দেশের অর্থনীতিতে মহামারির ধাক্কা ধারণার চেয়েও বেশি
করোনাভাইরাস মহামারির তাণ্ডবের কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) চূড়ান্ত হিসাবে, গত তিন দশকের মধ্যে এটাই জিডিপির সর্বনিম্ন গতি।
সরকারের প্রাক্কলিত হিসাবের তুলনায় প্রবৃদ্ধির এই হার প্রায় দুই শতাংশ পয়েন্ট কম।
গত বছরের ২৬ মার্চ থেকে দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা বিধিনিষেধ উঠিয়ে নেওয়ার পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হওয়ার পাশাপাশি রেমিট্যান্সের অব্যাহত প্রবাহ ও রপ্তানি প্রক্রিয়া প্রত্যাবর্তনের ভেতর দিয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু হয়। চলতি বছরের মার্চে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় অভিঘাত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল।
যে কারণে মার্চ-এপ্রিলের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিবিএস সদ্য বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে সম্ভাব্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ধরেছে ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিবিএসের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বিষয়ক প্রাক্কলন বাস্তবতার কাছাকাছি ছিল। তবে, এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া বিধিনিষেধের জন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবার ধাক্কা খাওয়ার কারণে বিবিএসের চূড়ান্ত পর্যালোচনায় সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের ক্ষেত্রে এটা কমে আসতে পারে।
২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সংক্রান্ত বিবিএসের এই হিসাব আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসের কাছাকাছি।
আইএমএফ ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস ছিল ২ শতাংশ। আর সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের অনুমিত হিসাব ছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৫ থেকে ৬ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল।
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের ভাষ্য, জিডিপি প্রবৃদ্ধির এই তথ্য বিদ্যমান অর্থনৈতিক অবস্থার প্রতিফলন। তিনি বলেন, 'সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমনটা হয়নি। এটার জন্য বিবিএস সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। এমন তথ্যের জন্য পরিকল্পনামন্ত্রীও আমাদের হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ পাবেন।'
জাহিদ হোসেন আরও বলেন, '২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির নতুন তথ্য একটা ভারসাম্যের কথা বলছে।'
শিল্প ও সেবাখাত সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে মহামারির চূড়ান্ত অভিঘাত দেখা গেছে। বিপরীতে কৃষিখাতের প্রবৃদ্ধি মহামারির আগের তুলনায় বেড়েছে।
২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য জাহিদ হোসেন গ্রামীণ অর্থনীতির এই স্থিতিশীল অবস্থাকে কৃতিত্ব দেন।
২০২০ সালে বিশ্বের মুষ্টিমেয় কয়েকটি দেশের অর্থনীতি জিডিপি প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখতে পেরেছে।
শিল্প ও সেবাখাতে প্রবৃদ্ধির ডুবন্ত অবস্থা তুলে ধরে জাহিদ হোসেন বলেন, 'তা স্বত্বেও এই মহামারি আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়েছে।'
২০১৯-২০ অর্থবছরে শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধি আগের অর্থবছরের ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। পরবর্তী অর্থবছরে যা ৬ দশমিক ১২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
এদিকে, জিডিপির ৫১ শতাংশের জোগান দেওয়া সেবাখাতের প্রবৃদ্ধি ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে। এর আগের অর্থবছরের তুলনায় যা অর্ধেক।
বিবিএসের তথ্য বলছে, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে সেবাখাতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫৪ শতাংশে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমানের ভাষ্য, বিগত দুই অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির অনুমানের ক্ষেত্রে বিবিএস তার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রেখেছে।
সিপিডি ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল।
মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, 'এটা ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে অর্থনীতির প্রায় সবগুলো খাতের ওপর আঘাতের প্রতিফলন।' (ঈষৎ সংক্ষেপিত)
প্রতিবেদনটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মামুনুর রশীদ