মগবাজারে বিস্ফোরণ: ভবনে গ্যাস সংযোগ ছিল না দাবি তিতাসের

ফায়ার সার্ভিস ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট বলছে গ্যাসের কারণে বিস্ফোরণ
মোহাম্মদ জামিল খান ও শাহীন মোল্লা

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের কর্মকর্তাদের মতে, রাজধানীর মগবাজারের তিনতলা ভবনের পাইপলাইনে জমাট বাঁধা গ্যাসের কারণে বিস্ফোরণ হয়ে থাকতে পারে। তবে, গতকাল তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ তাদের এ ধারণাকে নাকচ করে দেয়।

তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী ইকবাল মোহাম্মদ নুরুল্লাহ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ভবনের সঙ্গে গ্যাস লাইনের কোনো সংযোগ ছিল না।’

তিনি জানান, ভবনের গ্যাস পাইপলাইনটির সংযোগ কয়েক বছর আগেই বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের কর্মকর্তারা বিস্ফোরণের পর ভবনের ধ্বংসাবশেষ সরানোর সময় একটি গ্যাস পাইপলাইন খুঁজে পান, যেখান থেকে গ্যাস বের হচ্ছিল। উল্লেখ্য, ২৭ জুনের বিস্ফোরণে প্রায় ৫০ জন আহত ও ১১ জন নিহত হন।

রোববার সন্ধ্যায় তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তাদের ঘটনাস্থলে আসতে বলা হয় এবং ভবনে গ্যাসের সংযোগটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক দিনমনি শর্মা বলেন, ‘ভবনে অবশ্যই একটি অবৈধ গ্যাসলাইন সংযোগ ছিল বলে আমরা সন্দেহ করছি। আমরা মনে করি, তিতাস গ্যাসের লাইনটি থেকে গ্যাস জমা হয়ে বিস্ফোরণ ঘটেছে।’

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স তিতাস গ্যাসের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে সংযোগটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কাগজপত্র চেয়েছে, জানান দিনমনি। যিনি বিস্ফোরণের ঘটনার তদন্তের জন্য গঠিত পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির একজন সদস্য।

তিনি আরও জানান, রাজধানী উন্নয়ন কর্পোরেশনের (রাজউক) কাছেও একটি চিঠি দিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে, কীভাবে একটি আবাসিক ভবনকে বাণিজ্যিক স্থাপনায় রূপান্তরিত করা হল।

বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের প্রধান এবং পুলিশের সাত সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির সচিব ও সদস্য রহমতউল্লাহ চৌধুরীও দিনমনি শর্মার সঙ্গে গ্যাসলাইন সংক্রান্ত বিষয়টিতে একমত হন।

তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ভবনের চারপাশে অসংখ্য গ্যাস পাইপলাইন পয়েন্ট ও গ্যাস লিকেজ পাওয়া গেছে। এই লাইনগুলো থেকে গ্যাস জমাট বেঁধে বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটে।’

এই তদন্তের সঙ্গে জড়িত বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের আরেকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘ভবনে একটি সুয়ারেজ লাইন ছিল, কিন্তু সেখানে গ্যাসের কোনো উৎস পাওয়া যায়নি।’

এ সংবাদদাতা গতকাল ঘটনাস্থলে সরেজমিনে পরিদর্শন করতে গিয়ে ভবন থেকে পচে যাওয়া মাংসের কটু গন্ধ পান।

ভবনে একটি রেস্তোরাঁ ও একটি মাংসের দোকান ছিল।

ভবনের বাসিন্দারা জানান, কেউ কোনো কিছুতে হাত দেয়নি কিংবা কোনো দ্রব্য সরায়নি, কারণ সেটির জন্য আদালতের অনুমতি প্রয়োজন।

তদন্ত প্রক্রিয়া

বিস্ফোরণের পর পুলিশ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে, কিন্তু গতকাল পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিটিসি) এখন এই মামলাটির তদন্ত করছে।

গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমোদন না থাকায় সিটিটিসি’র কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এ প্রসঙ্গে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে একটি চিঠি পাঠানো হবে।

তারা আরও বলেন, ‘তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তাদের জেরা করবে সিটিটিসি।’

ভবনের মালিক মশিউর রহমান সুস্থ হলে তাকেও পুলিশ জেরা করবে, জানান তারা।

তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে রহমতউল্লাহ জানান, তারা একটি বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্ত প্রক্রিয়া পরিচালনা করার চেষ্টা করছেন এবং বিস্ফোরণের নেপথ্যের প্রতিটি কারণ চিহ্নিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

এ কারণে তদন্ত শেষ হতে এত সময় লাগছে, জানান তিনি। এ ছাড়াও, তিনি উল্লেখ করেন, এ পর্যন্ত প্রত্যক্ষদর্শীসহ প্রায় ৫০ জনের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে।

তদন্ত কমিটি

গত বুধবার বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ কর্পোরেশন (পেট্রোবাংলা) একটি পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, যার নেতৃত্বে আছেন সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক শাহনেওয়াজ পারভেজ। কমিটিকে বলা হয়েছে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে একটি প্রতিবেদন জমা দিতে।

গতকাল কমিটির সদস্যরা সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

‘আমরা ভবনের গ্যাসলাইন সংযোগ ও রাইজারটি পরীক্ষা করছি। আমরা আরও জানার চেষ্টা করছি লাইনটি সঠিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল কিনা’, দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন পারভেজ।

গতকাল পুলিশের সাত সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত দশ দিন সময় চেয়েছে, জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

ফায়ার সার্ভিসের কমিটির কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে শর্মা জানান, তারা তদন্ত থেকে যা খুঁজে পেয়েছেন, তা গোছাচ্ছেন এবং তারা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।

প্রতিবেদনটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান