রূপগঞ্জে অগ্নিকাণ্ড: জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনে ২০ সুপারিশ
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ৫১ জন নিহতের ঘটনায় জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
৪৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে শিশুশ্রম, ভবন নির্মাণের অনুমতি না থাকাসহ কারখানার মালিকের অনিয়ম এবং ভবিষ্যতে এসব দূর্ঘটনা রোধে ২০টি সুপারিশ করা হয়েছে।
আজ সোমবার দুপুরে দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য জানান নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোস্তাইন বিল্লাহ।
তিনি বলেন, 'গত ৫ আগস্ট রাতে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শামীম বেপারী ৪৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। তারা ওই অগ্নিকাণ্ড থেকে জীবিত ফিরে আসা ২১ জনের জবানবন্দি নিয়েছেন। ভবন মালিকের অনিয়মসহ ভবিষ্যতে অগ্নি দুর্ঘটনা রোধে করণীয় ২০টি সুপারিশও দিয়েছেন।'
মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, 'ভবনটির নিচতলায় সেন্ট্রাল কমপ্রেসার সেন্টারের পাশে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগেছে এবং প্রতি ফ্লোরে প্রচুর পরিমাণ দাহ্য পদার্থ থাকায় দ্রুত আগুনটি ছড়িয়ে গেছে। এ ছাড়াও, ভবন মালিক সরকারের বিভিন্ন সংস্থার যে নিয়মকানুন, আইন ও বিধিবিধান আছে সেগুলো প্রতিপালন করেননি। যার ফলে এ দূর্ঘটনাটি সংগঠিত হয়েছে।'
ডিসি বলেন, 'তদন্ত প্রতিবেদনে ২০টি সুপারিশ করা হয়েছে। এখানে যারা মারা গেছেন তাদেরকে শ্রম আইন ২০০৬ অনুসারে দুই লাখ টাকা ও যারা আহত হয়েছেন তাদেরকে আড়াই লাখ টাকা করে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এ ছাড়া, যারা মারা গেছেন ওই পরিবারের কেউ কর্মক্ষম থাকলে এ কোম্পানির অন্য কোনো গ্রুপে তার যোগ্যতা অনুসারে চাকরি দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। কালকারখানাসহ সরকারের অন্যান্য দপ্তরগুলোতে জনবল বাড়িয়ে বেশি মনিটরিং করার জন্য বলা হয়েছে। শিশুশ্রম বন্ধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যেন আরও উদ্যোগ গ্রহণ করে, কোনোভাবেই শিশুশ্রমের অনুমতি যেন না দেওয়া হয় এবং এজন্য মনিটরিং বাড়াতে বলা হয়েছে। বিল্ডিং কোড মানা, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র আরও বেশি রাখা, প্রশিক্ষিত অগ্নিনির্বাপণ দল কারখানায় রাখা এবং শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।'
তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক সৌমেন বড়ুয়া দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'পরিবেশ অধিদপ্তর, রাউজক কিংবা উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ভবন নির্মাণসহ কোনো কাগজপত্র তারা দেখাতে পারেননি। তদন্তে এসব অনিয়মসহ আরও কিছু বিষয়ে কারখানার মালিকের অনিয়ম পাওয়া গেছে।'
উল্লেখ্য, গত ৮ জুলাই বিকেলে উপজেলার কর্ণগোপ এলাকায় হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কারখানার ১৪ নম্বর গুদামের ছয়তলা ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় তাৎক্ষণিক ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে তিন জন মারা যান এবং ১০ জন আহত হন। প্রায় ১৯ ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পরদিন শুক্রবার বিকেলে আগুন নিভিয়ে ফেলার পর ৪৮ জনের পোড়া মরদেহ উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। এ ঘটনায় রূপগঞ্জ থানাধীন ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক নাজিম উদ্দিন বাদী হয়ে কারখানার মালিক আবুল হাসেমসহ ৮ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করে নিরাপত্তা না থাকাসহ বিভিন্ন অবহেলার অভিযোগ এনে রূপগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় উল্লেখিত আসামি কারখানার মালিক মো. আবুল হাসেম, তার চার ছেলে এবং কারখানার ডিজিএম, এজিএম ও ইঞ্জিনিয়ারসহ আট জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে হাজির করে। পরে আদালত থেকে কারখানার মালিক আবুল হাসেম, তার চার ছেলে জামিনে বের হয়ে আসেন। আর ডিজিএম, এজিএম ও ইঞ্জিনিয়ার তিন জন বর্তমানে কারাগারে আছেন। পরবর্তীতে এ মামলাটি তদন্তভার সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়।
এ ঘটনায় তাৎক্ষণিক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। জেলা প্রশাসনের পাঁচ সদস্যের কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন সাত কার্যদিবস, ফায়ার সার্ভিসের পাঁচ সদস্যের কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন সাত কার্যদিবস এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পাঁচ সদস্যের কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।
এদিকে, গত ৪ আগস্ট থেকে তিন দিনে আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া ৪৮ জনের মধ্যে ডিএনএ পরীক্ষার পর ৪৫ জনের মরদেহ তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখনো তিন জনের মরদেহের ডিএনএ পরীক্ষা বাকি আছে।