সাক্ষাৎকার

‘আমাদের ভেতর এক অনন্য শক্তি কাজ করছে’

আনিসুর রহমান
আনিসুর রহমান

১৪টি ম্যাচে জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার পর, গোয়ায় চলমান সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের মাঝপথে অধিনায়কত্ব এবং শুরুর একাদশে নিজের জায়গা—দুটিই হারিয়েছিলেন বাংলাদেশের ডিফেন্ডার আফঈদা খন্দকার। তবে নেপালের বিপক্ষে সেমিফাইনালে দলে ফিরে ২০ বছর বয়সী এই ফুটবলার মাঠের খেলায় এক শান্ত ও নিয়ন্ত্রিত পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন। তার এই দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন দলকে টানা তৃতীয়বারের মতো সাফ শিরোপা জয়ের থেকে মাত্র এক জয় দূরে নিয়ে গেছে। দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে আফঈদা দলে ফেরা, অধিনায়কত্ব বদল, দলের ফর্মের ঘাটতি, শিবিরের ভেতরের ব্যক্তিগত শোক সামলানো এবং শনিবারের ফাইনালে ভারতের মুখোমুখি হওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।

টানা তৃতীয়বারের মতো ফাইনাল নিশ্চিত করতে পেরে কতটা স্বস্তি পাচ্ছেন?

আফঈদা খন্দকার: ফাইনালে ওঠার পর থেকে এখন দলের ভেতর এক অনন্য শক্তি কাজ করছে। চাপটা অনেক বেশি ছিল; দুইবারের ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা যদি ফাইনালে উঠতে না পারত, তবে বিষয়টি কেমন দেখাত? আমাদের মূল লক্ষ্যই ছিল ফাইনালে নিজেদের জায়গা পাকা করা।

নেপাল বাধা পার করা নিশ্চয়ই বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে ৩-০ ব্যবধানে হারের পর এবং দলের ভেতরের ওই শোকাবহ পরিবেশের মধ্যে?

আফঈদা: এটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল। নেপাল গত দুই আসরের ফাইনালিস্ট এবং তারা বেশ অনুপ্রাণিত ছিল। আমাদের জন্য এটি ছিল জীবন-মরণ ম্যাচ। লড়াইটা হয়েছিল তীব্র—আমরা প্রথমে গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়েছিলাম, তারপর লড়াই করে ঘুরে দাঁড়িয়েছি এবং অতিরিক্ত সময়ে জয়সূচক গোলটি পেয়েছি। আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল আমাদের মানসিকতা।

ঠিক আগের দিনই শিউলি আজিমের মায়ের মৃত্যুর দুঃখজনক সংবাদটি এসেছিল, তাই আমরা মাঠে নেমেছিলাম আমাদের সম্মিলিত শোককে শক্তিতে রূপান্তর করার প্রত্যয় নিয়ে। ভাগ্যবশত, আমরা সেটি করতে পেরেছি।

শুরুর একাদশে ফেরার পর আপনার মনে কি এমন কোনো তাগিদ ছিল যে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে?

আফঈদা: হ্যাঁ, অবশ্যই। একজন খেলোয়াড় সবসময় তার সেরা ফর্মে থাকবে না; খারাপ সময় আসবেই এবং ভুল থেকে শেখার সুযোগ থাকবে। বুধবার যেহেতু আমি সুযোগ পেয়েছিলাম, তাই আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা ছিল আগের ভুলগুলো শুধরে নিয়ে আরও অনেক ভালো পারফরম্যান্স করার।

অতীতে আপনি রক্ষণভাগের এক নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ ছিলেন। গণমাধ্যমের এত চুলচেরা বিশ্লেষণের মধ্যে নিজেকে কি নতুন করে খোঁজার চেষ্টা করছেন?

আফঈদা: উত্থান-পতন সবার জীবনেই আসে। আমাদের দলে এমন অনেক খেলোয়াড় আছেন যারা ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলতে পারছেন না, কিন্তু তাদের নিয়ে এত আলোচনা হয় না। মনে হয় মানুষ শুধু আমাকে নিয়েই কথা বলে। আমি ফুটবলের সবকিছু জানি না; আমি এখনও শিখছি, ম্যাচ বাই ম্যাচ... আর শেখার তো কোনো শেষ নেই। আমার মনোযোগ কেবল আগের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি না করার দিকে। একদিনেই কেউ বড় খেলোয়াড় হতে পারে না।

ক্যাম্পে যাওয়ার আগে আপনি অধিনায়ক হিসেবে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছিলেন, কিন্তু টুর্নামেন্টে আপনার জায়গায় মারিয়া মান্ডাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো। আর্মব্যান্ড হারানোর পেছনে কোনো ক্ষোভ বা তিক্ততা কাজ করছে কি?

আফঈদা: না, অধিনায়কত্ব হারানোয় কোনো কষ্ট নেই। আমি আগে একজন খেলোয়াড়, সেটাই সবচেয়ে বড় বিষয়। কোচ দলের কল্যাণে যা ভালো মনে করেছেন, সেটাই করেছেন। পদবি একজনই পায়, কিন্তু মাঠের ১১ জন খেলোয়াড়কেই তাদের সেরাটা দিতে হয়। অধিনায়কত্ব আমার কাছে কখনোই বড় কোনো বিষয় ছিল না। দেশের জন্য ভালো খেলাটাই আমার প্রধান লক্ষ্য।

রক্ষণভাগকে মাঝে মাঝে বেশ ভুগতে দেখা গেছে, ফাইনালের আগে কোন কৌশলগত জায়গাগুলোতে দ্রুত নজর দেওয়া প্রয়োজন?

আফঈদা: ডিফেন্স যদি ২০টি বিপজ্জনক বলের মধ্যে ১৮টি আটকে দেয় আর ২টি বল থামাতে না পারে, তবে সবাই ডিফেন্ডার বা গোলকিপারকে দোষ দেয়। অথচ ফরোয়ার্ডরা যখন ২০টি সুযোগ পেয়ে ১৮টি মিস করে মাত্র ২টি গোল দেয়, তখন কেউ কিছু বলে না।

সত্যি বলতে, আমাদের রক্ষণভাগকে সুরক্ষিত রাখতে মিডফিল্ডের সবচেয়ে বেশি উন্নতি দরকার। ফরোয়ার্ডরা যখন সামনে থেকে কার্যকরভাবে প্রতিপক্ষকে চেপে ধরতে (প্রেস করতে) না পারে, তখন প্রতিপক্ষ দল খুব সহজেই বল বের করে নিয়ে আসে। ভারতের বিপক্ষে আমাদের মিডফিল্ড যদি খেলা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে কিংবা 'সেকেন্ড বল' দখল করতে না পারে, তবে তারা বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে এবং আমাদের রক্ষণভাগের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে।

বাংলাদেশ কেন আগের আসরগুলোর মতো এমন আধিপত্যশীল ফুটবল উপহার দিতে পারছে না?

আফঈদা: এটি হুবহু সেই পুরোনো দল নয় যা আগের টুর্নামেন্টগুলোতে খেলেছিল; দলে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। কিছুটা ঘাটতি থাকা স্বাভাবিক কারণ জুনিয়র খেলোয়াড়দের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে এবং তারা তাদের সাধ্যমতো সমর্থন জোগাচ্ছে। কোনো কারণে আমরা এখনও মাঠে আমাদের স্বাভাবিক ছন্দ খুঁজে পাইনি, তবে আমরা এখন সেসব পাশে সরিয়ে রেখে সম্পূর্ণভাবে ফাইনালের দিকে মনোযোগ দিচ্ছি।