নারায়ণগঞ্জে বাস-ট্রেন সংঘর্ষের কারণ ব্যারিয়ার না ফেলা ও যানজট
নারায়ণগঞ্জ শহরে বাস ও ট্রেন সংঘর্ষের পেছনে রেলক্রসিংয়ের ব্যারিয়ার না ফেলার পাশাপাশি যানজটকেও দায়ী করেছেন ফায়ার সার্ভিস, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। রোববার সন্ধ্যা ৬টার দিকে শহরের ১ নম্বর রেলগেট এলাকায় বাস ও ট্রেনের সংঘর্ষে শিশুসহ ৩ জন নিহত হয়েছে।
এ ঘটনায় আহত হয়েছে নারী ও শিশুসহ ৮ জন। তাদের মধ্যে ৭ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
সন্ধ্যার পর বাস-ট্রেন সংঘর্ষের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে যায়। ভিডিওতে দেখা যায়, রেলক্রসিংয়ের ব্যারিয়ারগুলো ফেলা হয়নি। আর ট্রেন লাইনের উপর আনন্দ পরিবহনের বাস দাঁড়িয়ে আছে। আর ট্রেনটি দ্রুতগতিতে এসে বাসটিকে ধাক্কা দেয়।
ভিডিওতে বাসটিকে ১০ থেকে ১৫ হাত দূরে ধাক্কা দিয়ে নিয়ে যেতে দেখা যায় ট্রেনটিকে। রেলক্রসিংয়ের ব্যারিয়ার ভেঙে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারের উপর গিয়ে পড়ে এবং বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে রেল লাইনের ২ পাশে ফুটপাতে দোকানদার ও পথচারীরা আহত হয়।
নারায়ণগঞ্জ রেল স্টেশনের স্টেশন মাস্টার সি এম আক্তার হায়দার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ঢাকা থেকে ৫টা ২০ মিনিটে ট্রেনটি ছেড়ে আসে। ৬টা ৫ মিনিটে ১ নম্বর রেলগেটে বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। তীব্র যানজট থাকায় রেল ক্রসিংয়ের ব্যারিয়ার ফেলা সম্ভব হয়নি। এ সুযোগে বাসটি ট্রেন লাইনে এসে থেমে থাকে।'
ভিডিওটি দেখে তিনি বলেন, 'স্টেশনে আসা ট্রেনের গতি আরো কম থাকার কথা ছিল। তাছাড়া রেল ক্রসিংয়ের ব্যারিয়ারও ফেলা হয়নি। এখানে কে কোন দায়িত্বে অবহেলা করেছে, তা তদন্তের পর বলা যাবে।'
স্থানীয়দের অভিযোগ, লাইনে বাস থাকার পরও গেট কিপার লাল পতাকা দিয়ে কোনো সর্তক সংকেত দেয়নি।
তিনি বলেন, 'এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।'
এ বিষয়ে জানতে গেট কিপার মো. হানিফের মোবাইলে একাধিকবার চেষ্টা করে তার নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
১ নম্বর রেলগেট এলাকায় যানজট নিরসনের দায়িত্বে থাকা কমিউনিটি পুলিশের সদস্য দুখু মিয়া প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এখানে বিকেল ৫টা থেকেই যানজট লেগে ছিল। কোনো গাড়ি যেতে পারছিল না। যানজটের কারণে লাইনের উপরে বাসটি দাঁড়িয়ে ছিল। আর তার সামনে একটি কাভার্ড ভ্যান। তাই বাসটি সামনে পেছনে যেতে পারছিল না। তখনই ট্রেন এসে বাসটিকে ধাক্কা দেয়।'
তিনি বলেন, 'গেট কিপার কোনো রেড সিগনাল দেয়নি যে লাইন ক্লিয়ার না। আর ৫ মিনিট আগে ব্যারিয়ার ফেলবে, কিন্তু লাইনের উপরে থাকা বাসের কারণে সেটাও করতে পারেনি। এজন্যই সংঘর্ষ হয়েছে।'
ঘটনার পর আনন্দ বাসের চালক ও টিকেট কাউন্টার থেকে লোকজন পালিয়ে যায়। বাস টার্মিনালে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তবে উৎসব পরিবহনের কর্মী রনি ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এ রেল ক্রসিংয়ে গেট কিপার ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেন না। কখনো থাকে, আবার কখনো থাকে না। তার পরিবর্তে পাশের একটি পানের দোকানদার ব্যারিয়ার নামায়-ওঠায়। ট্রেন আসার অন্তত ৫ থেকে ৭ মিনিট আগে ব্যারিয়ার ফেলবে। কিন্তু আজকেও ব্যারিয়ার ফেলতে দেরি করেছে যার জন্য বাস লাইনের উপরে চলে আসছে।'
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স নারায়ণগঞ্জের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন ডেইলি স্টারকে বলেন, 'রেলক্রসিংয়ের ব্যারিয়ার ফেলার সময় বাসটি রেললাইনের উপরে চলে আসে। তবে যানজটে সামনে ও পেছনে গাড়ি থাকায় বাসটি লাইন থেকে সরতে পারেনি। তারপরই সংঘর্ষ হয়। তবে তদন্ত শেষে বিস্তারিত বলা যাবে।'
এ দিকে সংঘর্ষের ঘটনায় রাতে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহর নির্দেশে একটি ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোসাম্মৎ রহিমা আক্তারকে প্রধান করা হয়েছে কমিটির। কমিটিতে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, বিআরটিএ ও রেলওয়ের সদস্য আছেন।
ডিসি মোস্তাইন বিল্লাহ ডেইলি স্টারকে বলেন, '১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য তদন্ত কমিটিকে বলা হয়েছে।'
এ ঘটনায় নিহতদের ২৫ হাজার ও আহতদের ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।