এক্সপ্লেইনার

বেনজীর গ্রেপ্তার: কীভাবে কাজ করে ইন্টারপোল, ‘রেড নোটিশ’ আর কত বাংলাদেশির বিরুদ্ধে

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

বিশ্বের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল, যার বর্তমান সদস্য দেশ ১৯৬টি। ইন্টারপোলের মূল কাজ বিশ্বজুড়ে অপরাধীদের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা এবং বিভিন্ন দেশের পলাতক আসামিদের খুঁজে বের করতে সহযোগিতা করা।

তবে, এটি কোনো দেশের নিজস্ব গোয়েন্দা বাহিনী বা পুলিশের মতো সরাসরি কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে না, বরং সদস্য দেশগুলোর পুলিশের মধ্যে অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান এবং সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে।

সম্প্রতি, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ থাকা বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই পুলিশ।

আজ রোববার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর জানা গেছে, রেড নোটিশের ভিত্তিতেই ইন্টারপোল বেনজীরকে আটক কতে আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানায়।

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের ভিত্তিতে ঢাকার আদালতের নির্দেশের পর গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ সদর দপ্তর ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) মাধ্যমে ইন্টারপোলের কাছে রেড নোটিশ জারির বিষয়ে অনুরোধ জানায়।

সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এনসিবি এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগ সরকারের ১২ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশের অনুরোধ জমা দিয়েছে।

কীভাবে কাজ করে ইন্টারপোল

ইন্টারপোলের ওয়েবসাইট থেকে জানা গেছে, পুলিশের তদন্ত সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের জন্য সদস্য দেশগুলো একে অপরের সঙ্গে এবং ইন্টারপোলের জেনারেল সেক্রেটারিয়েট বা সাধারণ সচিবালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে।

সদস্য দেশগুলোতে একটি করে ইন্টারপোল ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) বা জাতীয় কেন্দ্রীয় ব্যুরো থাকে, যা সেই দেশের জাতীয় পুলিশকে বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করে।

সদস্য দেশগুলো প্রতি বছর তাদের নীতি, কাজের পদ্ধতি, অর্থায়ন ও বিভিন্ন কার্যক্রমের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। এর পাশাপাশি, অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য প্রতি বছর এনসিবি প্রধানদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

ইন্টারপোলের তথ্য অনুযায়ী, সাইবার ক্রাইম কিংবা সংগঠিত অপরাধী চক্রের কর্মকাণ্ড বা চোরাকারবার কোনো দেশের জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে যায়, তখন তা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা দিয়ে থাকে সংস্থাটি।

অপরাধের তথ্য আদান-প্রদান: সদস্য দেশগুলোর এনসিবি নিজ দেশের আইন অনুযায়ী ইন্টারপোলের ডেটাবেসে অপরাধের তথ্য সরবরাহ করে।

তদন্তে সহযোগিতা: আন্তঃসীমান্ত তদন্ত, অভিযান ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে এনসিবিগুলো একে অপরকে সহযোগিতা করে। দেশের সীমানার বাইরে তদন্ত এগিয়ে নিতে সদস্য দেশগুলোর কাছে সহযোগিতা চাওয়া যায়।

এনসিবির গঠন: কোনো দেশের পুলিশ বাহিনীর উচ্চ-প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের একটি অংশ এতে কর্মরত থাকেন। কাঠামোগতভাবে এনসিবি কাজ করে দেশের পুলিশ প্রধানের সঙ্গে। সংস্থাটি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে।

ইন্টারপোলের রেড নোটিশ

ইন্টারপোলের 'রেড নোটিশ' মানে প্রত্যর্পণ, আত্মসমর্পণ বা অনুরূপ কোনো আইনি ব্যবস্থার অপেক্ষায় থাকা কোনো অভিযুক্তকে খুঁজে বের করতে এবং সাময়িকভাবে গ্রেপ্তার করার জন্য বিশ্বব্যাপী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর প্রতি একটি অনুরোধ।

অনুরোধকারী দেশের বিচার বিভাগের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা আদালতের আদেশের ওপর ভিত্তি করে রেড নোটিশ দেয় ইন্টারপোল।

রেড নোটিশে সাধারণত দুই ধরনের তথ্য থাকে। অভিযুক্তকে শনাক্ত করার মতো তথ্য, যেমন—তাদের নাম, জন্মতারিখ, জাতীয়তা, চুল ও চোখের রঙ এবং ছবি ও আঙুলের ছাপ। আর, যে অপরাধের জন্য খোঁজা হচ্ছে সে সম্পর্কে তথ্য।

কোনো অভিযুক্তকে খুঁজতে রেড নোটিশ এটি আন্তর্জাতিক সতর্কতা, কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়।

বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ

ইন্টারপোলের অফিসিয়াল তথ্য এবং বাংলাদেশ পুলিশের এনসিবি শাখার রেকর্ড অনুযায়ী, বাংলাদেশের অনেক পলাতক আসামির বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ আছে। তাদের মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী, যুদ্ধাপরাধী, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের আসামি ও বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্তরা আছেন।

ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৬ হাজার ৪৪২ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি আছে। তালিকায় বাংলাদেশের ৫৯ জনের নাম আছে।

তালিকার প্রথমেই আছে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত রাজু ঢালির (৪২) নাম। সিঙ্গাপুর থেকে তার নামে রেড নোটিশ জারির অনুরোধ পায় ইন্টারপোল।

চার নম্বরে আছে রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খান (৩৮) নাম। দুবাই প্রবাসী এই স্বর্ণ ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ঢাকায় এক পুলিশ পরিদর্শক হত্যা মামলার অভিযোগে রেড নোটিশ জারির অনুরোধ করেছিল বাংলাদেশ।

তালিকায় আছে আছে চট্টগ্রামে ৮ হত্যা মামলার আসামি ৪৭ বছর বয়সী সাজ্জাদ হোসেনের নাম। আরও আছে শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীর, প্রকাশ, জিসান, গোলাম ফারুক অভির নাম।

এছাড়া, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি খন্দকার আবদুর রশীদ, শরীফুল হক ডালিম, ৭১ এর মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত আবুল কালাম আজাদ, সৈয়দ হাসান আলীর নাম।

তালিকায় ভারতের ২২৮, পাকিস্তানের ১৭১ ও যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ জনের নামও আছে।

তবে, ইন্টারপোলের রেড নোটিশের তালিকায় থাকা নামগুলো নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়। যেমন এতে নতুন অপরাধীদের নাম যুক্ত হয়, আবার কোনো আসামি গ্রেপ্তার হলে, মারা গেলে কিংবা আইনি প্রক্রিয়ায় খালাস পেলে তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়।

ইন্টারপোলের রেড নোটিশ কাদের বিরুদ্ধে দেওয়া হয় জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি এএইচএম শাহাদাত হোসাইন (মিডিয়া) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এটি তাদের নিজস্ব পলিসির ওপর নির্ভর করে। কোনো দেশ থেকে অনুরোধ পাওয়ার পর তার রেড নোটিশ জারি করে। অনেক সময় আইনি বা অন্য কোনো কারণে নাম প্রকাশ নাও করতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে রেড নোটিশ ইস্যু করলেও তা ওয়েবসাইটে দেওয়া হয় না।'

বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এখন মূল যোগাযোগটি হবে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে। এনসিবির কাজ হলো আইনের আলোকে বা মামলার গ্রাউন্ডের ওপর ভিত্তি করে একটি সামারি বা মেমোরেন্ডাম রেডি করে দেওয়া। দুবাই পুলিশ সেখানে গ্রেপ্তার করার পর তাদের এনসিবিকে জানিয়েছে। তাদের এনসিবি আবার আমাদের (বাংলাদেশের) এনসিবিকে জানাল। তারপর সরকারকে জানানো হয়েছে। বাকি প্রক্রিয়া স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পন্ন করবে।'