মাহমুদউল্লাহর ফিফটিতে মন্থর উইকেটে লড়াইয়ের পুঁজি
বরাবরের মতো মন্থর উইকেটে শুরুতেই বিপাকে পড়া বাংলাদেশ তৃতীয় উইকেট জুটিতে পেল আশার আলো। তবে সাকিব আল হাসানের বিদায়ে ফের শুরু হলো নিয়মিত বিরতিতে উইকেটের পতন। অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ অবশ্য এক প্রান্ত আগলে রাখলেন। ক্রিজে লম্বা সময় থেকে ফিফটি তুলে নিয়ে তিনি দলকে লড়াইয়ের পুঁজি দেওয়ার পর ইনিংসের শেষ তিন বলে হ্যাটট্রিক পূরণ করলেন নাথান এলিস। অভিষেক টি-টোয়েন্টি খেলতে নামা অস্ট্রেলিয়ার এই পেসার গড়লেন রেকর্ড।
শুক্রবার মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে সিরিজের তৃতীয় টি-টোয়েন্টিতে টস জিতে আগে ব্যাট করে ৯ উইকেটে ১২৭ রান তুলেছে বাংলাদেশ। মাহমুদউল্লাহ ক্যারিয়ারের পঞ্চম ফিফটি তুলে নিয়ে ৫৩ বলে করেন ৫২ রান। তার ইনিংসে চার ৪টি। অজিদের হয়ে এলিস ৩৪ রানে ৩ উইকেট নিয়ে সবচেয়ে সফল। অভিষেক টি-টোয়েন্টিতে হ্যাটট্রিক করা প্রথম ক্রিকেটার তিনি।
পাঁচ ম্যাচ সিরিজে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। ফলে দুই ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ জয়ের দারুণ সুযোগ রয়েছে তাদের সামনে। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়াকে সিরিজে ফিরতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে।
বৃষ্টির পর সাধারণত টস জেতা দল আগে নিয়ে থাকে বোলিং। কারণ, বোলাররা শুরুতে কিছুটা সুবিধা পেয়ে থাকেন। তবে মাহমুদউল্লাহ বেছে নেন ব্যাটিং। তার সিদ্ধান্ত আরও প্রশ্ন তৈরি করে যখন দলীয় ৩ রানের মধ্যে বিদায় নেন বাংলাদেশের দুই ওপেনার।
আগের দুই ম্যাচে শুরুতে পেসার ব্যবহার করেছিল অজিরা। এদিন বল তুলে দেওয়া হয় অনিয়মিত স্পিনার অ্যাশটন টার্নারের হাতে। পঞ্চম বলেই সাফল্য পেতে পারতেন তিনি।
মোমেন্টামে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন সৌম্য সরকার। বল তার থাই প্যাডে লেগে জমা পড়ে উইকেটরক্ষক ম্যাথু ওয়েডের গ্লাভসে। কিন্তু স্টাম্প ভাঙতে অনেক সময় নিয়ে ফেলেন অজি অধিনায়ক। ততক্ষণে ক্রিজে ঢুকে যান সৌম্য। পরের বলে আবারও জীবন পান তিনি। স্কয়ার লেগে তার কঠিন ক্যাচ হাতে জমাতে পারেননি অ্যালেক্স ক্যারি।
দ্বিতীয় ওভারের শেষ বলে অবশ্য উল্লাসে মাতে অস্ট্রেলিয়া। পেসার জশ হ্যাজেলউডের কিছুটা ফুল লেংথের দুর্দান্ত ডেলিভারিটি বাংলাদেশের আরেক ওপেনার নাঈম শেখের ব্যাট ছুঁয়ে জমা পড়ে ওয়েডের হাতে। ২ বল খেলে তার সংগ্রহ ১ রান।
সিরিজ জুড়ে রানখরায় ভুগতে থাকা সৌম্য টিকতে পারেননি বেশিক্ষণ। পরের ওভারে আক্রমণে এসেই তাকে এলবিডাব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলেন লেগ স্পিনার অ্যাডাম জাম্পা। রিভিউ নিলেও আম্পায়ার্স কল হওয়ায় বাঁচতে পারেননি তিনি। সুইপ করার চেষ্টায় তার অস্বস্তিপূর্ণ ইনিংস শেষ হয় ১১ বলে ২ রানে।
তৃতীয় উইকেট জুটিতে চাপ সামলে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই শুরু হয়। বাংলাদেশের ইনিংসের প্রথম বাউন্ডারি আসে পঞ্চম ওভারে। বাঁহাতি স্পিনার অ্যাশটন অ্যাগারকে পয়েন্ট ও কভার পয়েন্টের মাঝ দিয়ে চার মারেন তিনে নামা সাকিব।
পাওয়ার প্লে শেষে স্বাগতিকদের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২ উইকেটে মোটে ২৮ রান। প্রতিপক্ষের ফিল্ডিংয়ের বাধ্যবাধকতা কাজে লাগাতে পারেনি তারা। এসময়ে আসে মাত্র দুটি বাউন্ডারি। দুটিই মারেন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান সাকিব।
অষ্টম ওভারে মিচেল মার্শ খান বেধড়ক পিটুনি। মাহমুদউল্লাহ তাকে লং অন ও ডিপ মিডউইকেটের মধ্য দিয়ে সীমানাছাড়া করার পর আরও দুটি চার মারেন সাকিব। ওই ওভারে সবমিলিয়ে আসে ১৫ রান।
কিন্তু সাকিবের রানের চাকায় দম দেওয়ার প্রচেষ্টা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আক্রমণে ফেরা জাম্পাকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে তিনি তালুবন্দি হন অ্যাগারের। লং অফ থেকে ডানদিকে দৌড়ে দারুণ একটি ক্যাচ নেন তিনি। তাতে থামে ৩৬ বলে ৪৪ রানের জুটি। সাকিবের সম্ভাবনাময় ইনিংসের ইতি ঘটে ২৬ রানে। তার ১৭ বলের ইনিংসে চার ৪টি।
এরপর আফিফকে সঙ্গী হিসেবে পান মাহমুদউল্লাহ। জমে যায় তাদের রসায়ন। আগের ম্যাচের জয়ের নায়ক আফিফ ডিপ মিডউইকেট দিয়ে অ্যাগারকে ছক্কা মেরে বুঝিয়ে দেন ছন্দে থাকার কথা।
২২ বলে ২৯ রানের এই জুটি থামে অনাকাঙ্ক্ষিত রানআউটে। বল সামনে ঠেলেই ঝুঁকি নিয়ে রানের জন্য দৌড় দিয়েছিলেন আফিফ। কিন্তু তার চেয়েও দ্রুততায় সরাসরি থ্রোতে স্টাম্প ভেঙে দেন ক্যারি। ১৩ বলে ১টি করে চার ও ছয়ে আফিফের রান ১৯।
ছয়ে নামা শামিম পাটোয়ারী ডট বল খেলে খেলে চাপে পড়ে গিয়েছিলেন। সেটা হালকা করতে গিয়ে আগ্রাসী শটে টাইমিংয়ে গড়বড় করে ফেলেন। দারুণ বল করা হ্যাজেলউডের দ্বিতীয় শিকার হন তিনি। বেন ম্যাকডারমটের ক্যাচ হওয়ার আগে ৮ বলে তার রান ৩।
নুরুল হাসান সোহানও কাটা পড়েন রানআউটে। দ্রুত সিঙ্গেল নিতে চেয়েছিলেন স্ট্রাইকে থাকা মাহমুদউল্লাহ। কিন্তু অপর প্রান্তে থাকা সোহান দৌড় শুরু করতে দেরি করে ফেলেন। মোজেজ হেনরিকস অনেকটা সময় নিয়ে নিশানা ঠিক করে সরাসরি থ্রোতে বল স্টাম্পে লাগান। ১টি ছক্কায় সোহানের রান ৫ বলে ১১।
১৭তম ওভারে বাংলাদেশের দলীয় সংগ্রহ পেরিয়ে যায় শতরান। শেষদিকে রান তোলার গতিও বাড়ান মাহমুদউল্লাহ। এক পর্যায়ে, ৩৮ বলে ৩০ রানে থাকা এই ব্যাটসম্যান ফিফটিতে পৌঁছান ৫২ বলে। শেষ ওভারের তৃতীয় বলে এলিসকে স্কয়ার দিয়ে চার মেরে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরের পর প্রথমবারের মতো এই সংস্করণে হাফসেঞ্চুরির স্বাদ পান তিনি।
পরের বলেই অবশ্য কুপোকাত হন মাহমুদউল্লাহ। এলিসের ফুল লেংথের ডেলিভারিতে উপড়ে যায় তার স্টাম্প। ওই ওভারের পঞ্চম বলে ডিপ মিডউইকেটে ক্যাচ দিয়ে গোল্ডেন ডাকের স্বাদ নেন মোস্তাফিজুর রহমান। তারপর শেখ মেহেদী হাসান শর্ট বল ওড়াতে গিয়ে অ্যাগারের ক্যাচ হলে উল্লাসে ফেটে পড়ে অস্ট্রেলিয়া দল। হ্যাটট্রিক করে এলিস ঢুকে পড়েন রেকর্ড বইতে।
সফরকারী অজিদের শেষটা ভালো হলেও এই উইকেটে ১২৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করে জেতা খুবই কঠিন।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ: ২০ ওভারে ১২৭/৯ (নাঈম ১, সৌম্য ২, সাকিব ২৬, মাহমুদউল্লাহ ৫২, আফিফ ১৯, শামিম ৩, সোহান ১১, শেখ মেহেদী ৬, মোস্তাফিজ ০, শরিফুল ০*; টার্নার ০/২, হ্যাজেলউড ২/১৬, জাম্পা ২/২৪, অ্যাগার ০/২৩, এলিস ৩/৩৪, মার্শ ০/১৫, ক্রিস্টিয়ান ০/৯)।