পড়ার সময় গান শোনা, ভালো না খারাপ?
পরীক্ষার আগে পড়তে বসে কানে হেডফোন গুঁজে নেওয়া এখন অনেক শিক্ষার্থীরই অভ্যাস। বিষয়টি মোটেও ইতিবাচকভাবে নিতে পারেন না, মা-বাবা কিংবা শিক্ষকরা। তারা এটি দেখে প্রায়ই প্রশ্ন করেন, ‘গান শুনতে শুনতে আবার লেখাপড়া হয় না কি?’
তবে মজার বিষয় হলো, বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই পড়া বা হোমওয়ার্ক করার সময় কোনো না কোনো ধরনের গান শুনে থাকে।
এখন প্রশ্ন হলো—গান কি সত্যিই পড়ায় সাহায্য করে না কি মনোযোগ নষ্ট করে?
যুক্তরাজ্যের ওয়েস্টমিনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত ও স্মৃতিবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক ক্যাথরিন লাভডে বলছেন, এই প্রশ্নে উত্তর নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের ওপর, ব্যক্তি কেমন, কী ধরনের গান শুনছে এবং কী পড়ছে।
পড়তে বসার আগে গান কি কাজে আসে
অনেক শিক্ষার্থী বই খুলে বসার আগেই ক্লান্তি বা অনীহা প্রকাশ করে। এমন সময় প্রিয় কোনো গান পড়ায় বসতে উৎসাহ যোগাতে পারে।
অধ্যাপক লাভডে বলেন, খেলোয়াড়েরা যেমন প্রতিযোগিতায় নামার আগে নিজেদের উদ্দীপ্ত করতে গান শোনেন, শিক্ষার্থীরাও তেমনি পড়ার আগে এমন গান বেছে নিতে পারে যা তাদের চাঙা করে।
এ ধরনের গান মস্তিষ্কে ডোপামিনের কার্যক্রম বাড়াতে সাহায্য করে। ফলে মন ভালো হয়, উদ্যম বাড়ে এবং কাজ শুরুর আগ্রহ তৈরি হয়।
এমনকি গান আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে এবং কাজ ফেলে রাখার প্রবণতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
শান্ত হতে গান কতটা সহায়ক
সব শিক্ষার্থী এক রকম নয়। কেউ পড়তে বসার আগে চনমনে হতে চায়, আবার কেউ চায় একটু শান্ত হতে।
অধ্যাপক লাভডের মতে, সংগীত মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেমকে সক্রিয় করে। এটি আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই হালকা ধ্রুপদি সংগীত অনেকের মানসিক চাপ কমাতে এবং কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।
তাই পড়ার আগে কোন ধরনের গান তার ভালো কাজ করে, সেটি নিজে খুঁজে বের করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পড়ার সময় গান কি সত্যিই উপকারী
বিজ্ঞানীদের মধ্যে এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। তবে সামগ্রিকভাবে অনেক গবেষকই মনে করেন, সংগীত মনোযোগ বাড়াতে, মানসিক অবস্থা ভালো রাখতে এবং কাজে মনোসংযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
২০২২ সালে হংকংয়ের একদল মনোবিজ্ঞানী সংগীত শোনার সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে প্রকাশিত গবেষণাগুলো পর্যালোচনা করেন।
তারা দেখেন, সংগীত মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে সাহায্য করে। বিশেষ করে মস্তিষ্কের যেসব অংশ শেখা ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
অনেকে কেন পড়ার সময় গান শোনে
এর একটি বড় কারণ হলো, গান আশপাশের বিরক্তিকর শব্দ থেকে মনকে দূরে রাখে। বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী এমন পরিবেশে পড়ালেখা করে, যেখানে চারপাশে টেলিভিশন চলছে, ছোট ভাইবোন খেলছে বা বাইরের নানা শব্দ আসছে। এমন অবস্থায় হেডফোনে হালকা গান অনেক সময় মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে।
অধ্যাপক লাভডে বলেন, আমরা কোনো কাজে গভীর মনোযোগ দিলেও মস্তিষ্কের একটি অংশ সব সময় আশপাশে নতুন কিছু ঘটছে কি না, সেদিকে নজর রাখে। হালকা সংগীত বা প্রকৃতির শব্দ এই অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তিগুলোকে আড়াল করতে পারে।
পড়ার সময় কেমন গান সবচেয়ে ভালো
গবেষণাভিত্তিক কিছু পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক লাভডে। সাধারণভাবে কথাবিহীন সংগীত পড়ার জন্য বেশি উপযোগী। কারণ গানের কথা আমাদের ভেতরের চিন্তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। বিশেষ করে রচনা লেখা, ভাষা শেখা বা মুখস্থ করার সময় এটি সমস্যা তৈরি করতে পারে। আবার কোনো গান শুনে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা মনে পড়তে পারে, তখন মনোযোগ অন্যদিকে চলে যায়।
তাই সবার জন্য একই ধরনের গান কার্যকর নয়। কারণ কেউ গান শুনে বেশি মনোযোগী হয়, কেউ আবার বিভ্রান্ত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বহির্মুখী বা সহজে বিরক্ত হওয়া মানুষ অনেক সময় গান থেকে বেশি উপকার পায়। অন্যদিকে অন্তর্মুখী মানুষেরা তুলনামূলক কম উপকার পেতে পারেন।
যদি গান ভালো না লাগে, তাহলে প্রকৃতির শব্দও একটি ভালো বিকল্প হতে পারে।
তিনি মনে করেন, প্রিয় কোনো গান শুনতে ভালো লাগলেও সেটি পড়ার জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। কারণ খুব পরিচিত গান পুরনো স্মৃতি মনে করিয়ে দিতে পারে বা মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে।
খুব জোরে বাজে, দ্রুতগতির বা নাটকীয় পরিবর্তন আছে এমন গান পড়ার সময় মনোযোগ নষ্ট করতে পারে বলে জানান তিনি।
এসব গান পড়া শুরুর আগে বা বিরতির সময় ভালো কাজ করলেও পড়ার সময় ততটা উপকারী নয়।
যেসব গানে ছন্দের পুনরাবৃত্তি আছে, গতি ধীর এবং হঠাৎ বড় পরিবর্তন নেই, সেগুলো মনকে স্থির রাখতে সাহায্য করে।
তিনি বলেন, খুব জোরে গান শোনা সাধারণত ভালো ফল দেয় না। তাই এমন ভলিউম বেছে নিতে হবে, যেন গান শোনা যায়, কিন্তু সেটি মনোযোগ পুরোপুরি দখল না করে।
অধ্যাপক লাভডের মতে, পিয়ানোর সুর মস্তিষ্কের কাছে পরিচিত ও স্বস্তিদায়ক। এতে জটিলতা কম থাকে, তাই মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়।
অধ্যাপক লাভডে বলছেন, সংগীতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সত্য হলো, এটি খুবই ব্যক্তিগত বিষয়। যে গান বন্ধুকে মনোযোগী করে, সেটি হয়তো আরেকজনকে বিভ্রান্ত করবে। আবার আজ যে গান কাজে দিচ্ছে, কাল সেটি নাও দিতে পারে।
তাই গান পড়ায় সহায়ক, নাকি বাধা—এই প্রশ্নের উত্তর ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়।
শেষ কথা, সংগীত কোনো জাদুর কাঠি নয়, যে মুহূর্তে পড়ালেখা সহজ করে দেবে। তবে সঠিক গান অনেক সময় মনোযোগ ধরে রাখতে, উৎসাহ বাড়াতে এবং দীর্ঘ সময় পড়ার শক্তি জোগাতে সহায়তা করতে পারে।




