বিরোধিতার মুখে পিছু হটলেন ইনফান্তিনো, ফিফার বিতর্কিত পরিকল্পনা বাতিল
বিশ্বকাপে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনাটি বিশ্বজুড়ে ফুটবল কর্মকর্তাদের তীব্র সমালোচনা ও বিরোধিতার মুখে পড়েছিল। এর জেরে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই বিতর্কিত পরিকল্পনাটি বাতিল করার কথা জানিয়েছেন।
শনিবার এক বিবৃতিতে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান ইনফান্তিনো বলেছেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য সব সময়ই একই ছিল এবং ভবিষ্যতেও তা থাকবে— ঐক্যবদ্ধ করা এবং উন্নতি সাধন করা। ফলস্বরূপ, এই প্রস্তাবটি আর সামনে এগোবে না।’
ফিফার সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোকে শক্তিশালী করার মাধ্যম হিসেবেই এই প্রকল্পের ভাবনা তৈরি হয়েছিল এবং কেবলমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন পেলেই এটি কার্যকর হতো উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘সবার মতামত মনোযোগ দিয়ে শোনার পর এটি পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, প্রকল্পটি এক ধরনের বিভাজন তৈরি করেছে। ফলে এটির প্রতি সমর্থনের মাত্রা যা-ই হোক না কেন, তা আর আমাদের শুরুতে ঠিক করা উদ্দেশ্যের পক্ষে নেই।’
গত মঙ্গলবার ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো সদস্য দেশগুলোর কাছে দেওয়া এক চিঠির মাধ্যমে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে একটি বাণিজ্যিক অঙ্গপ্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনাটি উন্মোচন করেন। বিশ্ব ফুটবলের বড় ইভেন্টগুলো পরিচালনার জন্য যার বাজারমূল্য ধরা হয় প্রায় ২০০০ কোটি ডলার। এই প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ (প্রায় ৪২০ কোটি ডলার) শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করাই ছিল ইনফান্তিনো ও ফিফার মূল লক্ষ্য।
এই শেয়ার বিক্রি ও বিনিয়োগকারী খোঁজার মূল দায়িত্বে রাখা হয়েছিল মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ‘থ্রাইভ ক্যাপিটাল’কে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা জশুয়া কুশনার হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই। এছাড়া, নতুন এই বাণিজ্যিক অঙ্গপ্রতিষ্ঠানটি গঠনের প্রক্রিয়ায় ফিফাকে সহায়তা করার কথা ছিল বিখ্যাত মার্কিন ব্যাংক ‘জেপি মরগান’কে।
ইনফান্তিনো চিঠিতে আরও জানিয়েছিলেন, সদস্য দেশগুলো এই প্রস্তাবে সায় দিলে মোট ১০০০ কোটি ডলারের একটি বিশাল তহবিল তৈরি হবে। সেক্ষেত্রে প্রতিটি সদস্য দেশ চার বছরের চক্রে মোট ৪ কোটি ডলার করে পাবে। এর মধ্যে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারিতেই ২ কোটি ডলার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। বাকি অর্থ ধাপে ধাপে দেওয়া হবে। বর্তমানে ফিফার প্রতিটি সদস্য চার বছরের চক্রে উন্নয়ন তহবিল হিসেবে পেয়ে থাকে ৮০ লাখ ডলার।
তবে ইনফান্তিনোর এই পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসার পরপরই ফুটবল বিশ্বে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতার অংশীদারিত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি হলে সংস্থাটির সব প্রতিযোগিতা বয়কট করার কঠোর সিদ্ধান্ত জানায় উয়েফা। তাদের প্রতি সংহতি জানিয়ে এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় কনকাকাফ আর এএফসিও।
উয়েফার স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, ফুটবল কিংবা বিশ্বকাপ কোনো বিক্রয়যোগ্য পণ্য নয়। তাছাড়া, এই খেলাটিকে ব্যবসার সামগ্রী বানানোর এমন একতরফা চেষ্টা বিশ্ব ফুটবলের সুশাসন ও কাঠামোর ওপর বড় আঘাত বলেও মত দেন বিশ্লেষকরা।
ফিফার ভেতরেও বড় ধরনের ফাটল ধরে। ২০২১ সাল থেকে ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার ভূমিকায় থাকা কার্লোস করদেইরো গতকাল শুক্রবার প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেন। বিশ্বকাপে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিকল্পনাকে তিনি কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ‘ফুটবলের ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখা’ বলেও অভিহিত করেন।
সমালোচনায় জর্জরিত ও চাপের মুখে থাকা ইনফান্তিনো জানিয়েছেন, ফুটবলের প্রসার অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তিনি এখন সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার দিকেই মনোযোগ দেবেন।
বিবৃতিতে তিনি আরও বলেছেন, ‘ফুটবলের প্রতি অভিন্ন স্বার্থের জায়গা থেকে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আবার এক জায়গায় নিয়ে আসাই আমার লক্ষ্য। সেই সঙ্গে সব জায়গায়, বিশেষ করে যেসব দেশে আমাদের সমর্থন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেখানে ফুটবলের প্রসার অব্যাহত রাখাও আমার উদ্দেশ্য।’