আম্পান-ইয়াসের ধকল না কাটতেই আসছে ‘অশনি’, আতঙ্কে সাতক্ষীরাবাসী
আম্পান ও ইয়াসের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠার আগেই ঘূর্ণিঝড় অশনির সম্ভাব্য আঘাতের আশঙ্কায় সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার মানুষ এখন আতঙ্কে। বিশেষ করে শ্যামনগর,কালীগঞ্জ ও আশাশুনি উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মানুষের মধ্যে অশনি নিয়ে শঙ্কা কাজ করছে।
২০২০ সালের ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও ২০২১ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালীগঞ্জ উপজেলায় আঘাত হানে। এতে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে দেড় লাখের বেশি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। মাছের ঘের ভেসে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফসলের মাঠ। এখনও অনেকেই তাদের বসতভিটায় ফিরতে পারেননি।
আজ সোমবার আশাশুনি উপজেলার শ্রীউলা ইউপির পুঁইজালা গ্রামের আঙ্গুরবালা সরদার (৬৫) দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও ইয়াসের আঘাতে ২ বারই খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে তাদের গ্রাম তলিয়ে যায়। দেড় বছর পরে গত ডিসেম্বরে কোনো রকমে বাড়ি করেছেন। চিংড়ি ঘের শুরু করেছেন ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য। এরমধ্যে আবার যদি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে, তাহলে কী হবে ভাবতে পারছেন না তিনি।
প্রতাপনগর ইউপির রুয়েরবিল এলাকার রহমত শেখ (৭০) বলেন, 'আগে ২ ঘূর্ণিঝড়ে পরিবারের সব শেষ হয়ে গেছে। এবার যদি এলাকায় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে, তাহলে বাপ-দাদার ঠিকানা আর থাকবে না। আম্পানের পর আমার ২ ভাই এলাকা থেকে চলে গেছে। কাজ নেই। নদীতে মাছ ধরে কোনো রকমে বেঁচে থাকা চেষ্টা করছিলাম। এবার কিছু হলে আর শেষ রক্ষা হবে না।'
শ্যামনগরে দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা ইউনিয়ন পারশেমারি গ্রামের অঞ্জনা রানী মণ্ডল (৫৫) বলেন, 'বছর বছর ঘূর্ণিঝড়ে গ্রামের অনেকে শহরে চলে গেছে। শ্বশুরের ভিটায় দাঁত কামড়ে পড়ে আছি। এবার ঘূর্ণিঝড় হলে চলে যাওয়া ছাড়া আর উপায় থাকবে না।'
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভাগ-১ ও ২ এর নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভাগ-১ এর আওয়তাধীন সাতক্ষীরা জেলায় বেড়িবাঁধ আছে ৩৮০ দশমিক ২৩০ কিলোমিটার। এরমধ্যে শ্যামনগর উপজেলার পারশেমারি, ৯ নম্বর সোরা ,হরিশখালি, দুর্গাবাটি, বিড়ালক্ষ্মী, কৈখালি, কালীগঞ্জ উপজেলার সাতবসু ও মথরেশপুর ইউপির উকসার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ।
এ ছাড়া, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভাগ-২ এর আওতাধীন সাতক্ষীরা জেলায় বেড়িবাঁধ আছে ৩০৩ কিলোমিটার। এরমধ্যে আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর, শ্রীউলা, আনুলিয়া, খাজরা আশাশুনি সদর ও শ্যামনগর উপজেলার খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদের ২১ স্থানের ৬ দশমিক ৬২১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝূঁকিপূর্ণ।
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভাগের-১ এর উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী দীপঙ্কর কুমার দাস দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'সাতক্ষীরা নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলী শ্যামনগর এলাকায় আছেন। ৯টি স্থানের ২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝূঁকিপূর্ণ। ওইসব স্থান সংস্কারে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।'
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভাগ-২ নির্বাহী প্রকৌশলী শামিম হুসাইন মাহমুদ বলেন, 'আমাদের বিভাগের আওতায় ২১টি স্থানে প্রায় সাড়ে ৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝূঁকিপূর্ণ। প্রতিটি স্থানে ঠিকাদার দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, সমস্যা হবে না।'
পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ সহকারী বন সংরক্ষক এম এ হাসান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ঘূর্ণিঝড় অশনির আঘাত থেকে নিরাপদ থাকতে কর্মচারীদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সুন্দরবনে মৌয়াল,বাওয়ালী ও জেলেদের নিরাপদ লোকালয়ের কাছাকাছি থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গভীর বনে যারা আছেন, অশনির প্রভাব না কাটা পর্যন্ত তাদের নিকটস্থ বনবিভাগের অফিসে আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে।'
এদিকে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ূন কবির জানিয়েছেন, আজ সকাল ১১টায় জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় অশনি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে সব প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে রাখতে ২৮৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এরমধ্যে উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগরে ১৮১টি ও আশাশুনিতে ১০৬টি আশ্রয় কেন্দ্র আছে।
এ ছাড়া, পর্যাপ্ত পরিমাণ শুকনো খাবার মজুদ রাখা হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৫ লাখ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ পর্যাপ্ত সুপেয় পানি। শ্যামনগর ও আশাশুনিতে ২ হাজার ৯৮০ জন স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রস্তুত আছে ৮৬টি মেডিকেল টিম।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলিফিকর আলী জানান, ঘূর্ণিঝড় অশনির বর্ধিত অংশের প্রভাবে আজ সকাল থেকে শ্যামনগর ও আশাশুনিতে হালকা ও মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। সেইসঙ্গে ঝড়ো হাওয়াও বইছে। তবে নদ-নদীর পানি স্বাভাবিক।
তিনি আরও জানান, উপকূলীয় এলাকায় বর্তমানে ২ নম্বর সতর্ক সংকেত চলছে। ঘূর্ণিঝড়টি আজ ভোর ৬টায় মোংলা সমুদ্র বন্দর থেকে ১ হাজার ২০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল।