ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতের তাণ্ডবের এক বছর, ৫৬ মামলা তদন্তাধীন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতে ইসলামের করা তাণ্ডবের এক বছর পার হলেও হত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দায়ের হওয়া ৫৬টি ফৌজদারি মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। এক বছরেও মামলার তদন্ত কার্যক্রম শেষ করতে পারেনি পুলিশ।
হামলার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীরা এখনো ধরা না পড়ায় তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক, এমনকি ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয় তিতাস আবৃত্তি সংসদের পরিচালক মো. মনির হোসেন বলেন, 'শহরের সকল স্তরের মানুষ এই ঘৃণ্য হামলার ঘটনা সেদিন প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাদের মুঠোফোনের ক্যামেরায় বন্দী করেছেন। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে সবাই দেখলেও পুলিশ এখনো প্রকৃত হামলাকারীদের খুঁজে বের করতে পারেনি। ঘটনার পরে সারাদেশে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ওঠে, কিন্তু এ ঘটনার বিচার কিংবা শাস্তি এখনও অনেক দূরে।'
তিনি আরও বলেন, 'এ অবস্থা চলতে থাকলে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি চালু হবে, সেটা ভবিষ্যতের জন্য আরও ভয়াবহ হবে।'
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা সূত্রে জানা যায়, ৫৫টি মামলায় এখন পর্যন্ত মোট ৭৫৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১২০ জন আসামি বর্তমানে জেলহাজতে এবং ৬৩৮ জন আসামি জামিনে রয়েছেন। তবে তাণ্ডবের মামলায় ৭৫৮ জন গ্রেপ্তার হলেও এজাহারে ছিল মাত্র ৪৬ জনের নাম।
অপর একটি মামলা রয়েছে রেলওয়ে থানায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মোল্লা মোহাম্মদ শাহীন জানান, গত বছরের ২৬, ২৭ ও ২৮ মার্চ জেলা সদর, আশুগঞ্জ ও সরাইল থানা এলাকার বিভিন্ন স্থানে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে অফিসের আসবাবপত্র ও গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেন। এ ঘটনার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানায় ৪৯টি, আশুগঞ্জ থানায় ৪টি এবং সরাইল থানায় ২টি মামলা দায়ের হয়। এসব মামলার মধ্যে ২৭টি সদর থানায়, ১০টি সিআইডি, ৯টি পিবিআই, ৪টি জেলা গোয়েন্দা শাখায়, ৩টি আশুগঞ্জ থানায় এবং ২টি সরাইল থানায় তদন্তাধীন রয়েছে।
মামলার কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'মূলত গ্রেপ্তার অভিযান শেষ হচ্ছে না বলে মামলা ডিলে হচ্ছে। বেশিরভাগ মামলার আসামি হচ্ছেন অজ্ঞাত এবং আসামিও অনেক বেশি। ফলে সময় লাগছে। তবে খুব শিগগির চার্জশিট দেওয়া হবে।'
আদালত সূত্রে জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ৪৯ জন আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন।'
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জজ আদালতের আইনজীবী মো. নাসির মিয়া বলেন, 'শতাধিক নিরপরাধ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা প্রকৃতপক্ষে হামলার সঙ্গে জড়িত নয়। স্থানীয় জনগণ তাদের স্থায়ী জামিন দাবি করেছেন। প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজ করতে হবে। তা না হলে এই ধরণের ঘটনা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুনরাবৃত্তি হবে।'
প্রসঙ্গত, এর আগে পুলিশের গুলিতে এক মাদ্রাসা ছাত্র নিহতের ঘটনায় ২০১৬ সালের ১২ জানুয়ারি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা শহরে নারকীয় তাণ্ডব চালিয়ে রেল স্টেশন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে প্রায় ৭০ কোটি টাকার ক্ষতিসাধন করে।
এ ঘটনার পর সদর মডেল থানায় ১৬টি মামলা করা হয়। এসব মামলায় ৩৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলাগুলো বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর রসরাজ দাসের ফেসবুক আইডি থেকে পবিত্র কাবা শরীফ অবমাননার ছবি পোস্ট করাকে কেন্দ্র করে ইসলামী সংগঠনের ব্যানারে নাসিরনগরের ১৫টি মন্দির ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্তত শতাধিক বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচিত এ ঘটনায় দায়ের হওয়া ৮টি মামলার কোনোটিরই বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়নি গত সাড়ে ৫ বছরেও।
মুজিববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে গত বছরের ২৬ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ৩ দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালায় কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম।
তারা পুলিশ সুপারের কার্যালয়, প্রেসক্লাবসহ সরকারি-বেসরকারি অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান, ২টি মন্দির, সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গন, উপজেলা ভূমি অফিস, জেলা পরিষদ কার্যালয়, পৌরসভা কার্যালয়, পৌর মিলনায়তন, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন, জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারসহ জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
এমনকি থানা ভবন ও ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে চলাচলকারী আন্তঃনগর ট্রেন পর্যন্ত তাদের হামলা থেকে রক্ষা পায়নি।