মালিক গ্রেপ্তার কারখানা বন্ধ, বেতন-বোনাস অনিশ্চয়তায় হাসেম ফুডের কর্মীরা

মুনতাকিম সাদ ও সনদ সাহা

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর কর্মীরা বেতন এবং ঈদ বোনাস নিয়ে আশঙ্কায় পড়েছেন। আগুনে ৫১ জনের মৃত্যুর পর কারখানাটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে এবং এর মালিক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সেখানকার শ্রমিকরা জানান, তাদের ৫১ জন সহকর্মী আগুনে পুড়ে মারা গেছেন এবং বেতন না পেলে তারাও অনাহারে মারা যাবেন। কারখানাটি আবার কবে থেকে কাজ শুরু করবে সে ব্যাপারেও তারা নিশ্চিত নন।

বৃহস্পতিবার আগুনের ঘটনার আগে কারখানা কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছিল যে বেতন, ওভারটাইম ও ঈদ বোনাস ১০ জুলাইয়ের মধ্যে প্রদান করা হবে। তবে, অগ্নিকাণ্ডের পর এটি পিছিয়ে যায়।

বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৩৫ জন হাসেম ফুডসের ১১টি কারখানা-ভবনে কাজ করেন। প্রতিষ্ঠানটি আমের জুস, লাচ্ছি, সেমাই, বিস্কুট, ললিপপ, নোসিলা, চানাচুর, নুডলস, মটর ভাজা, লিচি ড্রিংক, চকলেট ও বিভিন্ন স্ন্যাকস তৈরি করে।
 
সেখানকার কর্মচারীদের সবার মাসিক বেতন একত্রে প্রায় দেড় কোটি টাকা।

তবে, প্রতিষ্ঠানের যেসব কর্তারা ব্যাংক চেকে স্বাক্ষর করবেন, যেমন- হাসেম ফুডস লিমিটেডের মালিক মো. আবুল হাসেম, তার চার ছেলে (প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক) এবং কারখানার চিফ অপারেটিং অফিসার ও ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজারসহ তিন কর্মকর্তা এখন ওই কারখানার ৫১ জন কর্মচারীর মৃত্যুর অভিযোগে কারাগারে আছেন।

দ্য ডেইলি স্টার সেখানকার কমপক্ষে ২০ জন কর্মীর সঙ্গে কথা বলেছে।

তাদের মধ্যে কেউ কেউ অভিযোগ করেন যে, কারখানাটি প্রায়শই তাদের ওভারটাইমের বেতন বকেয়া রাখে।

এই শ্রমিকদের গড় বেতন মাসে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা। তাই তারা প্রায় সবাই অতিরিক্ত অর্থের জন্য ওভারটাইম কাজ করেন।

গত ১ জুলাই প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজনের পর তারা ওভারটাইমের বেতন পেয়েছেন।

কারখানার বৈদ্যুতিক মিস্ত্রী রুবেল মিয়া দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ঈদের আগে আমাদের বেতন ও বোনাস পাওয়ার কথা ছিল। এমন সময়ই আগুন লেগেছে। কারখানার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা ১৩ জুলাই (আজ) পরিশোধ করবেন। কিন্তু তারপর মালিক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা গ্রেপ্তার হয়েছেন। আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে তাও জানি না।’

বৃহস্পতিবার বিকালে মারাত্মক আগুন থেকে বাঁচতে ছয় তলা ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে লাফিয়ে পড়েন প্রোডাকশন সুপারভাইজার আশরাফুল ইসলাম। বর্তমানে কোমর ও পিঠে ভাঙা অবস্থায় তিনিসহ ছয় জন রূপগঞ্জের ইউএস বাংলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘ঈদ কয়েকদিন পরই উদযাপিত হবে, তবে আমাকে হাসপাতালে থাকতে হবে। আমার কোমর ও পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা। চিকিত্সকরা দুই মাস বিছানায় শুয়ে বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছেন। এখন আমার চিকিত্সা খরচ কে দেবে? আমার পরিবারের খরচ কে বহন করবে?’

সাত বছর ধরে কারখানার জুস তৈরির শাখায় কাজ করছেন আবদুল হাকিম। তিনি বলেন, ‘কারখানায় কোনো কাজ হচ্ছে না। বেতন নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। যদি (কারখানা) আবার কার্যক্রম শুরু না করে, আমরা কীভাবে আমাদের পরিবার নিয়ে বাঁচব? বাড়ি ভাড়া ও দোকান ভাড়া বাকি। তাছাড়া, গ্রামে থাকা আমার বাড়ির সদস্যরাও আমার কাছ থেকে টাকা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। এবার আমরা অনাহারে মারা যাব।’

এ বিষয়ে ম্যানেজার (অ্যাকাউন্টস) নাহিদ মুরাদ বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের মালিক যদি কারাগারে না থাকতেন, তাহলে বেতন দেওয়া যেত। এখন মালিকসহ প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্মকর্তারা কারাগারে আছেন। তারপরেও আমরা চেষ্টা করছি সবার বেতন দিয়ে দিতে… শুধু বেতন নয়, আমাদের মালিক কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃতদের পরিবার ও আহত শ্রমিকদেরও সহায়তা করবেন। গ্রেপ্তারের আগে তিনি সবার সঙ্গে কথা বলেছেন।’

কারখানা পুনরায় খোলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সময় লাগবে। বেতন পরিশোধের পর কারখানা পুনরায় চালু করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এখনই কিছুই বলা যাচ্ছে না।’

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় রূপগঞ্জের কর্ণগোপ এলাকার হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কারখানার একটি ছয়তলা ভবনের নিচতলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। অল্প সময়ের মধ্যে আগুন ওপরের ফ্লোরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। আগুন লাগার পর পরই ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে তিন জন মারা যান। আহত হন ১০ জন। ভয়াবহ আগুনে ৫১ জন শ্রমিক ও কর্মচারী প্রাণ হারান।

পরদিন শুক্রবার বিকালে আগুন নিভিয়ে ফেলার পর ৪৮ জনের পোড়া মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

হতাহতের মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু। মরদেহগুলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে রাখা হয়েছে।

এ ঘটনায় অবহেলার অভিযোগ মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় কারখানার মালিক মো. আবুল হাসেমসহ তার চার ছেলে ও ডিজিএম, এজিএম ও প্রকৌশলীসহ আট জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের গত শনিবার চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।