কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে বন্যা

খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে লাখো মানুষ

এস দিলীপ রায়
এস দিলীপ রায়

কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে ২৬টি নদীর পানি বেড়েছে। দুই জেলার ১৪টি উপজেলার প্রায় চার শতাধিক চর-দ্বীপচর ও নদী তীরবর্তী গ্রামের লাখো মানুষ বন্যার কবলে পড়েছেন।

অনেকে আসবাবপত্র, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি নিয়ে সরকারি রাস্তা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ ও বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকে আবার পানিবন্দি হয়ে জীবনযাপন করছেন। বন্যাদুর্গত মানুষেরা খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে আাছেন।

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ গ্রামের পানিবন্দি কৃষক সেকেন্দার আলী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমার একটি ছাগল ও কয়েকটি হাঁস-মুরগি পানিতে ভেসে গেছে। গরু-ছাগলগুলো উঁচু স্থানে রেখেছি।'

flood_0.jpg
বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে কুড়িগ্রামের বেগমগঞ্জ গ্রাম। ছবিটি গতকাল শুক্রবার বিকেলে তোলা হয়েছে। ছবি: এস দিলীপ রায়/স্টার

তিনি বলেন, 'ঘরের ভেতর দুই থেকে তিন ফুট পানি। পরিবারের লোকজন নিয়ে খাটের উপরে বসবাস করছি। ঘরে খাবার নেই। নলকূপ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় পান করার মতো বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছি না। গেল আট দিন ধরে এই অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি।'

একই গ্রামের কৃষক বজলে রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ঘরে খাবার আছে কিন্তু রান্নার সুযোগ নেই। চিড়া, মুড়ি, গুড় ও পাউরুটি খেয়ে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। মাঝে মধ্যে আত্মীয় স্বজনরা রান্নাকরা খাবার দিয়ে সহায়তা করছেন। নলকূপ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই নদীর পানি পান করতে হচ্ছে। ঘাসের জমিগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় গরু-ছাগল নিয়ে দুরবস্থায় পড়েছি।'

চিলমারী উপজেলার জোরগাছ গ্রামের মহিমা বেগম ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বাড়ি-ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছি। সঙ্গে আছে গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগি। ঘরের কিছু আসবাবপত্র ও একটি খাট ভেসে গেছে। বিশুদ্ধ পানি ও টয়লেটের সুব্যবস্থা না থাকায় গেল ছয় দিন ধরে কষ্ট করে জীবনযাপন করতে হচ্ছে।'

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার গোবর্ধান গ্রামের কৃষক মোবারক আলী ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বাড়ি-ঘর ছেড়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধে আশ্রয় নিয়েছি। ঘরে খাবার না থাকায় অনাহারে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। আমন ধান ও সবজি খেতগুলো তলিয়ে গেছে।'

flood_2_1.jpg
বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে কুড়িগ্রামের বেগমগঞ্জ গ্রাম। ছবিটি গতকাল শুক্রবার বিকেলে তোলা হয়েছে। ছবি: এস দিলীপ রায়/স্টার

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মঞ্জুরুল হক ডেইলি স্টারকে বলেন, 'প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর জমির আমন ধান ও সবজির খেত পানির নিচে। অনেক স্থানে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। আগামী ২-৩ দিনে মধ্যে বন্যার পানি নেমে না গেলে ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হবে।'

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামিম আশরাফ ডেইলি স্টারকে বলেন, 'প্রায় সাত হাজার হেক্টর জমির ফসল এখন পানির নিচে। বন্যার পানির সঙ্গে লড়াই করে আমন ধান টিকতে পারলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবজিসহ অন্যান্য ফসল। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে অস্থায়ী টয়লেট ও নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। চরাঞ্চলে পানিবন্দি পরিবারগুলোকে নৌকায় নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে। বন্যাদুর্গতদের মাঝে সরকারি ত্রাণ ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।'

কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্র জানায়, আজ শনিবার সকাল ৬টা থেকে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কুড়িগ্রামের চিলমারী পয়েন্টে বিপৎসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার ওপর ও ধরলা নদীর পানি কুড়িগ্রাম সদরের ধরলা সেতু পয়েন্টে বিপৎসীমার ৫১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। লালমনিরহাট সদর উপজেলার শিমুলবাড়ী পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি বিপৎসীমার ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে আজ ভোরে তিস্তার পানি লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর থাকলেও সকাল ৬টা থেকে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।