আল-মুসলিম গ্রুপের ৭ পোশাক কারখানায় ১৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে সাভারে বিক্ষোভ
সাভারে আল-মুসলিম গ্রুপের ৭ পোশাক কারখানার মোট ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। আজ শনিবার সকালে সাভারের রেডিও কলোনি ও উলাইল এলাকায় কারখানার সামনে জড়ো হন শ্রমিকরা।
শ্রম আইন অনুসরণ না করা, পাওনা পরিশোধ না করার প্রতিবাদে ও চাকরি ফিরে পাওয়ার দাবিতে শ্রমিকদের একটি অংশ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সার্ভিস লেনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভও করেন।
দুপুর দেড়টার দিকে উলাইল বাসস্ট্যান্ডে মানববন্ধন করেন শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূইয়া দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমরা কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলছি। এখন সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।'
কারখানা সূত্রে জানা গেছে, আল-মুসলিম গ্রুপের একেএম নিটওয়্যারের ১ হাজার ৯, আল-মুসলিম বিল্ডার্সের ৭৩, আল-মুসলিম অ্যাপারেলসের ৫৩, আল-মুসলিম গার্মেন্টস অ্যাক্সেসরিজের ৬৯, আল-মুসলিম ওয়াশিংয়ের ৮৮, আল-মুসলিম ইয়ার্ন ডাইংয়ের ৪৭ ও প্যাসেফিক ব্লু (জিন্স ওয়্যার) লিমিটেডের ৫২৯ শ্রমিককে সম্প্রতি ছাঁটাই করা হয়েছে। ছাঁটাইকৃতদের মধ্যে ২০০ জন আল-মুসলিম গ্রুপের স্টাফও রয়েছেন।
বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের অভিযোগ, ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে শ্রম আইন যথাযথভাবে মানা হয়নি। ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে কারখানা কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়িক মন্দা ও কাজ কমে যাওয়ার মিথ্যা অজুহাত দিয়েছে।
ছাঁটাই হওয়া কারখানার সুইং সেকশনের শ্রমিক সাব্বির হোসেন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ঈদের ছুটির আগে আমাদের ২০ দিনের বেতন দেয়। পরে কোনো নোটিশ না দিয়ে ছাঁটাই করা হয়েছে। আজ শনিবার শুনি আমার চাকরি নাই। আমাদের নিয়মিত ওভারটাইম করতে হয়। এখন তারা বলছে কারখানায় কাজ নেই।'
হেলপার হিসেবে একটি কারখানায় ৮ বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করতেন সুমিত্রা রানী। তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ঈদের ছুটিতে বাড়িতে যাই। এর মধ্যে বিকাশে ৮৫ হাজার টাকা আসে। পরে জানতে পারি আমাকে ছাঁটাই করা হয়েছে। শ্রম আইন অনুযায়ী আমার পাওনা পরিশোধ করা হয়নি।'
আরেক শ্রমিক জোছনা বেগম বলেন, 'আমি ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে কারখানায় অপারেটর হিসেবে যোগদান করি। কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রম আইন অনুসরণ করে আমাকে ছাঁটাই করেনি। যথাযথ পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। শ্রম আইন অনুযায়ী আমি ২ লাখ টাকার বেশি পাই। কিন্তু আমাকে দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। আমরা এই ছাঁটাই মানি না। আমরা চাকরি ফেরত চাই। কারখানায় কাজ কম থাকার মিথ্যা অজুহাতে আমাদের ছাঁটাই করা হয়েছে।'
একাধিক শ্রমিক ও শ্রমিক নেতা জানান, বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এর ২০ ধারা অনুযায়ী কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিক ছাঁটাই করতে পারেন। কিন্তু এ ধারা অনুযায়ী যাদের নিয়োগ পরে হয় তাদের আগে ছাঁটাইয়ের নিয়ম। কিন্তু এখানে ১০- ১৫ বছর চাকরি করেছে এমন শ্রমিকদেরও ছাটাই করা হয়েছে। এখানে শ্রম আইন অনুসরণ করা হয়নি এবং পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বর্তমান পরিস্থিতিতে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থান কী হবে সেটি নিয়ে ভাবা দরকার ছিল। অন্যান্য সেক্টরে যত সময় যায় শ্রমিকরা তত দক্ষ হয়ে ওঠে, চাকরির নিশ্চয়তা তত বাড়ে। কিন্তু গার্মেন্টস সেক্টরে উল্টো হয়। এখানে যাদের ইনক্রিমেন্ট, গ্রেড ও বেতন বাড়ে তাদের ছাটাই করা হয়। আল-মুসলিমের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।'
বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফেডারেশনের সভাপতি সারোয়ার হোসেন বলেন, 'আল-মুসলিম গ্রুপ যে প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের ছাঁটাই করেছে সেখানে শ্রম আইন অনুসরণ করা হয়নি। কারখানা কর্তৃপক্ষের সুবিধা অনুযায়ী যাকে ইচ্ছে তাকেই ছাঁটাই করেছে।'
জানতে চাইলে আল-মুসলিম গ্রুপের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (প্রশাসন) মো. আবু রায়হান ডেইলি স্টারকে জানান, এসব কারখানায় মোট প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। আমরা যাদের ছাঁটাই করেছি তাদের সরকারি বিধি-বিধান ও কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী করেছি। বর্তমানে কোম্পানির কাজ কম থাকায় অর্থাৎ অর্ডার কম থাকার কারণে আমরা এই ছাঁটাই প্রক্রিয়া করেছি।'
'ভবিষ্যতে যখন কাজের অর্ডার চলে আসবে, যারা ছাঁটাই হয়েছেন তাদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে নিয়োগ দেবো। ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপরও যদি দুয়েকজনের কোনো কারণে না হয়, সেক্ষেত্রে আমরা কোম্পানির পলিসি অনুযায়ী পরিশোধ করে দেবো,' বলেন তিনি।
শিল্প পুলিশের এসপি মমিনুল ইসলাম বলেন, 'শ্রমিকরা বলছেন কেউ কেউ পাওনা বুঝে পায়নি। সকালে শ্রমিকরা কারখানার সামনে জড়ো হয়েছিল, দুপুরে মানববন্ধন করেছে। এখন সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক।'