ষেত্রে তাদের বহু রীতি ও কৃত্য পালন করতে হয়। সংরক্ষণ করতে হয় বহু উদ্ভিদ ও প্রাকৃতিক সম্পদ। মাতৃগর্ভ থেকে নাড়ি কাটার দায়িত্ব ঐতিহাসিকভাবে সমাজ তাদের দিয়েছে। এটি পেশা নয়, বরং এক গভীর জীবনদর্শন ও জটিল অনুশীলন।
দেখা গেছে, অধিকাংশ আদিবাসী সমাজে নাড়ি কাটার জন্য বিশেষ বাঁশ প্রজাতির তৈরি ছুরি বা ব্লেড ব্যবহৃত হয়। এর ভেতর দিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের প্রথম সাংস্কৃতিক সংযোগ ঘটে। হয়তো মানবসমাজ বুনোপ্রকৃতির ভেতর বাঁশকেই প্রথম গৃহপালিত করেছিল বলে সাংস্কৃতিক সভ্যতা বিকাশের সেই আদি স্মৃতির চিহ্ন বাঁশের ছুরির ভেতর দিয়ে আবারো মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া; মানুষ যাতে প্রকৃতির ঐতিহাসিক পরম্পরা থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ না করে এবং দায় ও দায়িত্ব সম্পর্কে সজাগ থাকে।
মারমা জনগোষ্ঠী এই বাঁশের ছুরিকে ‘ওয়াহ: কালাইসং’ বলেন। লেঙামরা বলেন ‘সাংসালি’, ত্রিপুরাদের ককবরক ভাষায় বলে ‘য়ান্থাল’, চাকমারা বলে ‘দুলুক’, তঞ্চংগ্যারা বলে ‘বাই-শ দুলুক’, মান্দিরা বলেন ‘ওয়ানি গানদেলেং’, মুন্ডারা বলে ‘পাতিক্ষুর’, বেদিয়া মাহাতোরা বলেন ‘চাঁচড়’ এবং সাঁওতালি ভাষায় বলে ‘ছৌইলৌঃ বা ছুনছুনি’। সাঁওতালদের ক্ষেত্রে বাঁশের তৈরি তীরের ফলা (অৗপড়ি) দিয়ে নাড়িকাটার এক আদি নিয়ম ছিল, যা পূর্বজনদের স্মৃতির সঙ্গে নতুন জন্মের এক পরিচয়পর্ব। এসব বাঁশের ছুরির ধরণ, প্রস্তুতপ্রণালি ও ব্যবহারে জাতিগত ভিন্নতা আছে। সব বাঁশ দিয়ে এটি বানানো হয় না। মাকলা, ডলু, পারবো বাঁশ দিয়ে সাধারণত তৈরি হয়। গ্রামে সংরক্ষিত পবিত্র বন বা থান থেকে এই বাঁশ সংগ্রহ করা হয়।
নবজাতকের মুখে বিশুদ্ধ পবিত্র পানি, মধু বা কখনো সাংস্কৃতিক পানীয়ের ফোঁটা দেওয়া হয়। নাভি ও কাটাস্থানে কাঁচা হলুদ, নিম, ছাই ও বিভিন্ন ভেষজের প্রলেপ দেওয়া হয়। অধিকাংশ সমাজে সন্তান জন্মের জন্য এক অস্থায়ী ‘আঁতুড়ঘর’ বানানো হয়। মূলত ধাত্রীরা কয়েকদিনের জন্য এই ঘরেই প্রসূতির সঙ্গে কাটান। এ সময় বিশেষ খাদ্য, স্বাস্থ্যগত পরিচর্যা, নিয়ম ও আচার অনুষ্ঠান পালিত হয়। বাচ্চা জন্মের পর সামাজিকভাবে কৃত্য-অনুষ্ঠান আয়োজনের ভেতর দিয়ে ধাত্রীদের বিদায় দেওয়া হয়। ঋতুভিত্তিক নানা স্বাস্থ্যগত বিধি যেমন আছে, তেমনি লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যায় মহামারি সামাল দেওয়ার বিধিও আছে।
কার্যকর নীতি ও অঙ্গীকার
‘উদ্ভিদ জাত সংরক্ষণ আইন (২০১৯)’ লোকায়ত জ্ঞানকে ‘চিরায়ত জ্ঞান’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ‘বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইনে (২০১৭)’ স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রাণবৈচিত্র্য বিষয়ক জ্ঞানের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন, স্বীকৃতি প্রদান ও জ্ঞান সংরক্ষণের অঙ্গীকার করা হয়েছে। ‘জাতীয় সংস্কৃতি নীতিতে (২০০৬)’ আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও সামাজিক সম্প্রীতি সুসংহত করা এবং ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনে (২০১০)’ তাদের সাংস্কৃতিক অধিকার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। লোকায়ত জ্ঞান ও সংস্কৃতি হিসেবে আদিবাসী ধাত্রীবিদ্যা এসব আইন ও নীতি দ্বারা সুরক্ষিত থাকার কথা।
জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে (২০১১) বলা হয়েছে, দরিদ্র, সামাজিকভাবে বঞ্চিত, অশিক্ষিত, প্রান্তিক, দূরবর্তীস্থানে বসবাসরত মানুষ, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, নারী, চা-শ্রমিক, কৃষিখাতে ও পশুপালনে নিয়োজিত মানুষ, কারখানা শ্রমিকেরা স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও কিছু কর্মসূচি তাদের জন্য বাস্তবায়ন হচ্ছে, কিন্তু সেগুলো তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে কার্যকরভাবে প্রবেশ করতে পারছে না।
সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় মাঠপর্যায় পর্যন্ত ধাত্রীবিদ্যায় দক্ষ জনশক্তি প্রদান এবং প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা আছে স্বাস্থ্যনীতিতে। কিন্তু আদিবাসীসহ গ্রামীণ লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যার সুরক্ষা এবং প্রথাগত ধাত্রীদের জীবন-বিকাশে কোনো সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার নেই। এ ক্ষেত্রে কার্যকর নীতিকাঠামোর পাশাপাশি ধাত্রীদের স্বীকৃতি ও লোকায়ত ধাত্রীবিদ্যা সুরক্ষা ও বিকাশে সমন্বিত তৎপরতা জরুরি।
পাভেল পার্থ: গবেষক ও লেখক
animistbangla@gmail.com