মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: উৎকণ্ঠা ও অর্থকষ্টে যেমন কাটছে প্রবাসীদের ঈদ
সৌদি আরবের দাম্মামে থাকেন সুরুজ মিয়া। একটুও বিশ্রামের সুযোগ পাননি আজ ঈদের দিন।
সকালে ঈদের নামাজ শেষ করে ময়মনসিংহের ভালুকায় পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন, ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে স্বজনদের কিছুটা আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এর মধ্যেই চলে আসে কোম্পানির গাড়ি, আর তাকে ছুটতে হয় কাজে।
সুরুজের পরিবার এখন তাকে আগের চেয়ে একটু বেশি বেশি ফোন করে। তাদের দুশ্চিন্তা সুরুজের কাজ বা আয় নিয়ে নয়, ভয় এখন ‘যুদ্ধ’ নিয়ে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান হামলা ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইনে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকরা চরম আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
বারবার ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় অনেকে যেতে পারছেন না কিংবা দেশে ফিরতে পারছেন না। আবার কেউ সম্ভাব্য হামলার ভয় নিয়েই কাজ চালিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।
সুরুজ মিয়ার গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে সৌদি আরব যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আকাশে ওড়ার দুই ঘণ্টা পর যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কায় ফ্লাইটটি ফিরে আসে। এরপর কয়েক দফা চেষ্টার পর ৪ মার্চ দিল্লি হয়ে তিনি জেদ্দায় পৌঁছান এবং সেখান থেকে দাম্মামে যান।
আজ শুক্রবার হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'কাজ চলছে ঠিকই, কিন্তু ভয় কাটছে না। দাম্মাম এলাকাটি যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি হওয়ায় দেশে পরিবার সারাক্ষণ ভয়ে আছে।'
ফেনীর দাগনভূঞার এনামুল হক কাজ করেন আমিরাতের শারজাহতে। তার অনিশ্চয়তা কাজে ফেরা নিয়ে।
তিন মাসের ছুটিতে দেশে আসার পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তার ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় আটকে যান। বারবার তারিখ পিছিয়ে আগামী ২৫ মার্চ দুবাই যাওয়ার টিকিট পেয়েছেন তিনি। কাজে ফিরতে বিলম্বের কারণে বাড়িতে আর্থিক অনটন বেড়েছে, সঙ্গে যোগ হয়েছে দুবাই ও এর আশপাশের এলাকায় হামলার আশঙ্কা।
গাজীপুরের কাপাসিয়ার লিপি আক্তারের গল্পটি আরও কষ্টের। গৃহকর্মী ভিসায় ১ মার্চ দুবাই যাওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তিনি সময়মতো যেতে পারেননি।
লিপি ডেইলি স্টারকে বলেন, 'নিয়োগদাতা যেতে বললেও যুদ্ধের কারণে নিরুৎসাহিত করেছেন। সময়মতো যেতে পারলে ১৫ দিনের মাথায় বেতন পেতাম, সন্তানদের ঈদের খরচ দিতে পারতাম।'
তিনি বলেন, 'ঈদে পরিবারের জন্য কিছু করতে পারলাম না। আমাকে যেতেই হবে, কাজ করে আয় করতে হবে।'
অনেকে সৌদি আরব পৌঁছেও স্বস্তিতে নেই। কুমিল্লার দেবিদ্বারের ৫০ বছর বয়সী মোহন ভূঁইয়া বহু কষ্টে ১০ মার্চ আভা শহরে পৌঁছালেও এখন পর্যন্ত কোনো কাজ পাননি।
তার ভাগ্নি মুরশিদা আক্তার ডেইলি স্টারকে জানান, মোহন ঈদের নামাজ পড়ে সারাদিন কাজ খুঁজেছেন। কাজ না পাওয়ায় তিনি বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারছেন না, এমনকি নিজের খরচ চালাতেও হিমশিম খাচ্ছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গোলাম নূরকে (৪৫) ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন দিন আগে ফ্লাইটে উঠেও নেমে যেতে হয়েছে। পরে ৬৩ হাজার টাকা ঋণ করে অন্য ফ্লাইটের টিকিট কিনে জেদ্দায় পৌঁছান।
তিনি ডেইলি স্টারকে জানান, 'পরিস্থিতি এখন কিছুটা সহনীয়, কাজকর্ম চলছে। কিন্তু খরচ বাড়ছে। খোলা আকাশের নিচে কাজ করি বলে পরিবার সারাক্ষণ উদ্বেগের মধ্যে থাকে।'
বিমানবন্দরের ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত ৭১৪টি নির্ধারিত ফ্লাইটের মধ্যে ৬১৪টিই বাতিল হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত পাঁচ বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতে আহমেদ আলী ওরফে সালেহ আহমেদ মারা যান। ২ মার্চ বাহরাইনে নিহত হন এস এম তারেক।
৮ মার্চ সৌদি আরবের আল খারজ এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কিশোরগঞ্জের বাচ্চু মিয়া ও টাঙ্গাইলের মোশাররফ হোসেন নিহত হন। একই হামলায় গুরুতর আহত মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন ১৮ মার্চ রিয়াদে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।