সঠিক ডেটার অভাবে কঠিন হচ্ছে ডেঙ্গু নির্মূল
দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে ২০০০ সাল থেকে। কিন্তু, সরকার এখনো এমন কোনো অটোমেশন সিস্টেম চালু করতে পারেনি, যার মাধ্যমে ডেঙ্গু আক্রান্তের সঠিক সংখ্যা পাওয়া যাবে।
কীটতত্ত্ববিদদের মতে, পরিস্থিতির স্পষ্ট চিত্র পেতে এবং ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের বাহক এডিস মশাকে আরো বৈজ্ঞানিক উপায়ে নির্মূল করতে সংক্রমণের সঠিক সংখ্যা জানা অত্যন্ত জরুরি।
কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, 'মৌসুমের শুরুতেই সব ডেঙ্গু সংক্রমণের ঘটনা চিহ্নিত করা এবং রোগীদের ঘর, কর্মস্থল ও আশেপাশে মশা নিধন অভিযান পরিচালনা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।'
তিনি বলেন, 'যদি কর্তৃপক্ষ মশার প্রজনন হটস্পট ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। তাই, সংক্রমণ রেকর্ড করার জন্য অটোমেশন সিস্টেম চালু করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।'
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সারা দেশের মাত্র ৪১টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। যদিও দেশে অনুমোদিত হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার। এরমধ্যে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার ৮০০।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার বেশিরভাগ ঘটনা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বেশিরভাগ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ডেটা সংগ্রহ করে না।
এ ছাড়া, যেসব ডেঙ্গু রোগী বাড়িতে চিকিৎসা নেন, তাদের পরিসংখ্যানও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেটায় থাকে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল বুধবার সকাল ৮টা থেকে পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ২০৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৩ জনকে ঢাকার বাইরের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে।
তারাসহ চলতি মাসে মোট ১ হাজার ১৩৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। চলতি বছর দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ১৯ হাজার ৩৩৬ জন। মারা গেছেন ৭৩ জন।
ডেঙ্গু পজিটিভ হওয়া যে কোনো রোগীর তথ্য যেনো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেটাতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সেই লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞরা করোনার মতো ডেঙ্গুর জন্যও একটি অটোমেটেড সিস্টেম চালু করার পরামর্শ দিয়েছেন।
বাশার বলেন, 'ডেঙ্গু রোগীর প্রকৃত সংখ্যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানের চেয়ে ১০ গুণ বেশি হবে। কারণ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শুধু ৪১টি হাসপাতালের কেস রেকর্ড করেছে।'
তার ৪ আত্মীয় বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, 'তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেটাতে অন্তর্ভুক্ত হবেন না।'
দ্য ডেইলি স্টারের সংগ্রহ করা পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ১ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীর ১০টি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে অন্তত ১ হাজার ৭৪৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।
তাদের মধ্যে ৮৫ জন ডা. এম আর খান শিশু হাসপাতাল এবং শিশু স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছেন ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। সেপ্টেম্বরের প্রথম ২ সপ্তাহে ৩৫ জন বাড্ডার এএমজেড হাসপাতাল লিমিটেডে, ৬০ জন আল-রাজি হাসপাতালে, ২০৮ কেয়ার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং ১২০ জন মিরপুরের আলোক হেলথকেয়ারে ভর্তি হয়েছেন।
এ ছাড়া, ১ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মিরপুরের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে অন্তত ৪৬৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন। বিআইএইচএস জেনারেল হাসপাতালে এই সংখ্যা ছিল ৬৬৫। একই সময়ে শ্যামলীর ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০৭ জন এবং আল-হেলাল স্পেশালাইজড হাসপাতালে ২০০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।
এ ১০টি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের পরিসংখ্যান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেটায় নেই।
সংক্রামক রোগ আইন ২০১৮ অনুযায়ী, কেউ সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হলে তাকে সরকারকে এ তথ্য জানাতে হবে।
'তাই, সরকারকে সংক্রামক রোগ সম্পর্কে জানানো নাগরিক দায়িত্ব', বাশার বলেন।
কীটতত্ত্ববিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিবিজ্ঞান সমিতির সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুর এ চৌধুরী জানান, তারা মনে করেন, ১৯ হাজার ৩৩৬ জন ডেঙ্গু রোগীর হিসাব খুবই কম। ঢাকার বাইরের ৪০ হাজার রোগীসহ মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৩ লাখেরও বেশি হবে।
তিনি বলেন, 'কোভিড সংক্রমণ অনেক বেশি থাকার সময় রাজধানীর ৪টি বড় সরকারি হাসপাতাল কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে পরিণত হয়েছিল। ওই সময় অনেক ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে যেতে ভয় পেতেন।'
মঞ্জুর জানান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, ভারত, শ্রীলঙ্কা, ব্রাজিল ও পাকিস্তানে ডেঙ্গু সংক্রমণ বেশি। এসব দেশের চিকিৎসকরা নতুন সংক্রমণের ঘটনা খুঁজে পাওয়ার পরপরই একটি রিপোর্টিং পদ্ধতির মাধ্যমে সরকারকে জানান।
`মৌসুমের শুরুতে যখন অল্প সংখ্যক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি জনগণও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে তেমন মনোযোগ দেয় না। তবে, কর্তৃপক্ষ যেন এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে পারে, সেজন্য একদম শুরু থেকেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সব ঘটনা জানানো গুরুত্বপূর্ণ', মঞ্জুর যোগ করেন।
ডা. এমআর খান শিশু হাসপাতাল এবং শিশু স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের উপ-পরিচালক (হাসপাতাল ও প্রশাসন) মোহাম্মদ জান্নাত আলী বলেন, 'আমরা প্রতিদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে ডেটা দিয়েছি। এরপরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে কেন আমাদের ডেটা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, তা জানি না।'
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের এক কর্মকর্তা অবশ্য দাবি করেছেন, তারা এই ১০টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে তথ্য পান না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, 'রিপোর্ট করা সব ডেঙ্গু আক্রান্তের ঘটনাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেটায় অন্তর্ভুক্ত।'
তিনি বলেন, তারা সব হাসপাতাল ও ক্লিনিককে নিয়মিত ডেঙ্গু ডেটা সরবরাহ করার নির্দেশ দিলেও, সবার কাছ থেকে রিপোর্ট পাচ্ছেন না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ভবিষ্যতে ডেঙ্গুর পরিসংখ্যান একটি অটোমেশন সিস্টেমের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে বলে জানান নাসিমা।
অনুবাদ করেছেন জারীন তাসনিম