বিদ্যুৎ ও জ্বালানি গ্যাসের দামও বাড়তে পারে
ডিজেল, কেরোসিন ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি গ্যাসের দামও বাড়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ গত জুলাই থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি গ্যাসের মূল্য অনুসরণ করে সরকার স্থানীয় পর্যায়ে তা সমন্বয় করতে চায়।
গত মাসে বিশ্বব্যাপী মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিশ্লেষণ করার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে বসেন।
এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে দ্য ডেইলি স্টার জানতে পেরেছে যে, ওই বৈঠকে তারা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেন। কারণ এই দাম বর্তমান পর্যায়ে রাখলে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হবে। যা হয়তো সরকার বহন করতে পারবে না।
উদাহরণ হিসেবে তারা বলেন, চলতি অর্থবছরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ক্ষেত্রে ৬ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক অনুমান অনুসারে, গ্যাসের দাম বর্তমান পর্যায়ে রাখতে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি দিতে হতে পারে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব আনিসুর রহমান মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে এই অগ্রগতির কথা স্বীকার করছেন। তবে ডেইলি স্টারকে তিনি জানান, এখনো এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি।
এর আগে ১ কার্গো এলএনজি আনতে খরচ হতো ২৫০ কোটি টাকা। বিতরণের আগে এই গ্যাস স্থানীয়ভাবে আহরিত প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে মেশানো হয়। এখন প্রতি কার্গো এলএনজি আনতে দরকার হচ্ছে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা।
আনিসুর রহমান বলেন, 'এই বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত তহবিল ব্যবস্থাপনা এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।' তিনি জানান, পরের মাসেই ১ কার্গো এলএনজি আসার কথা। এ জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল চেয়ে অর্থ বিভাগকে মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়েছে।
প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানির খরচ এখন ৫৬ টাকা। তাই প্রতি ঘনমিটার এলএনজির গড় মূল্য আগের ১২ টাকা থেকে বেড়ে ২৩ টাকা হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব জানান, মূল্য সমন্বয় না হলে সরকারকে বিদ্যুতের ভর্তুকি হিসেবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা দিতে হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, 'আমাদের মনে রাখতে হবে যে সরকার বিনামূল্যে কোভিড ভ্যাকসিন দিচ্ছে। জ্বালানির দাম বাড়ানো না হলে বাজেটে বিরূপ প্রভাব পড়বে।'
অর্থনীতিবিদরা সরকারি এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। এমন একটি সময়ে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, যখন বাংলাদেশ কেবল করোনা মহামারির অভিঘাত থেকে বের হয়ে আসতে শুরু করেছে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনোমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, 'মহামারির অভিঘাত থেকে বেরিয়ে আসার জন্য অনেক খাত এখনও লড়াই করছে। আর আমরা এখনও নিশ্চিতভাবে জানি না যে, কোভিডের আরেকটি ঢেউ আসবে না।'
ডিজেল ও কেরোসিনের দামের সঙ্গে বিদ্যুৎ দাম ও গ্যাসের ভর্তুকি বাড়লে উৎপাদন খরচ এবং মূল্যস্ফীতিও বাড়বে।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা একটি অভ্যন্তরীণ সামষ্টিক অর্থনীতির গবেষণার তথ্য উদ্ধৃত করে বলেন, খাদ্য ও খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি- ২ ক্ষেত্রেই জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব মাত্র ৩ মাস স্থায়ী হতে পারে।
সেলিম রায়হান যদিও মনে করেন, সরকার কয়েক মাসের জন্য মূল্যবৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত স্থগিত করতে পারত। তিনি বলেন, 'আমাদের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ভেতর থেকে আঘাত পাবে…এমন সময়ে সরকারি সহায়তার খুব দরকার হয়।'
ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ২৩ শতাংশ বাড়ানোর কারণ হিসেব সরকার যে যুক্তি দেখিয়েছে, তা হচ্ছে এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) তার ক্ষতি পুষিয়ে নেবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের দুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলেছে। মহামারির অভিঘাত থেকে যারা এখনও বেরিয়ে আসতে পারেনি।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুসারে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার কারণে গত অক্টোবর পর্যন্ত সাড়ে ৫ মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থাটি ১ হাজার ১৪৭ কোটি টাকার বেশি লোকসান করেছে।
বিশ্ববাজারে যখন ডিজেলের দাম কম ছিল তখন বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতো বহুপাক্ষিক ঋণদাতা সংস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের মতো সংস্থাগুলো সে অনুসারে ডিজেলের দাম কমানোর জন্য সরকারকে অনুরোধ করেছিল।
কিন্তু সরকার তাতে কান দেয়নি।
২০১৪-১৫ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরের মধ্যে বিপিসি ৪৩ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।
আনিসুর রহমান জানান, গত ৭ অর্থবছরে অর্জিত মুনাফা ৫টি উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানান্তর করা হচ্ছে। এগুলো হলো- আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল নিরাপদে আনলোড করার জন্য মহেশখালীতে ডাবল লাইন প্রকল্পের সঙ্গে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং স্থাপন, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত জ্বালানি পাইপলাইন স্থাপন এবং রূপগঞ্জ থেকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত আরেকটি জেট ফুয়েল পাইপলাইন স্থাপন।
এসব উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বিপিসির আনুমানিক ব্যয় ৩৩ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০১৬ সালে সরকার ডিজেলের দাম লিটারে ৩ টাকা কমালেও পরিবহন মালিকরা তখন ভাড়া কমায়নি।
রহমান বলেন, 'সামনের মাসগুলোতে যদি বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম কমে আমরা অবশ্যই দাম কমাব।'
গতকাল একই কথা বলেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।
দাম বাড়ানোর পরিবর্তে সরকার ভারতের মতো জ্বালানি আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে আনার কথা বিবেচনা করবে কিনা জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী জানান, এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। তার মন্ত্রণালয় নয়।
সেলিম রায়হানের ভাষ্য, সরকার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম না বাড়িয়ে এই লোকসানকে এক ধরনের প্রণোদনা হিসেবে বিবেচনা করতে পারত।
যেহেতু অনেকেই আগের প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর সুবিধা নিতে ব্যর্থ হয়েছে, তাই এই দফার সুবিধা সবার কাছে পৌঁছে যেত।
গত বুধবার জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্ত তাড়াহুড়া করে নেওয়া হয়েছে মন্তব্য করে রায়হান বলেন, 'আমার ধারণা সরকার তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে।'
অনুবাদ করেছেন মামুনুর রশীদ