কুড়িগ্রাম

করোনা প্রণোদনার নামে প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে ৪ দিনমজুর কারাগারে

এস দিলীপ রায়

প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি প্রায় আড়াই কোটি টাকা আত্মসাত চেষ্টার অভিযোগে দুই সরকারি কর্মকর্তাসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে গাজীপুরের শ্রীপুরে। মামলার আসামি কুড়িগ্রামের পাঁচ দিনমজুরের মধ্যে চার জনকে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

অভিযুক্ত পাঁচ দিনমজুরের পরিবার জানিয়েছেন, করোনা প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলে তাদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। টাকা আত্মসাতের সঙ্গে তারা জড়িত নন। দারিদ্র্যতার সুযোগ নিয়ে তাদের ফাঁসানো হয়েছে।

ফুলবাড়ী থানা পুলিশের সহযোগিতায় গাজীপুর পুলিশ গত ২ জুলাই চার দিনমজুরকে তাদের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি ২ কোটি ৪৬ লাখ ৯ হাজার ৯৬০ টাকা আত্মসাতের চেষ্টা মামলায়। ১ জুলাই গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানায় মামলাটি করেন সোনালী ব্যাংকের শ্রীপুর হেডকোয়ার্টার শাখার ব্যবস্থাপক রেজাউল হক।

মামলায় ৫ দিনমজুরসহ আসামি করা হয়েছে শ্রীপুর উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বজলুর রশিদ, হিসারক্ষণ অফিসের অডিটর আরিফুর রহমান, মাস্টাররোল কর্মচারী তানভীর ইসলাম স্বপন ও ঢাকার উত্তরখান জামতলা এলাকার বাসিন্দা শাহেনা আক্তারকে। অভিযুক্ত পাঁচ দিনমজুরের মধ্যে বিধবা ফুলমনি রানী (৩৬), কমল চন্দ্র রায় (৩২), প্রভাস চন্দ্র রায় (৪৩) ও রনজিত কুমার (৩৬) এখন গাজীপুর জেলা কারাগারে। পলাতক আছেন সুবল চন্দ্র মোহন্ত (৩০) নামের আরেক দিনমজুর।

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার ধরলা নদীর পাড়ে বড়ভিটা ইউনিয়নের নওদাবাঁশ গ্রামের বাসিন্দা ওই পাঁচ দিনমজুরের পরিবার বলছে, তাদের ভাগ্যে এমন বিপদ নেমে এসেছে সরকারি টাকা আত্মসাৎকারী একটি প্রতারক চক্রের প্রতারণার কারণে।  বসতভিটার জমি ছাড়া তাদের নিজস্ব কোনো সম্পদ নেই বলে তারা জানিয়েছেন। 

জানা যায়, গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের মাস্টাররোল কর্মচারী কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী তানভীর ইসলাম স্বপন (৩০) করোনাকালীন সরকারি প্রনোদনা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলেন তাদের। ১৬ জুন ৫ জনকে নিয়ে যান সোনালী ব্যাংকের নাগেশ্বরী শাখায়। সেখানে তাদের নামে ব্যাংক হিসাব চালু করেন। এসব দিনমজুরদের শ্রীপুরে নিয়ে গিয়ে ব্যাংকের চেক বই ও বিভিন্ন কাগজপত্রে সই ও টিপসই নেন। তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেন ব্যাংকের সব কাগজপত্র ও চেক বই। ব্যাংক একাউন্টে প্রণোদনার টাকা পাঠানো হবে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেন। প্রনোদনার টাকা পাওয়ার প্রত্যাশায় দিনমজুরেরা স্বপনের সব কথা বিশ্বাস করেন।

বাড়ি ছাড়া দিনমজুর সুবল চন্দ্র মোহন্তের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হলে তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, তারা গাজীপুর ও শ্রীপুরে কোনোদিন যাননি। তানভীর ইসলাম স্বপনই তাদের নিয়ে গেছেন। তাদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে প্রণোদনা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি। তারা প্রণোদনার টাকার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এরমধ্যেই পুলিশ এসে চার জনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। এসময় তিনি বাড়ির বাইরে ছিলেন।

‘আমাদের খুব অভাব তাই স্বপনের কথা বিশ্বাস করেছিলাম। তার সাথে আমাদের কোনো পরিচয় ছিল না। গ্রেপ্তারের ভয়ে আমি এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছি,’ বলেন তিনি।

সোনালী ব্যাংক নাগেশ্বরী শাখার ব্যবস্থাপক শরিফুল আজম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ব্যাংক হিসাব চালুর কিছুদিন পর এই পাঁচ দিনমজুরের হিসাব নম্বরে ২ কোটি ৪৬ লাখ ৯ হাজার ৯৬০ টাকা চলে আসে। এসব টাকা আসে সোনালী ব্যাংক হেডকোয়ার্টার শাখা থেকে। এর মধ্যে রণজিতের সঞ্চয়ী হিসাবে ৪৮ লাখ ৪৫ হাজার ৭২০ টাকা, প্রবাসের হিসাব নম্বরে ৬৫ লাখ ৭২ হাজার ১২০ টাকা, সুবলের হিসাব নম্বরে ৪০ লাখ ৭১ হাজার ৭২০ টাকা, কমলের হিসাব নম্বরে ৪২ লাখ ৪৯ হাজার ৮৮০ টাকা এবং ফুলমণি রানির হিসাব নম্বরে ৪৮ লাখ ৭০ হাজার ৫২০ টাকা আসে। কয়েকদিন পর অপরিচিত ৩-৪ জন লোক এসব হিসাব নম্বর থেকে টাকা তুলতে এলে তার সন্দেহ হয় এবং শ্রীপুর হেডকোয়ার্টার শাখায় যোগাযোগ করে টাকা উত্তোলন বন্ধ করা হয় কিন্তু অপরিচিত লোকগুলোকে আটক করার আগেই তারা ব্যাংক থেকে সরে যায়।

’শ্রীপুর উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের ভুয়া অ্যাডভাইসের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের এই টাকা এসব হিসাব নম্বরে জমা করা হয়। হিসাব নম্বরধারী দিনমজুরেরা এসবের কোনকিছুই জানতেন না,’ বলেন শরিফুল আজম।

দিনমজুর রনজিতের স্ত্রী ভারতী রানী (৩০) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, তার দিনমজুর স্বামী জেলে। তিনি দুই সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের খাবার কেনার টাকাও নেই। ‘শুধু অভাবের কারণে প্রনোদনার লোভে ব্যাংক হিসাব নম্বর চালু করেন এই পাঁচ জন। তারা এসবের কোনো কিছুই জানতেন না,’ তিনি বলেন।

ফুলমনী রানীর ছেলে সোহেল চন্দ্র রায় (২০) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, তিনি প্রতিবন্ধী ছোট বোন নিয়ে এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তার মা দিনমজুরি করে আয় করতেন এবং সংসার চালাতেন।

‘আমার কাছে টাকা নেই তাই মাকে দেখার জন্য কারাগারেও যেতে পারিনি,’ বলেন সোহেল। 

প্রভাসের স্ত্রী অঞ্জলী রানী (৪০) যারা তাদের ফাঁসিয়েছেন তিনি তাদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দাবি করেন। ‘আমরা না খেয়ে অনাহারে অর্ধাহারে আছি,’ তিনি বলেন।

ফুলবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাজীব কুমার রায় দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, এটি শ্রীপুর থানার ঘটনা। শ্রীপুর থানা পুলিশই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তাদের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়া হলে তারা বিস্তারিত জানাবেন।