ফরিদপুরে ডায়রিয়া পরিস্থিতির অবনতি, ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি ১৫৭

নিজস্ব সংবাদদাতা, ফরিদপুর

ফরিদপুরে হঠাৎ করে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শয্যা বাড়ানো হলেও অতিরিক্ত রোগীর চাপে হাসপাতালের কক্ষের মেঝেতে  ও বারান্দায় রোগী রেখে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।

জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে ১৫৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১০৫ জন।

এপ্রিল মাসে এ হাসপাতালে ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৭৯২ জন। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহে রোগীর চাপ ছিল সবচেয়ে বেশি। গত এক সপ্তাহে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪৬০ জন। একইসময়ে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন ৩৯৪ জন।

আজ শনিবার সরেজমিনে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, রোগীর চাপে ডায়রিয়া ওয়ার্ডের পাশাপাশি পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডেও ডায়রিয়ার রোগী রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

২২ শয্যার ডায়রিয়া ওয়ার্ডের পাশাপাশি পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডের ১৫ টি শয্যায় চলছে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা। এতেও জায়গা সংকুলান না হওয়ায় হাসপাতালের মেঝেতে ও বারান্দায় অস্থায়ী বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন অন্তত ১৫ থেকে ২০ রোগী। হাসপাতালের বারান্দার মেঝেতে যারা চিকিৎসা নিচ্ছেন তাদের মাথার উপর ফ্যান না থাকায় হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে দেখা গেছে রোগীর স্বজনদের। রোগীদের বেশিরভাগই ভর্তি হয়েছেন গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল শনিবার ভোরের মধ্যে।

ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ফরিদপুর সদর উপজেলার   চররশিপুর গ্রামের কৃষক রুমি শেখ (৩২)। তিনি বলেন, 'শুক্রবার সন্ধ্যায়  ইফতার করে তারাবির নামাজ পড়ে এসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ি। প্রথমে ভেবেছিলাম গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা। গ্যাস্ট্রিকের দুটো ওষুধও খেয়েছি। তাতে কাজ হয়নি। পাতলা পায়খানা ও বমি বেড়ে যাওয়ায় শুক্রবার রাত ৩টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি।'

হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডের বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন শহরের গোয়ালচামট মহল্লার বাসিন্দা সাঈদ প্রমাণিকের স্ত্রী জেবুন্নেছা বেগম(৩৪)। তিনি বলেন, 'শুক্রবার রাত ৮টার দিকে হাসপাতালে ভর্তি হলেও কোনো বেড পাইনি। তাই বাধ্য হয়ে হাসপাতালের বারান্দার মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।'

গত বৃহস্পতিবার রাত ২টায় ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন ফরিদপুর সদরের কৈজুরি গ্রামের চাঁন মল্লিক (৪৬)। হাসপাতালের পরিবেশের ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, 'হাসপাতালের যে পরিবেশ এখানে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়বে। আমি কিছুটা সুস্থতা বোধ করায় গতকাল শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে বাড়ি চলে যাই। এরপর অসুস্থতা বেড়ে গেলে শুক্রবার রাত ৩টার দিকে এসে আবার ভর্তি হয়েছি। এবারও শয্যা পাইনি। বারান্দার মেঝেতেই জায়গা হয়েছে।'

ডায়রিয়া ওযার্ডের দায়িত্বরত সেবিকা গোলাপী বেগম বলেন, 'ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে আমরা হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি। এতো জন রোগীর জন্য সকালের দিকে আমাদের সেবিকা থাকে মাত্র ৪-৫জন। দুপুর ও রাতে থাকেন মাত্র ২জন। আমাদের এখন দম ফেলার সুযোগ নেই।'

'অবস্থা এমন হয়েছে যে, আমাদের হাসপাতালের অন্যান্য বিভাগের সেবিকাদেরও এখন বাধ্য হয়ে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে এসে রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে হচ্ছে। একেকজন রোগীকে ২০ থেকে ২৫টি পর্যন্ত কলেরার স্যালাইন দিতে হচ্ছে। ফলে প্রচুর স্যালাইন প্রয়োজন হচ্ছে,' বলেন তিনি।

ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার ৬ হাজার স্যালাইন নতুন করে আনা হয়েছে। আগের স্যালাইন মিলে বর্তমানে ৭ হাজার স্যালাইন মজুদ রয়েছে।

ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা গনেশ কুমার আগরওয়ালা বলেন, 'ফরিদপুরে হঠাৎ করে ডায়রিয়া আক্রান্তের হার বেড়ে গেছে। ডায়রিয়া ওয়ার্ডে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডের ১৫ টি শয্যায় ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।'

তিনি বলেন, 'একজন রোগী আসা মাত্রই তাকে দ্রুত চারটি স্যালাইন দিতে হয়ে। এরপর রোগীর অবস্থা একটু ভালো হলে স্যালাইনের মাত্রা কমিয়ে আনা হয়।'

তিনি আরও জানান, বর্তমানে হাসপাতালে যে পরিমাণ স্যালাইন মজুদ রয়েছে তাতে আগামী ৭ দিন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে। তবে অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে এবং স্যালাইনের সরবরাহ না পাওয়া গেলে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।