ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধে পুতিনের ‘পোয়াবারো’?
জেনেভায় শান্তি আলোচনা চলার মধ্যে ইরানে অপ্রত্যাশিত হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
এরপর তেহরানের প্রতিশোধমূলক হামলায় জ্বলতে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের ধনী আরব দেশগুলো। পারস্য উপসাগরে কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোয় ইরানি বাহিনীর হামলার কারণে নৌ-চলাচল এখন বেশ সীমিত। সৃষ্টি হয়েছে জ্বালানি সংকট। বেড়েছে দামও। কুফল ভোগ করছে বিশ্ববাসী।
এমন পরিস্থিতিতেও দেখা যাচ্ছে ইরান যুদ্ধের ‘সুফল’ ঘরে তুলছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও ইরানের বন্ধু হিসেবে পরিচিত রাশিয়া। কারণ, বিশ্ববাজারে ইরান যুদ্ধের প্রভাব কমাতে এক বিশেষ নির্দেশনায় রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বিশ্লেষকরা বলছেন—ট্রাম্পের নতুন নির্দেশনায় চাঙা হচ্ছে অবরোধ-নিষেধাজ্ঞার চাপে থাকা রুশ অর্থনীতি। যেন মুচকি হাসি দিচ্ছেন রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন।
গত ১৩ মার্চ সংবাদ সাময়িকী নিউজউইক এক বিশ্লেষণের শিরোনাম করা হয়, ‘ইরান যুদ্ধের সুবিধা পাচ্ছেন পুতিন’।
এতে বলা হয়, ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য ইরান যুদ্ধ হয়ত একটা সুবিধাজনক সময়ে আসেনি। কেননা, ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান যুদ্ধ পাঁচ বছরে পড়েছে। বিশ্বমঞ্চে অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে মস্কো কোণঠাসা।
এমন বাস্তবতাতেও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত ক্রেমলিনের জন্য অপ্রত্যাশিত সুখবর বয়ে এনেছে।
সবচেয়ে বেশি সুবিধা আসছে অর্থনৈতিক দিক থেকে। ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত হলে এর প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক তেলের বাজারে। ইরান যুদ্ধেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের জ্বালানিশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর তেল-গ্যাস ক্ষেত্র ও সরবরাহ ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্ববাজারে সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেড়েছে তেল-গ্যাসের দাম।
এ দিকে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের এক নম্বর তেল উৎপাদনকারী দেশ হলেও এই ক্ষেত্রে রাশিয়ার অবস্থান তৃতীয়। তেল উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সৌদি আরবকে প্রায় প্রতিদিনই প্রতিবেশী ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক তেল বাজারে ‘ব্রাত্য’ হয়ে থাকা রাশিয়ার কদর বেড়েছে। ইউক্রেনে আগ্রাসনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত রাশিয়ার তেল ব্যবসা।
ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্যোগ নিতে হচ্ছে রুশ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে। পশ্চিমের দেশগুলোকে এখন দুটি যুদ্ধ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একটি ইউরোপে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ। অপরটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ।
ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমের দেশগুলোর সামরিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন ভাগ হয়ে যাচ্ছে। দুই যুদ্ধের কারণে শত্রু-মিত্র যেন মিলেমিশে একাকার।
ইউক্রেন যুদ্ধে ইরান পরাশক্তি রাশিয়াকে সমর্থন দিয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় বিধ্বস্ত ইরানের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে রাশিয়া। তেহরান-মস্কোর মধ্যে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও তুলনামূলক শক্তিশালী বলে প্রচার করছেন দেশ দুইটির শীর্ষ নেতারা।
সেই ইরানে হামলা চালানো যুক্তরাষ্ট্র এখন সহায়তার জন্য ইরানেরই ‘বন্ধু’ রাশিয়ার দিকেই হাত বাড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, বৈশ্বিক তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে রুশ তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার আশ্বাস দিয়েছেন খোদ ট্রাম্প।
নতুন তথ্য তুলে ধরে নিউজউইকের বিশ্লেষণটিতে আরও বলা হয়, গত দুই সপ্তাহে তেল বিক্রি করে রাশিয়া অন্তত ৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে।
শুধু তাই নয়, ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে পুতিন সরাসরি কথা বলছেন ট্রাম্পের সঙ্গে। বলা বাহুল্য, এর মাধ্যমে রুশ রাষ্ট্রপতি নিজের হাতকেই শক্তিশালী করছেন।
দীর্ঘ বছর কূটনৈতিক পরিসরে অনেকটাই ‘একঘরে’ পুতিন এখন বিশ্বমঞ্চে আচমকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন।
‘ইরান যুদ্ধের মূল বিজয়ী পুতিন’
গত ১০ মার্চ নিউইয়র্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘যে কারণে ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধে ভ্লাদিমির পুতিন মূল বিজয়ী হতে যাচ্ছেন’।
প্রতিবেদন অনুসারে—ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কস্তা ব্রাসেলসে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত নিয়ে রাষ্ট্রদূতদের বলেছেন, ‘জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় রাশিয়ার অর্থনীতিতে নতুন করে মুদ্রা ঢুকছে। এটি ইউক্রেন যুদ্ধে বাড়তি হাওয়া জোগাবে। অন্যদিকে, সামরিক সরঞ্জাম থেকেও আয় করছে ক্রেমলিন।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ক্রেমলিন হয়ত বন্ধু হারাতে যাচ্ছে। কিন্তু, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদে মস্কোর জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। কেননা, রাশিয়ার অর্থনীতি জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল।
‘তাই, এই যুদ্ধের একমাত্র বিজয়ী—রাশিয়া,’ মন্তব্য আন্তোনিও কস্তার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যুদ্ধের কারণে ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি সরে যাচ্ছে। এখন সবার চোখ মধ্যপ্রাচ্যে। শুধু তাই নয়, বিশ্বমঞ্চে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন পুতিন।
গত ১৩ মার্চ দ্য ইকোনোমিস্টের এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়, ‘ইরান যুদ্ধ থেকে ভ্লাদিমির পুতিন অপ্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছেন।’
এতে জানানো হয়—রাশিয়ার তেলবাহী জাহাজ ‘সারাহ’ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে নিরাপদে নোঙর করার জন্য এ বন্দর থেকে ও বন্দর ঘুরছিল। গত ৬ মার্চ আচমকা খবর এলো—রুশ তেলে ওপর নিষেধাজ্ঞা ৩০ দিনের জন্য তুলে নেওয়া হচ্ছে। ভীষণ অপ্রত্যাশিত ছিল সেই ঘোষণা—‘ঠিক যেন পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা’।
‘পুতিনের হাতে লটারি জেতার টাকা’
গত ৭ মার্চ সিএনএন এক প্রতিবেদনে সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়—মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোয় হামলার ক্ষেত্রে রাশিয়া গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে ইরানকে সহায়তা করছে।
এতে বলা হয়—ঘটনা নিয়ে কাজ করছেন এমন বেশ কয়েকজন ব্যক্তি জানাচ্ছেন যে রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা, মার্কিন জাহাজ ও যুদ্ধবিমানের অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য ইরানকে দিচ্ছে। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধে ইরানের পাশে থাকতে চায় মস্কো।
তাদের একজন সিএনএনকে বলেন, এসব তথ্যের মধ্যে থাকতে পারে অত্যাধুনিক রুশ উপগ্রহ থেকে তোলা ছবি।
এমন সহায়তার বিনিময়ে রাশিয়া কী পেয়েছে তা নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না, বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এ দিকে, গত ১২ মার্চ সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘যেভাবে ট্রাম্পের ইরাননীতি পুতিনের হাতে তুলে দিচ্ছে লটারি জেতার টাকা’।
এতে বলা হয়, প্রায় সিকি শতাব্দী ধরে ভ্লাদিমির পুতিন সম্প্রসারণবাদী নীতি মেনে চলছেন। তবুও মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বাস করেন যে, রুশ রাষ্ট্রপতি ইউক্রেনে শান্তি চান। যদিও, এমন কোনো নজির দেখা যাচ্ছে না।
রাশিয়া ইরানকে তথ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সহায়তা করছে বলে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তাতে বলা হচ্ছে, ঘটনা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে ট্রাম্পের শুরু করা যুদ্ধের ‘প্যাঁচে’ ট্রাম্প নিজেই পড়ে গেছেন। পুতিন হয়ে উঠছেন মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রথম বিজয়ী।
অর্থাৎ, ট্রাম্প জ্বালানির বাজারে ‘আগুন’ ধরিয়ে দিয়ে পুতিনকে সহায়তা করছেন।
পুলিৎজারবিজয়ী তেল বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল ইয়েরজিন সিএনএন-কে বলেন, ‘ভ্লাদিমির পুতিন লটারি জিতেছেন। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এর সবচেয়ে বেশি সুবিধা তিনি পাচ্ছেন। আরও সুবিধা হচ্ছে, রাশিয়ার ওপর থেকে তেল নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ঘোষণা।’
‘পুতিনের গোপন হাত’
ফিরে আসা যাক নিউজউইকের প্রতিবেদনটিতে। এতে আরও বলা হয়, ইরানের যুদ্ধ কৌশলে পুতিনের ‘গোপন হাতে’র কথা। অর্থাৎ, রুশ রাষ্ট্রপতি হয়ত নীরবে ইরান যুদ্ধের কলকাঠি নাড়ছেন।
এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিয়ালির বক্তব্য তুলে ধরা হয়। ইরাকের ইরবিলে একটি ব্রিটিশ ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন হামলার পর হিয়ালি বলেছিলেন, ‘ইরান যুদ্ধে রাশিয়ার গোপন হাত থাকলে আর অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।’
ড্রোনগুলো ভূপাতিত করা হয়েছিল বলে সেই হামলায় ব্রিটিশদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে পশ্চিমের সমরবিদরা মনে করছেন, সেই হামলায় ইরান যে কৌশল অবলম্বন করেছিল তা রাশিয়া প্রতিবেশী ইউক্রেনে অবলম্বন করছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়—এই কৌশলগত মিলের মাধ্যমে এটাও বোঝা যায় যে, তেহরান ও মস্কোর সামরিক সম্পর্ক গভীর। ইরান এক সময় শাহেদ ড্রোন দিয়ে রাশিয়াকে সহায়তা করেছিল। সেসব ড্রোন মস্কোকে ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যাপকহারে ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
এখন যদি মস্কো থেকে তেহরানে সহায়তা আসে তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এ ছাড়াও, ইরানি সেনারাও ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে থাকতে পারে।
গত ১০ মার্চ বিবিসির প্রখ্যাত সাংবাদিক স্টিভ রোজেনবার্গ সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ থেকে রাশিয়া কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুফল ঘরে তুলতে চাচ্ছে।’
তাই প্রশ্ন—ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধে কি পুতিনেরই ‘পোয়াবারো’?







