ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত অগ্নিকাণ্ডে বেঁচে ফেরা কর্মীরা
দুই মাস আগে ঢাকা থেকে রূপগঞ্জে তাদের বাড়িতে ফেরার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় পা ভেঙে যায় মনোয়ারা বেগমের স্বামীর। তিন সন্তান ও আহত স্বামীর দেখভালের জন্য মাত্র ১৫ দিন আগে হাসেম ফুডস লিমিটেডে যোগ দিয়েছিলেন ৩৫ বছর বয়সী মনোয়ারা।
তবে, প্রথম মাসের বেতন হাতে পাওয়ার আগেই জীবনের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনার মুখোমুখি হন তিনি। যে কারখানায় কাজ করতেন, সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তার ৫১ জন সহকর্মী পুড়ে মারা যান।
যেকোনো উপায়ে পালাতে হবে, তা না হলে পুড়ে মারা যাবেন এই চিন্তা করে ওই ভবনের তৃতীয় তলা থেকে লাফ দেন মনোয়ারা। এতে তার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ভেঙে যায়।
তার মতো আরও ছয় জন কর্মী, যারা ওই ভবন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এখন ইউএস-বাংলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন। সারা শরীরে ব্যথা, প্লাস্টার করা হাত-পা নিয়ে এখন তারা চিকিৎসা খরচের জোগান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
হাসপাতালের শয্যায় থেকে মনোয়ারা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘যখন আমি নিচ তলায় যাওয়ার চেষ্টা করি, সিঁড়িতে আগুন দেখতে পেয়ে তৃতীয় তলায় ফিরে আসি। ততক্ষণে পুরো জায়গাটা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। আগুনের তাপে মনে হচ্ছিল চামড়া গলে যাচ্ছে। আমি তৃতীয় তলা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা ভাবছিলাম। তখন পেছন থেকে আরও কয়েকজন আমার ওপর এসে পড়লে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফেরার পর দেখি আমি হাসপাতালে।’
‘আমার আহত স্বামী অনাহারে আছেন। ছেলে-মেয়ের দেখাশোনা কে করবে? কে আমার চিকিৎসা খরচ বহন করবে?’, প্রশ্ন মনোয়ারার।
হাসপাতালের এক থেকে চার নম্বর শয্যায় তার মতো অবস্থায় সোনিয়া আক্তার, রোজিনা, মারিয়া ও নাদিয়া শুয়ে আছেন। পাঁচ নম্বর শয্যায় মনোয়ার নিজে, ছয় নম্বর শয্যায় রুমা এবং পুরুষদের ওয়ার্ডের পাঁচ নম্বর শয্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন আশরাফুল ইসলাম।
লকডাউনের কারণে বাবা কাজে যেতে পারছিলেন না বলে ১৪ বছর বয়সী সোনিয়া পাঁচ হাজার ৬০০ টাকা বেতনে ওই কারখানায় চাকরি শুরু করেন।
সোনিয়ার বাবা দিনমজুর আবদুল কাদের বলেন, ‘কাজে যোগ দেওয়ার পর প্রায় দেড় মাস হয়েছে। তার বেতন পাওয়ার সময় হয়ে এসেছিল, কিন্তু এখন আর সেটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বাসায় খাবার কেনার জন্য আমার কাছে কোনো টাকা নেই। জানি না কীভাবে মেয়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করব?’
‘সোনিয়ার বাম হাত ভেঙে গেছে। ডাক্তাররা বলছেন, একটি অস্ত্রোপচার করাতে হবে, যার জন্য ৫০ হাজার টাকার মতো লাগবে। যদি দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে অস্ত্রোপচারটি না করা হয়, তাহলে তার ওই হাতটি দিয়ে আর কখনো কাজ করতে পারবে না। এই টাকা কোথা থেকে আসবে?’, বলেন আবদুল কাদের।
সোনিয়ার বড় বোন রিমা (১৬) কাজ করতেন কারখানার নিচ তলায়। তিনিও অগ্নিকাণ্ড থেকে বেঁচে গেছেন।
ছয় তলা ভবনের চতুর্থ তলা থেকে ৪৮টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। অনেক কর্মী অভিযোগ, ওই তলার গেট তালাবদ্ধ ছিল দেখে সেখানে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছেন। ওই তলাতে ক্রিম-চকো, আইস বার, চকোলেট ও ললিপপ তৈরি করা হতো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, তারা তদন্ত করে দেখবেন চতুর্থ তলার সুপারভাইজার মাহবুবুর রহমান ফোনের মাধ্যমে কর্মীদেরকে আটকে রাখার কোনো নির্দেশ পেয়েছিলেন কী না।
কর্মীরা জানিছেন, ইতোমধ্যে সরকার ক্ষতিপূরণ বাবদ কিছু টাকা দিয়েছে, তবে তারা সেখান থেকে খুব কম পরিমাণ অর্থ হাতে পেয়েছেন।
৫১ জন কর্মীকে পুড়িয়ে মারার অভিযোগে গত শনিবার হাসেম ফুডস লিমিটেডের মালিক আবুল হাসেম ও তার চার ছেলেসহ আরও তিন জনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মীর্জা আজমসহ আরও বেশ কয়েকজন গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘এটাকে ‘দুর্ঘটনা’ বলা যাবে না, বরং ‘পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ মনে হচ্ছে।’
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে সরকারের সার্বিক ব্যর্থতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাদের একটি পরিদর্শন অধিদপ্তর আছে, যেখানকার পরিদর্শকদের দায়িত্ব হচ্ছে রাসায়নিক পদার্থগুলো কতটুকু দূরে আছে তা পরিদর্শনের মাধ্যমে যাচাই করা। তারা যদি এখানে আসতেন, তাহলে বুঝতে পারতেন বিপদ কোথায় আছে। এখানে সব ধরনের প্রাথমিক নিয়মগুলো অমান্য করা হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতির কারণে তারা যথাযথ পরিদর্শন না করেই প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন।’
এছাড়া তিনি ওই ফ্যাক্টরিতে পুড়ে মারা যাওয়া প্রত্যেক কর্মীর পরিবারবর্গের জন্য ৫০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণের দাবি জানান।
জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) একটি চরম অবহেলা ও দুর্নীতির জায়গা। তারা টাকার জন্য কারখানা পরিদর্শন করেন। যদি কারখানা পরিদর্শকসহ এই সরকারি কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনা হয়, তা হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটবে না।’
এই বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার উল্লেখ করে এই ঘটনার ন্যায়বিচার দাবি করেন জোনায়েদ সাকি।
প্রতিবেদনটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান।