আত্মহত্যা নয়, হত্যা করা হয়েছে বেরোবি শিক্ষার্থী তুষারকে: ফরেনসিক রিপোর্ট

নিজস্ব সংবাদদাতা, দিনাজপুর

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী তানভীর আলম তুষার আত্মহত্যা করেননি। তাকে আঘাতের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের রিপোর্টে এমন তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় তানভীর আলম তুষারের বাবা মোহসিন আলী বাদী হয়ে গত ৪ মার্চ রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের হারাগাছ থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

পুলিশ জানায়, রংপুর সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাহেবগঞ্জ বাজার এলাকার ব্যবসায়ি মোহসিন আলীর একমাত্র ছেলে তানভীর আলম তুষার। তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অষ্টম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। গত বছরের ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তার চাচাতো ভাই সাব্বির আলম তাকে ডাকতে এসে রুমের দরজা বন্ধ দেখেন। পরে ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তুষারকে আধাপাকা ঘরের মধ্যে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখেন। পরে স্থানীয় লোকজন ঘরে ঢুকে ফাঁস লাগানো অবস্থায় উদ্ধার করে মেঝেতে নামিয়ে ফেলেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তানভীর আলম তুষারের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়ে দেয়।

এর আগে ফেসবুক আইডিতে 'I QUIT for ever' লিখে স্ট্যাটাস দেন তুষার।

এ ঘটনায় তুষারের পরিবারের বরাত দিয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের হারাগাছ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শওকত আলী সরকার জানিয়েছিলেন, মোবাইলে জুয়া খেলতেন তুষার। এ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে তার মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তুষার গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর কারণ জানা যাবে। এ ব্যাপারে ওইদিন হারাগাছ থানায় একটি ইউডি মামলা করা হয়।

তুষারের মা তাসলিমা বেগম জানান, তার ছেলে শান্ত স্বভাবের ছিল। এলাকার কারও সঙ্গে জোরে কথা বলতো না। জুয়া খেলা কী তা সে বুঝতো না। ওর বন্ধুরা বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তাকে মোবাইলে জুয়া খেলায় আসক্তি করেছিল।

তিনি বলেন, ৫ অক্টোবর তুষার তার এক বন্ধুর বাড়িতে যায় এবং সেখানে রাত যাপন করে পরের দিন ৬ অক্টোবর বিকেলে বাড়িতে আসে। সে সময় ছেলেকে বিষণ্ন থাকতে দেখা যায়। পরিবারের সবার সঙ্গে কথাও বলেছে। রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে সে। ৭ অক্টোবর ঘরে ছেলের মরদেহ দেখতে পাই।

তুষারের চাচাতো ভাই সাব্বির আলম বলেন, সকালে ভাইকে অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করি। কিন্তু কোনো সাড়া না পেয়ে দরজার পাশে টিনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখি যে, কাঠের পাইরে গলায় মাল্টিপ্লাগের তার পেঁচানো মরদেহ বক্স খাটের ওপর ঝুলছে।

সাব্বির বলেন, পারিবারিক বিষয় নিয়ে বাবার সঙ্গে মনোমালিন্য চলছিল তুষারের। কিন্তু এ জন্য তুষার ভাইয়া আত্মহত্যা করতে পারে না। ফরেনসিক বিভাগের প্রতিবেদন মতে, তার ভাইকে হয়তো কেউ মৃত্যুর আগে শারীরিক আঘাত করেছিল।

তুষারের বাবা মোহসিন আলী বলেন, মেডিকেলের প্রতিবেদনে তিনি জানতে পারেন যে, তার ছেলে আত্মহত্যা করেনি। তাকে হত্যা করা হয়েছে। হয়তো রাতের কোনো এক সময় কেউ বাড়িতে এসে তার ছেলেকে হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে রেখে কৌশলে পালিয়ে গিয়েছে।

তিনি বলেন, ছেলের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কললিস্ট অনুসন্ধান করলে হয়তো কোনো ক্লু বের হবে। ছেলেকে কারা হত্যা করল, কখন ছেলের মৃত্যু হলো, কেনই বা ছেলেকে হত্যা করা হলো। ছেলের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হারাগাছ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবু ছাইম মুঠোফোনে জানান, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. ইফফাত শারমিন ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন যে, তানভীর আলম তুষারকে আঘাতের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় তার বাবা মামলা দায়ের করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।