‘শিশুটিকে বাঁচাতে না পারার দুঃখ কোনোদিনও ভুলবো না’

হাবিবুর রহমান

ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে আগুনের সংবাদ সংগ্রহে সেখানে গিয়েছিলেন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল যমুনা টিভি'র পিরোজপুর প্রতিনিধি তানভীর আহমেদ। এটি তার জীবনে দুঃসহ স্মরণীয় ঘটনার একটি।

launch_fire_3.jpg
ফাইল ছবি: হাবিবুর রহমান/স্টার

তানভীর দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, পেশাগত দায়িত্বের মানসিকতা নিয়েই স্বাভাবিকভাবে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। কিন্তু, দুর্ঘটনা কবলিত লঞ্চের ভেতরে ঢোকার পরই তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এরপরও পেশাগত কারণে নিজেকে সামলে নেন এই সংবাদকর্মী।

launch_fire_2_0.jpg
ছবি: হাবিবুর রহমান/স্টার

তিনি আরও জানান, লঞ্চের ভেতর থেকে সরাসরি সংবাদ প্রকাশ করার সময় কেউ একজন জানালেন পাশেই পড়ে আছে পুড়ে যাওয়া এক ব্যক্তির দেহাবশেষ। এরপরই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। কোনো রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন।

launch_fire.jpg
ছবি: হাবিবুর রহমান/স্টার

পরে, উদ্ধারকৃত মরদেহগুলো যখন ঝালকাঠির মিনি পার্কে রাখা হয় সেখানে ছুটে যান তানভীর। বলেন, 'পুড়ে যাওয়া দেহগুলো দেখার সাহস হয়নি। তারপরও পরিচিত এক পুলিশ সদস্য একটি মরদেহ দেখতে বলায় অনেক সাহস নিয়ে সেদিকে তাকাই। কিন্তু, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নিই।'

'স্বজনদের হৃদয়বিদারক আহাজারিই সবচেয়ে ব্যথিত করেছে' উল্লেখ করে এই সংবাদকর্মী আরও বলেন, 'ঘটনাস্থল ছাড়ার ৫-৬ ঘণ্টা কোনো কাজেই মন বসাতে পারিনি। প্রতিনিয়ত স্বজনদের আহাজারি কানে ভেসে আসছিল।'

১৩ বছরের সাংবাদিকতায় এমন অভিজ্ঞতা তার কখনো আসেনি। এ ধরনের নতুন অভিজ্ঞতার প্রত্যাশাও করেন না তানভীর।

অন্য এক বেসরকারি টেলিভিশনের সংবাদকর্মীর সঙ্গে পিরোজপুর থেকে ক্যামেরাম্যান হিসেবে ঘটনাস্থলের ভিডিও ধারণ করতে ঝালকাঠিতে গিয়েছিলেন খান আক্তারুজ্জামান সোহাগ।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সোহাগ ডেইলি স্টারকে বলেন, 'পুড়ে যাওয়া লঞ্চের ভিতরে ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই চোখ থেকে সারাক্ষণ পানি গড়িয়ে পড়ছিল। পেশাগত কারণেই শুধুমাত্র ভিডিও ধারণ করেছি।'

'তবে আগে এমন অভিজ্ঞতা ছিল বলেই মর্মান্তিকদৃশ্যগুলো ধারণ করতে পেরেছি,' যোগ করেন তিনি।

পিরোজপুর থেকে ঘটনাস্থলে যাওয়া আরেকটি বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম মিলন ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ভয়াবহ সিডরের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে এতটা মর্মাহত হননি যতটা লঞ্চ দুর্ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হয়েছি।'

দুর্ঘটনা কবলিত লঞ্চের যাত্রীদের উদ্ধারে ১৪ জনের স্বেচ্ছাসেবীর দলে কাজ করেছেন ঝালকাঠি সদর উপজেলার দিয়াকুল গ্রামের শামীম হোসেন। ঘটনার অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, 'লঞ্চের আগুনে আটকে পড়া মানুষের আহাজারি, চোখের সামনে মানুষের পুড়ে যাওয়ার দৃশ্যগুলো এখনও চোখের সামনে ভাসছে।'

'ঘটনার পর থেকে এক মুহূর্তের জন্যও ঠিকমত ঘুমাতে পারিনি।'

শামীম জানান, যখন লঞ্চটি পুড়ছিল তখন এর মধ্য থেকে ধোঁয়ার সঙ্গে মানুষের পোড়া গন্ধও আসছিল। আগুন নেভানোর পর এ গন্ধ আরও বেড়ে যায়।

ঘটনাস্থল সুগন্ধার পাড়ে গেলে মনের অজান্তেই মানুষের পোড়া গন্ধ এখনও ভেসে আসে।

এ ছাড়া ঘটনার ২ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও ঠিকমত ঘুমাতে পারেন না শামীম। উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া দিয়াকুল গ্রামের প্রায় সব মানুষের অবস্থা শামীমের মতোই।

লঞ্চ দুর্ঘটনার হৃদয়বিদারক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন ঝালকাঠি ফায়ার স্টেশনের লিডার শহিদুল ইসলাম। এই অগ্নিনির্বাপক যোদ্ধা ডেইলি স্টারকে বলেন, 'প্রায় ২১ বছরের চাকরি জীবনে অনেক দুর্ঘটনায় কাজ করেছি। কিন্তু, এমভি অভিযান-১০ লঞ্চের মতো এত বড় দুর্ঘটনায় কাজ করা এই প্রথম। এটি সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ছিল। পাশাপাশি জীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা এখানে দেখেছি।'

তিনি জানান, ঘটনার সংবাদ পেয়ে তারা বিষখালী নদীর তীরে চরকাঠী গ্রামে যান। রাত গভীর হওয়ায় ট্রলারের ব্যবস্থা করতে কিছুটা সমস্যা হয়। এরপর লঞ্চটি স্থান পরিবর্তন করে নদীর অন্য প্রান্তে চলে যায়। ঘন কুয়াশার কারণে কাজ করতে কিছুটা বেগ পেতে হয়। এরপর লঞ্চটিতে পৌঁছে তারা আগুন নেভাতে শুরু করেন।

শহিদুল আরও জানান, লঞ্চটির ইঞ্জিনে যেখান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল সেখানে প্রচুর পরিমাণে জ্বালানি তেল ছিল। এ আগুন পানি দিয়ে নেভানো যায় না। কেমিক্যাল ব্যবহার করে আগুন নিয়ন্ত্রণ আনতে হয়েছিল।

'কাজ করার সময় চোখের সামনেই ঘটে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা,' বিমর্ষ মনে তিনি বলেন, 'আগুন নেভানোর কাজ করছি। হঠাৎ সেখানে ৭-৮ বছরের এক ছেলে চিৎকার করে এদিক-ওদিক ছুটছিল। আগুনের কারণে সে সামনে আসতে পারেনি। এরপর সেদিকে পানি ছিটানোর সময় ইশারায় শিশুটিকে সামনে আসতে বলি। সেখান থেকে আসতে গিয়ে শিশুটি পায়ে কোনো কিছুর ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়।'

'তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফায়ার ফাইটার আল আমীন সেখানে ছুটে যান। কিন্তু, ততক্ষণে শিশুটি মারা যায়। এরপরই আল আমীন অঝোরে কাঁদতে থাকে।'

'ঘটনার ২ দিন কেটে গেলেও, আল আমীন শিশুটির কথা মনে করে অঝোরে কাঁদেন। শিশুটিকে বাঁচাতে না পারার দুঃখ কোনোদিনও ভুলবো না।'

শুধু তাই নয়। লঞ্চের আগুন নেভানোর পর সিঁড়িতে পড়ে থাকা ১৭ পোড়া মৃতদেহ উদ্ধার করেন তারা। এরপর একই স্থান থেকে উদ্ধার করেন আরও ৮ মৃতদেহ। এসব স্মৃতি এখনও চোখের সামনে ভাসছে বলে জানান শহিদুল।

পেশাগত দায়িত্ব পালনে লঞ্চ দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে যে যার অবস্থান থেকে কাজ করেছেন। কাজের ভিন্নতার কারণেই প্রত্যেকের কাজের পরিধি ছিল ভিন্ন। তবে এ দুর্ঘটনায় সবার হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ হয়েছে তার মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। এমনকি, সেখানে কাজ করা প্রতিটি পেশার মানুষের জীবনে সম্ভবত সবচেয়ে বড় ও মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা ছিল এমভি অভিযান-১০ লঞ্চের আগুনের ঘটনা।

গত ২৩ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা এমভি অভিযান-১০ লঞ্চটি ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া এলাকায় আসার পর ২৪ ডিসেম্বর ভোররাতে এর ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দেয়।

বরগুনা যাওয়ার পথে ঝালকাঠিসহ ৪ থেকে ৫টি ঘাট থাকলেও একটিতেও থামেনি লঞ্চটি। সর্বশেষ রাত সোয়া ২টার দিকে লঞ্চের ইঞ্জিনে আগুন লাগলে ঝালকাঠি সদর উপজেলার গাবখান ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের চরকাঠী গ্রামে বিষখালী নদীর তীরে গিয়ে তা বন্ধ হয়।

এরপর সেখানে কৌশলে নেমে পড়েন লঞ্চের সব কর্মী। সেসময় কয়েকজন যাত্রীও সেখানে লাফিয়ে নদীতে পড়ে নিজেদের রক্ষা করেন। এরপর জোয়ারে ভাসতে ভাসতে প্রায় ১ ঘণ্টা পর লঞ্চটি একই উপজেলার পোনাবালিয়া ইউনিয়নের দিয়াকুল গ্রামে সুগন্ধা নদীর চড়ে আটকে যায়। সেখানেই পুড়ে ছাই হয় লঞ্চের সব জিনিসপত্র।

সেসময় স্থানীয়দের সহায়তায় লঞ্চের অধিকাংশ যাত্রী ওই গ্রামে নেমে জীবন রক্ষা করেন। তবে এই দীর্ঘ সময়ে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান অন্তত ৪২ যাত্রী।

এ ছাড়া, এখনও নিখোঁজ আছেন অর্ধশতাধিক যাত্রী। যাদেরকে আর কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে সংশয় আছে স্বজনদের।