২০০৩ সালে সম্মান পাইনি, এখন যেখানেই যাচ্ছি সবাই সম্মান করছে: বাশার
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার বেশ চাপের মধ্যেই ছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজের আগে বাংলাদেশ দলের প্রস্তুতি খুব একটা ভালো ছিল না। ২০০৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম ও সবশেষ অস্ট্রেলিয়া সফরের মতো এবারও সাবেক এই অধিনায়ককে নানা দিক থেকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। তবে সবকিছুর জবাব খেলার মাঠে ক্রিকেটাররা দিয়েছেন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে।
গতকাল রোববার ডারউইন টেস্টের চতুর্থ দিনে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে বাংলাদেশ তুলে নিয়েছে ঐতিহাসিক এক জয়। এরপর ডারউইন থেকে মুঠোফোনে দ্য ডেইলি স্টারের সামসুল আরেফীন খানের সঙ্গে কথা বলেছেন বাশার। সাক্ষাৎকারের চুম্বকাংশ নিচে দেওয়া হলো:
দ্য ডেইলি স্টার (ডিএস): বাংলাদেশ প্রস্তুতি ম্যাচে খুব বাজেভাবে হেরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলতে নেমেছিল। ডারউইন টেস্ট শুরুর আগে ড্রেসিংরুমের পরিবেশ কেমন ছিল?
হাবিবুল বাশার: আমি একদম সততার সাথেই বলছি, জিম্বাবুয়েতে আমরা একটি বাজে টেস্ট ম্যাচ খেলেছিলাম এবং এখানে আসার পর প্র্যাকটিস ম্যাচটাও খুব খারাপ খেলেছি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমরা অনেক বেশি সমালোচনা ও নজরদারির মধ্যে ছিলাম। অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যম, দর্শক ও খেলোয়াড়রা সবাই বলছিল যে, অস্ট্রেলিয়া কেন বাংলাদেশের সাথে এই টেস্ট ম্যাচটা খেলছে।
২০০৩ সালে যখন আমরা এখানে সফরে এসেছিলাম, তখন কথা উঠেছিল যে ম্যাচটা একদিনেই শেষ করে দেওয়া উচিত। এবার ২৩ বছর পর যখন আসলাম, তখনও শুনছিলাম যে ম্যাচটি দুই দিনে শেষ হয়ে যাওয়া উচিত। তবে বাংলাদেশের আগের দলগুলোর সাথে এই দলের একটি বড় পার্থক্য হলো, এই দলটা নতুন কিছু প্রমাণ করতে চেয়েছিল। প্র্যাকটিস ম্যাচে খুব খারাপভাবে হারার পরও আমি দেখেছি, তারা অনেক কঠোর পরিশ্রম করেছে। প্র্যাকটিস ম্যাচের পর যে সময়টুকু ছিল, তখন সবাই নিজেদের প্রমাণ করার জন্য মরিয়া ছিল।
ডিএস: এই টেস্ট জয়কে কি আসলেই অঘটন বলার কোনো সুযোগ আছে?
বাশার: টেস্ট ক্রিকেটে আসলে অঘটন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটা ওয়ানডেতে হতে পারে। ভালো দলের জন্য টেস্টে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ সব সময়ই থাকে। এক নম্বর টেস্ট দল হিসেবে অস্ট্রেলিয়া এর আগে অনেকবার এমন অবস্থা থেকে ফিরে এসেছে। এই জায়গায় আমি আমাদের দলকেই কৃতিত্ব দিতে চাই। অস্ট্রেলিয়া বারবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু আমরা তাদেরকে ম্যাচে ফিরে আসার কোনো সুযোগ দিইনি। আমরা এই টেস্ট ম্যাচে এতই ভালো খেলেছি যে, তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সব পথ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। অস্ট্রেলিয়া অবশ্যই ভালো দল। কিন্তু আমি মনে করি, এই টেস্ট ম্যাচে আমরা তাদের চেয়েও ভালো খেলেছি।
এক কথায় বলতে গেলে, আমরা দুর্দান্ত খেলেছি। আপনি যত ভালো দলই হোন না কেন, মাঝে মাঝে স্বীকার করতে হয় যে, প্রতিপক্ষ আপনার চেয়ে ভালো খেলেছে। এখানে ব্যাপারটা ঠিক তেমন ছিল। অস্ট্রেলিয়া পূর্ণ শক্তির দল নিয়েই খেলেছে। তারা কাউকে বিশ্রাম দেয়নি। কন্ডিশনসহ সবকিছুই তাদের পক্ষে ছিল। তারপরও এই টেস্টে আমরা তাদের চেয়ে ভালো দল ছিলাম।
ডিএস: আমাদের দলে কোনো সুপারস্টার খেলোয়াড় নেই। বাংলাদেশের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন এবং এটি আপনার কাছে কতটা তৃপ্তিদায়ক?
বাশার: এই মুহূর্তে আমাদের অন্যতম সেরা টেস্ট বোলার নাহিদ রানাকে ছাড়াই আমরা এই ম্যাচটি খেলেছি। কিন্তু আপনারা কি তার অভাব অনুভব করেছেন? করেননি। কারণ যে তিনজন ফাস্ট বোলার খেলেছে, তারা সব সময় তাদের কাজটা ঠিকমতো করে গেছে। এটাই আসলে এই দলটার বিশেষত্ব। এখানে এমন কিছু অসাধারণ পারফরম্যান্স আছে, যা হয়তো অন্যদেরটা আড়াল করে দিয়েছে।
তানজিদ হাসান তামিম, মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদের পারফরম্যান্স দুর্দান্ত ছিল। কিন্তু আপনি নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুমিনুল হকের ব্যাটিং কিংবা মুশফিকুর রহিমের ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ ত্রিশ রানের ইনিংসটাও ভুলে যেতে পারবেন না। এর পাশাপাশি লেজের দিকের ব্যাটার ও ফাস্ট বোলারদের অবদানও অনস্বীকার্য।
এই টেস্ট ম্যাচটা আমরা জিতেছি সবার অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের কারণেই। হ্যাঁ, যদিও হাসান ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হয়েছে, তবে পুরো কৃতিত্ব আসলে সম্পূর্ণ দলের। সবাই সঠিক সময়ে নিজেদের অবদান রেখেছে।
ডিএস: ২০০৩ সালের ডারউইন আর ২০২৬ সালের ডারউইন— তখন আপনি খেলোয়াড় হিসেবে খেলেছিলেন, আর এবার প্রধান নির্বাচক হয়ে ফিরেছেন। দুইয়ের মধ্যে কী পার্থক্য দেখছেন?
বাশার: খেলোয়াড় হিসেবে খেললে চাপ অনেক কম থাকে, কিন্তু দলের অফিসিয়াল বা সিলেক্টর হিসেবে গেলে চাপ অনেক বেশি থাকে। গত চারদিন ধরে আমার মাথা ব্যথা। অনেক মানসিক চাপের কারণে কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে। খেলোয়াড় হিসেবে আমি কখনোই এতটা চাপে থাকতাম না।
তবে একটা বিশাল পার্থক্য আমি দেখতে পাচ্ছি। ২০০৩ সালে যখন আমরা এসেছিলাম, তখন এতটা সম্মান পাইনি। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে আমি যেখানেই যাচ্ছি, সবাই আমাকে সম্মান করছে। বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধিত্ব করতে এসে এখন সব জায়গা থেকে যে বিশাল সম্মান পাচ্ছি, এটাই সবচেয়ে বড় পার্থক্য। এখানে আসার আগে সংবাদ সম্মেলনে আমি বলেছিলাম যে, অস্ট্রেলিয়া থেকে আমি সম্মান নিয়ে ফিরতে চাই। আলহামদুলিল্লাহ, আমি সেটা খুব ভালোভাবেই পেয়েছি।
ডিএস: আমাদের সামনে সিরিজ জেতারও দারুণ সুযোগ রয়েছে। দ্বিতীয় টেস্টের ভেন্যু ম্যাকাইয়ের কন্ডিশন দুই দলের জন্যই অপরিচিত হবে।
বাশার: আমরা একটা টেস্ট ম্যাচ জিতেছি এবং খুব ভালো খেলেছি। তো আমাকে অন্তত আগামী দুটি দিন এই জয়টা উপভোগ করতে দিন। ম্যাকাইয়ের কন্ডিশন নিয়ে আমরা পরে কথা বলব (হাসি)।