টাকার বিনিময়ে সচ্ছলদের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর দেওয়ার অভিযোগ
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পেয়েছেন ভূমির মালিক ও আর্থিকভাবে সচ্ছল কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা। আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে সচ্ছল পরিবারগুলোকে সরকারি এ সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়রা এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নে আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে ১০০টি ঘর নির্মাণ করা হয়। জুন মাসে এসব ঘর সুবিধাভোগীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘরগুলো নির্মাণের সময় স্থানীয় মাতব্বর ময়েজ উদ্দিন বাচ্চুকে দেখাশোনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পেতে সুবিধাভোগীর তালিকা তৈরি করা হয়। বাচ্চু তার দুই ছেলে মজিদুল ইসলাম ও মিজানুর রহমান এবং দুই মেয়ে মনিফা বেগম ও মিনু বেগমকে সুবিধাভোগীর তালিকায় রেখেছেন। এ তালিকায় তার আরও ২৩ জন নিকট আত্মীয়র নাম আছে। তারা সবাই আর্থিকভাবে সচ্ছল এবং প্রত্যেকেরই নিজস্ব বাড়ি ও জমি আছে।
অপরদিকে, ঘুষের টাকা দিতে না পারায় সরকারি ঘর দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় দিনমজুর এরশাদুল হক।
তিনি বলেন, ‘আমার কোনো জমি নেই। খাসের জমিতে থাকি। আমি ঘর পেলাম না অথচ অনেক সচ্ছল ও ভূমির মালিক ঘর পেয়েছেন।’
স্থানীয় নাসরিন বেগম জানান, তার স্বামী ভূমিহীন। পরিবার নিয়ে তিনি অন্যের জমিতে ঘর তুলে বাস করছেন। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহার আশ্রয়ণের ঘর পেতে ময়েজ উদ্দিন বাচ্চুকে ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘ঘর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ময়েজ উদ্দিন বাচ্চু আমাদের কাছে ১৫ হাজার টাকা চেয়েছিলেন। কিন্তু আমরা ১০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। বাকি পাঁচ হাজার টাকা দিতে পারিনি বলে ঘর পাইনি।’
নাসরিন আরও বলেন, ‘ময়েজ উদ্দিন বাচ্চু আমাদের ১০ হাজার টাকা এখনো ফেরত দেননি। টাকা ফেরত চাইলে বিভিন্ন অজুহাত দেখান তিনি।’
স্থানীয় আলমগীর হোসেন জানান, এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে মোবাইল ফোনে কয়েক দফায় অভিযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তাই জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসক আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, তিনি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।’
লিখিত অভিযোগ করায় তাদেরকে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে আলমগীর বলেন, ‘আমাদের হয়রানি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত হয়নি। অভিযোগ করে এখন বিপদে আছি।’
এ বিষয়ে ময়েজ উদ্দিন বাচ্চুর সঙ্গে গত শনিবার দুপুরে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আশ্রয়ণের ঘর দেওয়ার কথা বলে তিনি কারও কাছ থেকে কোনো টাকা নেননি।
দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘আমার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে ঘর পেয়েছে, এই তথ্য সঠিক। কিন্তু আরও ২৩ জন নিকট আত্মীয়ের ঘর পাওয়ার কথা উঠেছে, এটা ঠিক নয়। গ্রামে বসবাস করলে প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে প্রত্যেকের আত্মীয় হবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আশ্রয়ণের ঘরগুলো নির্মাণের সময় আমি নৈশপ্রহরীর দায়িত্ব পালন করেছিলাম। সুবিধাভোগীর তালিকা প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিজেরাই প্রস্তুত করেছেন। আমি শুধু তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছি।’
পাঁচগাছি ইউনিয়নে ১০০টি ঘরসহ উপজেলায় ৩০০টি ঘর নির্মাণ ও সুবিধাভোগীদের মধ্যে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিলুফা ইয়াছমিন। তবে, এ ধরনের কোনো অভিযোগ তার কাছে আসেনি বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘যদি ময়েজ উদ্দিন বাচ্চু এ ধরনের কোনো অপকর্ম করে থাকেন, তবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল করিম দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তিনি এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। সদর উপজেলা ইউএনওকে এ ব্যাপারে জানানো হয়েছে। অভিযোগটি দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।