বেরোনোর পথ তালাবদ্ধ, আগুনে পুড়ে মৃত্যু
বের হওয়ার একমাত্র পথটি ছিল তালাবদ্ধ। এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের একটি কারখানা ভবনের চতুর্থ তলায় আটকা পড়া অবস্থায় আগুনে পুড়ে মারা গেলেন কারখানার ৪৮ জন কর্মী।
আগুন থেকে বাঁচতে ছয় তলার ওই খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা থেকে লাফিয়ে পড়ে আরও তিন জনের মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৫১। যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু।
বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ভবনটিতে আগুন লাগলে চতুর্থ তলায় কর্মরতদের সেখানেই থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন কারখানার এক সুপারভাইজার। নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন এই বলে চতুর্থ তলাটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, তাই আগুনের শিখা ও ধোঁয়া থেকে কর্মীরা নিরাপদ থাকবেন।
আগুনের সেই ভয়বহতা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি ও নিহতদের স্বজনরা বলছেন, আটকে পড়াদের এটাও বলা হয়েছিল যে, তাদের উদ্ধার করতে দ্রুত ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পৌঁছাবেন।
সন্ধ্য ৬টা ১০ মিনিটে যখন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান ততক্ষণে আগুন দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ছড়িয়ে পড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, নিচতলায় রাখা কার্টন ও পেপার রোলের মতো দাহ্য পদার্থ থেকে এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়।
কয়েক ঘণ্টার প্রাণান্ত চেষ্টায় অগ্নিনির্বাপক দলের কর্মীরা চতুর্থ তলায় পৌঁছে এক বীভৎস দৃশ্যের মুখোমুখি হন। দেখতে পান আগুনে অঙ্গার ৪৮টি মরদেহ। যাদের কাউকেই চেনার কোনো উপায় নেই।
হাসেম ফুডস ফ্যাক্টরি নামের ওই কারখানা ভবনের ছাদ থেকে ২৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। উদ্ধার তৎপরতা চালাতে গিয়ে অন্তত ১০ জন আহত হন। কারখানাটি সেজান জুস ও নসিলার মতো পরিচিত পণ্য উৎপাদন করে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক (অপারেশন্স ও মেইনটেন্যান্স) দেবাশীষ প্রধান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘৪৮টি মরদেহের সবগুলো ভবনের চতুর্থ তলা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। বের হওয়ার একমাত্র পথটি তালাবদ্ধ থাকায় তারা বের হয়ে আসতে পারেননি।’
উদ্ধারকৃত মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। কাছের মানুষের মরদেহ খুঁজে পেতে মেডিকেলে ভিড় করেন স্বজনেরা। যদিও আগুনে পোড়া দেহগুলো কোনোভাবেই চিহ্নিত করার উপায় না থাকায় পুলিশ তাদের সেখানে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শামীম ব্যাপারী জানান, ময়নাতদন্তের পর লাশ শণাক্তের জন্য মরদেহ ও পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে।
শামীম ব্যাপারী বলেন, ‘ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’
পরে গতকাল রাত আটটার দিকে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ডিএনএ ল্যাব থেকে একটি দল মর্গে গিয়ে সেখানে ভিড় করা স্বজনদের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা নেয়।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, ভবনটিতে অন্তত পাঁচটি সিঁড়ি থাকার দরকার ছিল। কিন্তু সেখানে মাত্র দুটো সিঁড়ি দেখা যায়। তাও সরু।
এমনকি কারখানাটিতে যথেষ্ট অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ও ফায়ার অ্যালার্মের ব্যবস্থা ছিল না জানিয়ে জিল্লুর রহমান আরও বলেন, ‘তদন্তের পর অগ্নিনিরাপত্তায় ঘাটতির ব্যাপারে আমরা আরও পরিষ্কারভাবে বলতে পারব।’
চতুর্থ তলায় অবস্থানরত কর্মীদের তারা কেন উদ্ধার করতে ব্যর্থ হলেন জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক বলেন, ‘তারা যদি ছাদ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারতেন, তাহলে আমরা তাদের বাঁচাতে পারতাম। আমরা যে ২৫ জনকে উদ্ধার করেছি, তারা সবাই ছাদে ছিল।’
তিনি আরও জানান, ভবনের প্রত্যেক ফ্লোরে কাঁচামাল স্তূপ করা ছিল। এতে করে পানি দেওয়া কঠিন হয়ে যায়।
এ ছাড়া ভবনটিতে তেল, রাসায়নিক, পলিব্যাগ, ফয়েল পেপার, প্লাস্টিক বোতলের মতো দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন নেভাতে অনেক সময়ে লেগে যায় বলে মন্তব্য করেন জিল্লুর রহমান। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার বেলা ১২টা ৩৫ এর দিকে আগুন ‘নিয়ন্ত্রণে’ আনা সম্ভব হয় বলে জানান তিনি।
যদিও এদিন রাত পৌনে দশটা পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট আগুন পুরোপুরি নেভানোর জন্য কাজ করছিল।
এদিকে এই অগ্নিকাণ্ডের দায় নেওয়ার ব্যাপারটি উড়িয়ে দেন কারখানা মালিক সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হাসেম। দ্য ডেইলি স্টারকে হাসেম বলেন, ‘শ্রমিকদের অসাবধানতার জন্যও অগ্নিকাণ্ডটি ঘটতে পারে। হতে পারে কোনো শ্রমিক না নিভিয়েই তার সিগারেটটি ছুঁড়ে ফেলেছিল।’
আগুনের পেছনে এর যে কোনো একটি কারণ কাজ করতে পারে বলে মন্তব্য করেন হাসেম। বলেন, ‘কারখানা বানানো আমার জীবনের একটি বড় ভুল। যদি কারখানা থাকে, তাহলে সেখানে শ্রমিক থাকবে। শ্রমিক থাকলে কাজ হবে। আর কাজ হলে আগুন লাগতেই পারে।’
তিনি বলেন, ‘এর জন্য কি আমিই দায়ী? এমনতো নয় যে আমি সেখানে গিয়ে আগুন লাগিয়েছি। আমার কোনো ম্যানেজারও এটা করেনি।’
হাসেম দাবি করেন, কারখানায় যথেষ্ট অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ছিল।
সজীব গ্রুপের প্রতিষ্ঠান হাসেম ফুডস লিমিটেড কোমল পানীয়, বিস্কুট ও বেকারি পণ্য, জ্যাম, জেলি এবং সসের মতো নানা পণ্য তৈরি করে থাকে।
সজীব ব্রান্ডের আওতায় এসব পণ্য বাজারজাতকরণের পাশাপাশি পাকিস্তানের সেজান ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের সঙ্গে কারিগরী যৌথতার ভিত্তিতে সজীব গ্রুপ বাংলাদেশে সেজান ম্যাংগো জুস উৎপাদন করে। এ ছাড়া স্পেনের ইডিলিয়া ফুডস এর লাইসেন্সে নসিলা উৎপাদনের সঙ্গেও জড়িত গ্রুপটি।
অভিশপ্ত চতুর্থ তলা
সজীব গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহান শাহ আজাদ জানান, কারখানার প্রতিটি ফ্লোরে জায়গার পরিমাণ ৩৪ হাজার বর্গফুট। আগুনে এর সবগুলো ফ্লোর পুরোপুরি পুড়ে গেছে।
কারখানার কর্মকর্তারা বলছেন, ভবনটিতে প্রায় ৫০০ শ্রমিক কাজ করতেন। বৃহস্পতিবার তৃতীয় তলার সবগুলো ইউনিট বন্ধ ছিল। আর বিকেল চারটায় শিফট শেষ হওয়ার পর বেশিরভাগ শ্রমিক ভবন থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।
কারখানার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ সালাউদ্দিন জানান, আগুন লাগার সময় ভবনের ভেতর ১৮০ জনের মতো শ্রমিক ও কর্মকর্তা ছিলেন।
চতুর্থ তলায় যে শ্রমিকরা আটকা পড়েছিলেন, তাদের একজন ছিলেন জাহানারা বেগম। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তিনি টেলিফোনে তার দুলাইভাই লিটনকে বলেছিলেন, ‘আমরা শ্বাস নিতে পারছি না। আমরা ভেতরে আটকা পড়েছি। আমাদের এখান থেকে বের করো। সাহায্য করো।’
এর পর থেকে লিটন জাহানারার ফোনে টানা ফোন দিতে থাকেন। পরের ২০ মিনিটের মতো তার ফোন বাজছিল। এর পর তা বন্ধ হয়ে যায়।
কারখানার কিছু কর্মী জানান, আগুন লাগার পর চতুর্থ তলার সুপারভাইজার মাহবুবুর রহমান শ্রমিকদের সেখানেই তার সঙ্গে থাকার কথা বলেন। ধারণা করা হচ্ছে, গতকাল যে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়েছে তার মধ্যে মাহবুবও আছেন।
অনেক শ্রমিকের অভিযোগ, চতুর্থ তলার গেটটি তালাবদ্ধ ছিল। যে কারণে ওখানেই সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
সপ্তাহখানেক আগে একবার কারখানার নিচতলায় আগুন লাগার কথা জানিয়ে শ্রমিকরা বলেন, সে সময় তারা নিজেরাই ওই আগুন নিভিয়ে ফেলতে পেরেছিলেন। যা তাদের চতুর্থ তলায় থেকে যাওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস দেয়।
উদ্ধার হওয়া শ্রমিক মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, চতুর্থ তলাটি ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল। নিশ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। তিনি বলেন, ‘ওই ফ্লোরে তিনটি এক্সহস্ট ফ্যান ছিল। আমরা চারজন মিলে এর একটা ভাঙার চেষ্টা করেছিলাম। যাতে ওই অংশ দিয়ে বের হয়ে আসা যায়। কিন্তু তার আগেই আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।’
স্থানীয় কয়েকজন তাকেসহ তিনজনকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসেন।
কারখানার বাইরে সংঘর্ষ
এদিকে শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে কারখানার সামনে জড়ো হওয়া নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজন ও পরিবারের সদস্য, স্থানীয় লোকজন ও বহিরাগতরা মিলে কারখানার ভেতরে ভাঙচুর চালায়।
রূপগঞ্জের এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এ সময় দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের কাছ থেকে তিনটি গুলিভর্তি শটগান লুট হয়ে যায়।
এ সময় বিক্ষোভকারীরা পুলিশ, র্যাব ও আনসার সদস্যদের ওপর ইট-পাটকেল ছুঁড়তে শুরু করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশও ফাঁকা গুলি চালায়। টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। দুই পক্ষের সংঘর্ষে প্রায় ঘণ্টাখানেকের জন্য ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক বন্ধ হয়ে যায়।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান নিহতদের স্বজনদের জন্য আর্থিক সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছেন।
গতকাল সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় তিনি বলেন, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল থেকে প্রত্যেক নিহত ব্যক্তির পরিবারকে দুই লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। আহতরা পাবেন ৫০ হাজার টাকা করে।
*প্রতিবেদনটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মামুনুর রশীদ