ভোর ৬টায় লাইনে দাঁড়িয়ে দুপুর ১২টায় পেলেন টিকা
'টিকা নিলে করোনা হবে না, তাই টিকা নিয়েছি। ভোর ৬টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মানুষের ঠেলা ধাক্কা খেয়ে দুপুর ১২টার সময় টিকা নিতে পারছি। গতকাল কয়েক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলাম। পরে বলে টিকা শেষ। তাই ফেরত গেছি, টিকা নিতে পারি নাই। আজকে ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ভাবছি টিকা নিয়া তারপর বাড়ি যামু।' আজ বুধবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ এলাকায় নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে করোনা টিকা নিতে আসা মো. আবু তাহের (৭০) দ্য ডেইলি স্টারকে এসব কথা বলেন।
সরেজমিনে জেনারেল হাসপাতালের টিকা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কেবল আবু তাহের নন, ২৫ বছর বয়স থেকে শুরু করে ৮০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার কয়েক হাজার নারীপুরুষ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। বেলা যত বাড়ছিল, মানুষের সংখ্যাও বাড়ছিল। লাইন বড় হতে হতে হাসপাতাল চত্বর ছাড়িয়ে তা মূল সড়কে চলে আসে। সেখানে ছিল না কোনো সামাজিক দূরত্ব। অনেকের মুখেই ছিল না মাস্ক। ধাক্কাধাক্কি করে টিকা নিতে গিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বেচ্ছাসেবক ও আনসারদের পাশাপাশি পুলিশকেও দায়িত্ব পালন করতে হয়।
টিকা নিতে আসা গোবিন্দ ঘোষ (৪৫) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'দুই সপ্তাহ আগে নিবন্ধন করেছি। কিন্তু, মেসেজ আসে নাই। গণটিকা কার্যক্রমে গিয়েছি, সেখানেও টিকা দেয়নি। তাই, আজকে এখানে লাইনে দাঁড়িয়ে পাঁচ ঘণ্টা পর টিকা নিয়েছি।'
দুপুর ১টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা জাহানারা বেগম বলেন, 'সকাল ৭টায় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু, এখনও সামনে যেতে পারিনি। এখানে মুখ চিনে লাইন না মেনে টিকা দিচ্ছে। আর মানুষ তো ঠেলাঠেলি করছেই। আমার সামনে দুই জন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মাথা ঘুরিয়ে পরে গেছে। পরে, টিকা না নিয়ে বাড়ি চলে গেছে।'
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শরিফুল ইসলাম তনয় দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'সিটি করপোরেশনের তিনটি অঞ্চলের জন্য একটি মাত্র টিকা কেন্দ্র হওয়ায় এ ভিড় হয়েছে। আমি সিদ্ধিরগঞ্জে থাকি। আমাকে টিকা নিতে শহরে আসতে হয়েছে। যারা বন্দর থাকেন তাদেরও এখানেই আসতে হয়েছে। আবার শহরের বাসিন্দারাও এখানে এসেছে।'
তিনি বলেন, 'এক্ষেত্রে তিনটি অঞ্চলে তিনটি টিকাদান কেন্দ্র করা হলে সবার জন্য ভালো হবে। না হলে এভাবে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে টিকা দিলে করোনা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।'
জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ জামান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'একসঙ্গে অনেক মানুষ টিকা নিতে আসায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। এখানে কেউ প্রথম ডোজ নিতে এসেছে, কেউ দ্বিতীয় ডোজ নিতে এসেছে। আবার কেউ মেসেজ আসেনি, তাও চলে এসেছে। এজন্য ভিড় হয়েছে। তবে আমরা চেষ্টা করছি যেন কোন বিশৃঙ্খলা না হয়।'
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শেখ মোস্তফা আলী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'সরকার যখন গণটিকা কার্যক্রম শুরু করে, তখন রেজিস্ট্রেশন উন্মুক্ত ছিল। সে সময় আমরা সিটি করপোরেশনের প্রতি ওয়ার্ডে ৬০০ করে ৪৮ হাজার ৬০০ মানুষকে টিকা দিয়েছি। কিন্তু, আমরা রেজিস্ট্রেশন অনুপাতে টিকা দিতে পারিনি। যার কারণে এখানে ভিড় হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জেনে গেছে ১২ আগস্টের পর মডার্না ভ্যাকসিন বন্ধ। সেজন্যও আগ্রহ বেড়েছে। অনেক অফিস আদালতেও এখন টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এজন্য উপচে পরা ভিড় হচ্ছে।'
তিনি বলেন, 'এ কেন্দ্রে দুই লাখ ৩৫ হাজার মানুষ রেজিস্ট্রেশন করেছে। তাদের মধ্যে ৯৫ হাজার লোককে আমরা টিকা দিতে পেরেছি। এক লাখ ৪০ হাজার লোককে এখনও টিকা দেওয়া বাকি। এত মানুষকে দুই দিনে টিকা দেওয়া সম্ভব না। এটাও একটা ভিড় হওয়ার কারণ।'
পর্যাপ্ত টিকা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এক লাখ ৪০ হাজার লোকের টিকা এ মুহূর্তে আমাদের কাছে নেই। আমাদের কাছে যা আছে, তাতে আর দুই দিন বা তিন দিন চালিয়ে নিতে পারবো। প্রথম ডোজ আগামীকাল থেকে শেষ। আমরা টিকার জন্য আবেদন করেছি। সিভিল সার্জনের কাছে টিকা এলে আমরা পেয়ে যাব।'
টিকা নিতে মানা হচ্ছে কি? জবাবে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, 'আমরা এখানে প্রতিদিন দুই হাজার মানুষকে টিকা দিতাম। তখন আমরা ৮টি বুথে টিকা দিয়েছি। সেসময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে করতে পেরেছি। কিন্তু, এখন একসঙ্গে অনেক মানুষ চলে আসায়, সেটা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা এখনও মাইকিং করে সচেতন করা ও পুলিশের সহযোগিতায় লাইন মেইনটেইন করছি।'
লোকবল সংকট আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এখানে প্রথমে ২৪ জন স্বেচ্ছাসেবী দায়িত্ব পালন করতেন। এখন আরও ২০ জন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে, এটা পর্যাপ্ত না।'
যোগাযোগ করা হলে নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ ইমতিয়াজ বলেন, 'আজকে আমাদের টিকাদান কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তবে, আগামীকাল থেকে মেসেজ না পেলে, টিকা দেওয়া হবে না। যারা মেসেজ পাবেন, কেবল তাদেরই টিকা দেওয়া হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'যিনি রেজিস্ট্রেশন করেছেন, তিনি অবশ্যই টিকা পাবে। এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আর, মেসেজ পেলে যেন টিকাদান কেন্দ্রে আসে সেটা আমরা বলে দিয়েছে। তাহলে আর কোনও বিশৃঙ্খলা হবে না। তবে, এ মুহূর্তে আমাদের কাছে টিকা আছে। টিকার জন্য আবেদনও করা আছে।'