মা-বাবা যেভাবে শিশু সন্তানকে নিয়ে সুগন্ধায় লাফিয়ে পড়লেন!

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

'লঞ্চের অন্য পাশ থেকে লোকজন চিল্লাচ্ছে, ভাই আপনারা এদিকে আসেন, এপাশে আসেন, এদিকে মাটি আছে। পরে সেই ধোঁয়া আর অন্ধকারের মধ্যে ওপাশে গিয়ে কোনো কিছু না ভেবেই লাফ দিলাম', এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান সেদিন লঞ্চে আগুন থেকে বেঁচে ফেরা মেহেরিনা কামাল মুন।

গত ২৩ ডিসেম্বর রাতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী এমভি অভিযান-১০ নামের যাত্রীবাহী লঞ্চের যাত্রী ছিলেন মুন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় মুন তার স্বামী ও ২ বছর বয়সী মেয়ের সঙ্গে বরগুনা যাওয়ার উদ্দেশে রাজধানীর সদরঘাট থেকে লঞ্চে ওঠেন। ওই রাতেই তিনি প্রত্যক্ষ করেন ভয়াবহতম লঞ্চ দুর্ঘটনার।

সোমবার মুন তার ফেসবুক পোস্টে ওই রাতের ভয়াবহতার বর্ণনা দিয়ে লেখেন, 'জানি না এইসব এখানে বলার মতো কি না! শুধু আল্লাহর অশেষ অশেষ অশেষ রহমতে নিজের বেঁচে ফেরার অভিজ্ঞতা বলতে আসলাম। এক কথায় যদি বলি, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা বা মৃত্যু আসতে দেখা।'

'২৪ তারিখ রাত তখন আনুমানিক ২টা ১৫ থেকে ২০ মিনিট। আমার ঘুম ভেঙে গেছে এমনিতেই। ওয়াশরুমে গেলাম। এর মধ্যে মেয়েও উঠে বলে- ফিডার, দুদু খাবে। মেয়েকে খাইয়ে মাত্রই শুয়েছি। এরই মধ্যে চিল্লাচিল্লি শুনে রুম থেকে বের হলাম দেখার জন্য। কেবিনের সামনের রেলিং দিয়ে উঁকি দিয়েই দেখি আগুন। এক সেকেন্ডও কোনো কিছু চিন্তা না করে রুমে ঢুকে জাস্ট মোবাইল আর বাচ্চাটা কোলে নিলাম।'

'দৌঁড়ে গেলাম ৩ তলার একেবারে সামনের দিকে। মাথায় ছিল খোলা জায়গায় থাকতে হবে। কিন্তু নামব কীভাবে, কোনো পথ পাচ্ছিলাম না। এইটুকু বাচ্চা নিয়ে ৩ তলা থেকে পানিতে নামা মানে বাঁচার সম্ভাবনা কমে যাওয়া।'

tds_35.jpg
আগুন লাগার পর সকালে সুগন্ধা নদীতে অভিযান-১০। ছবি: স্টার

'লঞ্চ ঝালকাঠি ঘাটের কিছুটা কাছাকাছি আসার পরে ৪০-৫০ জন পানিতে ঝাঁপ দিয়ে নেমে গেছে। আমরা উপর থেকে সেটাও সাহস করতে পারিনি। আমিই বেশি আতঙ্কিত ছিলাম। কীভাবে নামব এই বাচ্চা নিয়ে। ওর বাবা বললে, পানিতে নামা লাগলেও নিচ তলা থেকে নামব। এই বলে সে পরে থাকা জিন্স প্যান্ট খুলে ফেলে। এ সবের মধ্যে লঞ্চের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে লঞ্চ মাঝ নদীতে চলে আসছে।'

'তখন পানিতে নামা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু যতটা কাছ থেকে নামা যায়। এর মধ্যে আমাদের সামনে এক নারী নিজের পরার শাড়ি খুলে রেলিংয়ে বেঁধে নেমে গেলেন নিচের দিকে। সেই শাড়ি ঝুলে ছিল। রাজিব (মুনের স্বামী) ভাবল ওই শাড়ি দিয়েই মেয়েকে নিয়ে নামব। আমার জাস্ট ৫-৭ সেকেন্ডে মাথায় কাজ করল, যদি বেঁচে যাই, তাহলে মোবাইলটা জরুরি।'

'আমি আমার মোবাইলটা ওড়নার এক মাথায় বেঁধে সেই ওড়না দিয়েই মেয়েকে ওর বাবার কোমরে বেঁধে দিলাম। কারণ চিন্তা আসলো হাতে নিয়ে নামলে যে কোনো সময় হাত ছুটে যেতে পারে। এসব করতে করতে তখন আগুন ৩ তলায়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি ভয়াবহ কালো ধোঁয়ার মধ্যে আগুনের হল্কা। মেয়ে শ্বাস নিতে পারছিল না। মেয়ের বাবা নেমে গেল। আমিও তার পেছনে পেছনে নামলাম কিন্তু দোতলা পর্যন্ত নেমে সেই শাড়ি শেষ। অন্ধকার-ধোয়ায় রেলিং আর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এক লোক একটানে আমাকে নিচের ফ্লোরে নামিয়ে আনল।'

'এর মধ্যে লঞ্চের অন্য পাশ থেকে লোকজন চিল্লাচ্ছে, ভাই আপনারা এদিকে আসেন, এপাশে আসেন এদিকে মাটি আছে। পরে সেই ধোঁয়া, অন্ধকারের মধ্যেই ওপাশে গিয়ে কোনো কিছু না ভেবেই লাফ দিলাম। মনে হলো আল্লাহ যেন নিজে ঠেলে লঞ্চটা সাইডে নিল। কাঁদার মধ্যে পা আটকে পা মচকালো।'

'উঠে দাঁড়ানোর শক্তি নেই। মেয়ের বাবা জাস্ট হাত ধরে মাত্রই দাঁড় করিয়েছে। এর মধ্যেই পেছন দিকে এক সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে গেল। জাস্ট ভাবছি, এক-দেড় মিনিট দেরি হলে কী হতো জানি না, আল্লাহ জানে।'

মুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, 'সেদিন রাতে স্থানীয়রা আমাদের খুব সহযোগিতা করেছেন। আমাদের উদ্ধার থেকে শুরু করে খাবার-দাবার দেওয়া, শুকনো কাপড়ের ব্যবস্থা করাসহ সবকিছু দিয়ে সাহায্য করেছেন। এ ছাড়া গ্রামবাসী আহতদের ট্রলারে করে দুর্ঘটনা স্থল থেকে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন।'

দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য লঞ্চের কর্মচারীদের অবহেলাকে দায়ী করে মুন বলেন, 'তাদের কোনো দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়নি। আগুন লাগার পর কাউকে ডাকেনি। নিজেরা হয়তো নিজেদের মতো করে আগেই নেমে গেছে। কাউকে কোনো সতর্কতা দেয়নি, কাউকে তখন চোখেও পড়েনি।'