সিরিজ জিতলেও আড়াল হচ্ছে না ডিআরএস ব্যবহারের অপরিপক্বতা
সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচের টি২০ সিরিজে ২-০ তে এগিয়ে সিরিজ নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু জয়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক পুরনো সমস্যা—ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম (ডিআরএস) ব্যবহারে অবিবেচকতা।
দুই ম্যাচেই দেখা গেছে ব্যাটিংয়ে মনোযোগের ঘাটতির পাশাপাশি ডিআরএস অপব্যবহার করে আফগানিস্তানকে একের পর এক সুযোগ করে দিয়েছেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা, যা দলকে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিতে ফেলেছে।
বিশেষ করে প্রথম ম্যাচটি ছিল প্রযুক্তি ব্যবহারে কীভাবে ভুল করা যায় তার এক নিখুঁত উদাহরণ। ১৫২ রানের লক্ষ্যে তাড়া করতে নেমে ১২তম ওভারে বিনা উইকেটে ১০৯ রানে এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ, তখন ফারিদ আহমেদের বলে এলবিডব্লিউয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিভিউ নেন পারভেজ হোসেন ইমন। খালি চোখেই মনে হচ্ছিলো তিনি একদম প্লাম্ব এলবিডব্লিউ। তবু কেন তিনি সেটা চ্যালেঞ্জ করেছিলেন বোঝা মুশকিল। বল ট্র্যাকিংয়ে দেখা যায়, তিনটি "রেড"—অর্থাৎ সিদ্ধান্ত একেবারেই পরিষ্কার।
কয়েক ওভার পর, যখন এক ঝটকায় হারিয়ে যায় বাংলাদেশের টপ অর্ডার, আসে সিরিজের সবচেয়ে অবাক করা মুহূর্ত। রশিদ খানের মুখোমুখি হয়ে শামীম হোসেন পেছনে সরে খেলতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হন একদম সোজা বলে। পরিস্কারই বোঝা যায় এলবিডব্লিউ। এই সিদ্ধান্তও চ্যালেঞ্জ করে রিভিউ হারান তিনি। তখন বাংলাদেশের প্রয়োজন মাত্র ৩৫ রান ৩২ বলে, হাতে ছিল পাঁচ উইকেট, আর ক্রিজে ছিলেন নুরুল হাসান সোহান—অর্থাৎ রিভিউ নিয়ে ঝুঁকি নেওয়ার কোনো কারণই ছিল না। মজার কথা হলো রিভিউ নিয়েও অপেক্ষায় ছিলেন না শামীম, বুঝতে পারছিলেন তিনি আউট। রিপ্লে চলাকালীন সময়েই অর্ধেকটা ডাগআউটের পথে হাঁটছিলেন—যা সিদ্ধান্তটিকে আরও রহস্যময় করে তোলে।
ফল যা হওয়ার তাই হলো—বল ট্র্যাকিংয়ে দেখা গেল, বল সোজা গিয়ে লাগত মিডল ও লেগ স্টাম্পে। শূন্য রানে ফেরেন শামীম, আর দল হারায় শেষ রিভিউটিও।
সেটার ফল তৎক্ষণাৎই ভোগ করতে হয়: পরের ওভারেই নুর আহমেদের বলে স্পষ্ট ইনসাইড এজ থাকা সত্ত্বেও এলবিডব্লিউ হন তানজিম হাসান সাকিব। রিভিউ না থাকায় তাকে ফিরতে হয় চ্যালেঞ্জ করতে না পেরে, আর ১৬তম ওভারে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ড তখন ১১৮/৬—ম্যাচ হঠাৎ করেই জটিল হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি কোনোরকমে জিতলেও শামীমের শেষ রিভিউটি নষ্ট করার সিদ্ধান্ত এক মারাত্মক ভুল হিসেবে থেকে যায়—যা সহজেই ম্যাচের ভাগ্য ঘুরিয়ে দিতে পারত।
এই প্রবণতা দ্বিতীয় টি২০তেও দেখা গেছে শুক্রবার। যেখানে ১৪৮ রানের লক্ষ্যে খেলতে গিয়ে আবারও ডিআরএস অপচয় করে বাংলাদেশ। চতুর্থ ওভারে আজমাতউল্লাহ ওমরজাইয়ের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে যান ইমন, ওমরজাইর ওভার দ্য উইকেটে করা ডেলিভারি একদম স্টাম্প বরাবর যাচ্ছিলো। কোন প্রয়োজন ছাড়াই রিভিউ নষ্ট করেন বাঁহাতি ওপেনার।
এরপর রশিদ খানের একদম সোজা বলে আউট হওয়ার পরও রিভিউ নেন অধিনায়ক জাকের আলি অনিক, দুই ম্যাচেই দেখা গেছে, শেষ ওভারের আগেই দুটি রিভিউ শেষ করে ফেলেছে বাংলাদেশ, তখনও হাতে ছিল অন্তত পাঁচ উইকেট।
এ ঘটনাগুলো সম্পর্কে সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমানে এনসিএল টি২০-তে বরিশাল বিভাগের কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল বলেন, 'আমরা এসব পরিস্থিতিতে অভ্যস্ত নই।' তিনি উল্লেখ করেন, দেশীয় ক্রিকেটে ডিআরএস না থাকায় খেলোয়াড়দের বিচার-বুদ্ধি উন্নত হওয়ার সুযোগ কম, 'যদি ঘরোয়া ম্যাচে রিভিউ থাকত, খেলোয়াড়দের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও বাড়ত।'
তিনি আরও বলেন, 'অনেক সময় ব্যাটসম্যানরা ভাবেন তারা আউট হননি, যদিও বাস্তবে হয়েছেন—যা আসে অভিজ্ঞতার ঘাটতি থেকে।'
আশরাফুল জোর দিয়ে বলেন, নিয়মিত টেলিভিশনে ম্যাচ দেখা এবং প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ খেলোয়াড়দের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করে, 'যখন তারা সেটা করে না, তখন ভুল জাজমেন্ট হয়, আর তারা বাস্তবতার বদলে আশার উপর নির্ভর করে।'
ডিআরএস মূলত আম্পায়ারের ভুল কমানোর জন্য তৈরি, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এটি এখন এক আয়না—যেখানে ফুটে ওঠে অপরিপক্বতা এবং চাপের মুহূর্তে স্থিরতার অভাব।