বিশ্লেষণ

জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম ‘পকেট কাটছে’ যেভাবে

স্টার অনলাইন ডেস্ক

রমজান, ঈদুল ফিতর আর পহেলা বৈশাখ—টানা কয়েকটি বড় উৎসবে কেনাকাটার পর সাধারণ মানুষের পকেট এখন প্রায় শূন্য। ধকল কাটিয়ে যখন সবাই একটু গুছিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা' হয়ে এসেছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির খবর।

সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা ও পেট্রোলের দাম ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করেছে।

নতুন দাম কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই বাজারে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। একই দিনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে দেশে সরাসরি পণ্য উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। এর ফলে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের পাশাপাশি দেশে উৎপাদিত চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে। এই বাড়তি খরচের বোঝা গিয়ে চাপছে সাধারণ ভোক্তাদের কাঁধে।

মূলত গত তিন বছর ধরে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির চাপে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। একটি ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই আসছে আরেকটি। মানুষের আয়ের তুলনায় ব্যয়ের বোঝা এতটাই ভারী হয়েছে যে, জীবনযাত্রার মান ধরে রাখাই প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিস্থিতি কতটা সংকটজনক তার একটা ধারণা পাওয়া যাচ্ছে পরিসংখ্যান থেকেও। মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৯ শতাংশ। মানুষের আয় কাগজে-কলমে কিছুটা বাড়লেও ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেই চলেছে।

যাতায়াত ও পরিবহন ব্যয়ে ঊর্ধ্বগতি

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে। বাস ও লঞ্চ ভাড়ার পাশাপাশি উবার-পাঠাওয়ের মতো রাইড শেয়ারিং সেবার খরচও অনেকটা বেড়ে যায়। এর প্রভাবে রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকরাও পাল্লা দিয়ে ভাড়া বাড়িয়ে দেন। ফলে সাধারণ কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।

দ্রব্যমূল্যে তেলের প্রভাব

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। কলকারখানায় উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি কাঁচামাল সংগ্রহের খরচও বেড়ে যায়। অন্যদিকে, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় খামার থেকে কাঁচাবাজার কিংবা কারখানা থেকে খুচরা দোকান—প্রতিটি স্তরেই পণ্যের দাম ধাপে ধাপে বাড়ে। এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় শাকসবজি থেকে শুরু করে ভারী শিল্পজাত পণ্য, সব কিছু কিনতেই ভোক্তাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়।

বাসা ভাড়া ও জীবনযাত্রার খরচ

বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পাশাপাশি বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের দাম বাড়লে বাড়িওয়ালারাও বাসাভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ খোঁজেন। একইসঙ্গে অন্যান্য সেবামূল্যও বৃদ্ধি পায়। সব মিলিয়ে সীমিত আয়ের মানুষের জন্য জীবনধারণ কষ্টসাধ্য হয়।

বাড়তি ডেলিভারি চার্জ

অনলাইনে খাবার বা নিত্যপণ্য অর্ডার করলে কিছুটা বেশি খরচ গুনতে হয়। এই বাড়তি খরচ যায় ডেলিভারি চার্জে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় মোটরসাইকেল বা অন্যান্য ডেলিভারি যানবাহনের জ্বালানি খরচ বেড়ে গেছে। ফলে ই-কমার্স এবং ফুড ডেলিভারি প্রতিষ্ঠানগুলো ডেলিভারি চার্জ বাড়িয়ে দেবে। 

ধরা যাক, আগে একটি অর্ডারে ডেলিভারি চার্জ ছিল ৫০-৮০ টাকা। এখন তা বেড়ে ৮০-১০০ টাকা বা তার বেশি হতে পারে। মাসে যদি আপনি ১০ বার অনলাইন থেকে কিছু অর্ডার করেন, তবে কেবল ডেলিভারি চার্জ বাবদই আপনার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে খরচ বেড়ে যেতে পারে।

বাইরে খাওয়ার খরচ 

পরিবার বা পরিজন নিয়ে মাসে কয়েকবার রেস্তোরাঁ বা ফাস্টফুডের দোকানে খাওয়ার যে অভ্যাস, তাতে এখন লাগাম টানতে হতে পারে। রেস্তোরাঁগুলোতে সাধারণত এলপিজি গ্যাস ব্যবহার করা হয়, যার দাম বাড়লে খাবারের দামও স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। ফলে আগের চেয়ে একই মানের খাবারে এখন অনেক বেশি বিল গুনতে হতে পারে।

ঋণে নিয়ে দুশ্চিন্তা

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে যখন সবকিছুর দাম বাড়তে থাকে, তখন সীমিত আয়ের মানুষের জন্য সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। মাস শেষে যেখানে কিছু টাকা হাতে থাকার কথা, সেখানে এখন খরচের হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হয়। এর ফলে অনেককেই ধারদেনা করে চলতে হয়, যা সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থাকে আরও শোচনীয় করে তোলে।

সঞ্চয়ে টান 

জীবনযাত্রার ব্যয় লাগামহীনভাবে বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সঞ্চয়ের ওপর। আগে যারা মাস শেষে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা ভবিষ্যতে নিরাপত্তার জন্য জমাতেন, বাড়তি খরচ সামাল দিতে গিয়ে এখন সেই সঞ্চয় অর্ধেকের নিচে নেমে আসে বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এটি সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।

বিনোদনে ব্যয় সংকোচন

জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে মানুষের মানসিক প্রশান্তির অন্যতম উৎস বিনোদন খাতে সবার আগে কোপ পড়ে। সিনেমা দেখতে যাওয়া, থিম পার্কে ভ্রমণ কিংবা ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনাগুলো বাদ দিতে হয়। যাতায়াত ভাড়া এবং পর্যটন কেন্দ্রের খরচ বেড়ে যাওয়ায় মানুষ বিনোদনের চেয়ে জীবনধারণের মৌলিক প্রয়োজনগুলোকে প্রাধান্য দিতে বাধ্য হয়। একইসঙ্গে এলপিজির দাম বেড়ে যাওয়ায় রেস্তোরাঁয় খাবারের দামও বেড়ে যায়।

বিলাসিতায় কাটছাঁট

আর্থিক টানাপোড়েনের এই সময়ে শৌখিন বা দামি জিনিস কেনা অনেকটা বিলাসিতায় পরিণত হয়। নতুন স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, এসি, ফ্রিজ কিংবা দামি আসবাবপত্র কেনার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে হয়। উৎসব-পার্বণে নতুন পোশাক বা গয়না কেনার যে প্রবণতা থাকে, তাতেও বড় ধরনের কাটছাঁট হয়। মানুষ দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ বা কেনাকাটার চেয়ে প্রতিদিনের খাবারের সংস্থান করতেই বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ে।

যখন পকেটে টান পড়ে, তখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সীমিত হয়ে যায়। এর ফলে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে কেবল বেঁচে থাকার জন্য যা অপরিহার্য—যেমন খাদ্য, ওষুধ এবং সন্তানের শিক্ষা—সেখানেই ব্যয়ের সীমাবদ্ধতা চলে আসে। শৌখিনতা পরিহার করে জীবনযাত্রার মানকে কোনোমতে টিকিয়ে রাখাই তখন মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।