বিচার তাদের কাছে এখন মরীচিকার মতো
ন্যায়বিচার পাবেন এমন আশা হারিয়ে ফেলছেন হাসান মিরধা আকাশ। তাজরীন ফ্যাশনস অগ্নিকাণ্ডে বেঁচে যাওয়াদের একজন তিনি।
ওই কারখানার লাইন সুপারভাইজার আকাশ নিজেকে উপেক্ষিত, অবহেলিত মনে করেন, যখন দেখেন ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রায় নয় বছর আগে হওয়া মামলার অগ্রগতি খুব একটা নেই।
হতাশাগ্রস্ত আকাশ বলেন, ‘আমার মনে হয় না কেউ আর আমাদের নিয়ে ভাবে। প্রায় নয় বছর আগের ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আমার জীবন তছনছ হয়ে যায়। কিন্তু আমরা দোষীদের বিচার দেখতে পাইনি।’
তাজরীন ফ্যাশনসে আগুনের ঘটনায় ১১২ জন নিহত হয়, আহত হয় অনেকে। আগুনের সেই ঘটনা আকাশের জীবন চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছে। তিনি শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন এবং এখনও বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শারীরিক অবস্থার কারণে কাজ করতে পারেন না তিনি।
‘আমাদের জীবন আর আগের মতো হবে না। ন্যায়বিচারই কেবল আমাদের শান্তি দিতে পারে। কিন্তু আমরা জানি না এজন্য আমাদের কত বছর অপেক্ষা করতে হবে,’ বলেন তিনি।
বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্যে, ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দেশে বিভিন্ন কারখানায় ৪৯৬৮টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
তবে এসব ঘটনায় হওয়া মামলার অগ্রগতি সম্পর্কিত তেমন কোনো হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি।
শ্রমিক অধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন এবং আইনজীবিরা বলেছেন যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতির কারণে কারখানাগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার জন্য দায়ী মালিক এবং সংশ্লিষ্টরা আইনের আওতায় আসেন না।
গতকাল দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘জবানবন্দির জন্য সময়মতো প্রসিকিউশন ও পুলিশ সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে ব্যর্থ হওয়ায় এ ধরনের মামলার বিচারে সাধারণত দেরি হয়।’
‘অভিযুক্তরা প্রভাবশালী ও ধনী হওয়ায় কখনও কখনও এই মামলাগুলো যথাযথভাবে তদন্ত করা হয় না। এছাড়াও, সাক্ষীরা অভিযুক্তদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আদালতে জবানবন্দির জন্য উপস্থিত হয় না,’ বলেন তিনি।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংঘের সভাপতি তসলিমা আক্তার বলেন, ‘মালিকরা শ্রমিককে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেন না। তারা কেবল মুনাফার জন্য শ্রমিকদের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।’
তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘দায়মুক্তি সংস্কৃতির কারণে আমরা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কোনো অপরাধীকে শাস্তি পেতে দেখি না। মালিক ও অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া হলে আগুনের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসত।’
‘দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার আরেকটি কারণ কারখানার মালিকরা সাধারণত রাজনীতিবিদদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখেন এবং তাদের ক্ষমতার প্রভাবে শাস্তি থেকে বেঁচে যান।’
মামলার অগ্রগতি কম
আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ডের একদিন পর ২৪ নভেম্বর, ২০১২ আশুলিয়া থানায় একটি মামলা হয়।
পুলিশ ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে কারখানাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন ও চেয়ারম্যান মাহমুদা আক্তারসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, দেলোয়ার ও তার স্ত্রী মাহমুদা প্রকৌশলীর সহায়তায় ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনার ভিত্তিতে কারখানা ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন এবং নিচতলায় ওয়াকওয়ে অবৈধভাবে গুদাম হিসাবে ব্যবহার করছিলেন। কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের সময় বহির্গমনের কোনো দরজা ছিল না যদিও শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতিটি কারখানায় দুটি করে বহির্গমনের দরজা থাকতে হবে।
অভিযোগপত্রের প্রায় দুবছর পর, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকার একটি আদালত ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে এবং ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে বিচার শুরু হয়।
তবে আদালত এখনও পর্যন্ত ৪০ টিরও বেশি শুনানিতে ১০৪ জন সাক্ষীর মধ্যে নয় জনের সাক্ষ্যগ্রহণ রেকর্ড করেছেন।
সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর রেহানা আক্তার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘গত বছর ১০ জানুয়ারি সবশেষ একজনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। কোভিড মহামারির কারণে আমরা আদালতে আর কোনো সাক্ষী হাজির করতে পারিনি।’
আইন ও সালিশ কেন্দ্র, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), নিজেরা করি এবং ব্র্যাক ২০১২ সালের ২ নভেম্বর কর্মক্ষেত্রের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ আইনের কার্যকারিতা প্রয়োগে ব্যর্থ হওয়ায় এবং তাজরীনে আগুনে নিহতদের পরিবার ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে।
রিট আবেদন করা আইনজীবী শারমিন আক্তার জানান, আদালত একটি রুলনিশি এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেন।
শারমিন আক্তার বলেন, ‘চূড়ান্ত শুনানি এখনও শেষ হয়নি।’
শারমিন ও তসলিমা দুজনেই জানান যে প্রায় সব ক্ষেত্রেই শ্রমিকরা পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পান না।
শ্রম আইনের কথা উল্লেখ করে তারা জানান যে, মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দুই লাখ টাকা। তবে এটি খুব সামান্য এবং ভুক্তভোগীর পরিবারকে এটি পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
শারমিন মনে করেন যে চিকিত্সার ব্যয়, একজন শ্রমিকের বয়স এবং তিনি কত বছর কাজ করতে পারতেন এমন কয়েকটি মানদণ্ড মাথায় রেখে ক্ষতিপূরণ বাড়াতে হবে।
সাভার, গাজীপুরে কারখানার আগুন
টঙ্গীর বিসিক শিল্প এলাকায় ট্যাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেডের একটি প্যাকেজিং কারখানায় ২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর অগ্নিকাণ্ডে কমপক্ষে ৪১ জন শ্রমিক নিহত হন।
ওই ঘটনায় পুলিশ ট্যাম্পাকোর মালিক সৈয়দ মকবুল হোসেনসহ সাত জনের বিরুদ্ধে এবং আগুনে নিহত এক শ্রমিকের বাবা আবদুল কাদের বাদি হয়ে দুটি মামলা করেন।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) শুভাশীষ ধর জানান, কাদেরের করা মামলায় পুলিশ মকবুলসহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে গাজীপুরের একটি আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে।
তিনি আরও জানান মামলার বিচার এখনও চলছে।
পুলিশের পক্ষে টঙ্গী মডেল পুলিশের উপ-পরিদর্শক অজয় কুমার চক্রবর্তীর করা মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো হালনাগাদ তথ্য দিতে পারেননি তিনি।
তিনি বলেন, ‘এটির জন্য সময় প্রয়োজন, ফাইল দেখার পর আমি এই মামলার বিষয়ে আপডেট দিতে পারবো।’
ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের নিরাপত্তায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা এবং পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে এর আগে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ব্লাস্ট, আসক এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবি সমিতি (বেলা) একটি রিট পিটিশন করে।
রিট আবেদনের বিষয়ে চূড়ান্ত শুনানি এখনও হয়নি বলে জানিয়েছেন আবেদনকারী শারমিন আক্তার।
গাজীপুরের গরিব অ্যান্ড গরিব সোয়েটার কারখানায় ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে এবং একই বছরের ডিসেম্বরে আশুলিয়ার নরসিংপুরে হা-মীম গ্রুপের স্পোর্টসওয়্যার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হওয়া মামলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা কোনো হালনাগাদ তথ্য দিতে পারেননি।
গাজীপুরে কমপক্ষে ২১ জন এবং আশুলিয়ায় ২৬ জন শ্রমিক নিহত হয়।
যোগাযোগ করা হলে গাজীপুরের বেসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ফারুক জানান ঘটনাটি ঘটেছে এক দশকেরও বেশি সময় আগে। তাই গরিব অ্যান্ড গরিব কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলার বিষয়ে তার পক্ষে কোনো হালনাগাদ তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ গঠনের আগে এই মামলাটি দায়ের হওয়ায় আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। মামলার চার্জশিট দাখিল হয়েছে কি না, আমি তা বলতে পারবো না।’
হা-মীম গ্রুপের স্পোর্টসওয়্যার কারখানায় আগুন লাগার ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জিয়াউল ইসলাম জানান ওই ঘটনায় করা কোনো মামলা সম্পর্কে তিনি অবগত নন।
‘ওই আগুনের ঘটনায় যদি কোনও মামলা করা হয়, তবে আপনি আদালতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কাছে এটি যাচাই করতে পারেন,’ তিনি বলেন।
(আমাদের গাজীপুর ও সাভার সংবাদদাতা এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন।)
ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন সুমন আলী