বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি: জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও অর্থনীতির প্রশ্নে উদ্বেগ কোথায়?

ফাহিমা কানিজ লাভা
ফাহিমা কানিজ লাভা

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত ৯ ফেব্রুয়ারি একটি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) সই হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ওয়াশিংটনে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। 

সরকার বলছে, এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে ও শুল্ক কিছুটা কমবে। তবে অনেক বিশ্লেষক বলছেন, চুক্তির কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও স্বাধীন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে ‘শ্যাল’ শব্দটি মোট ১৭৯ বার ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩১ বারই ‘বাংলাদেশ শ্যাল’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মানে বাংলাদেশ নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নিতে বাধ্য থাকবে।

জ্বালানি খাতে কী শর্ত রয়েছে?

চুক্তির কয়েকটি ধারায় বাংলাদেশের জ্বালানি খাত নিয়ে নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো মার্কিন এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি।

চুক্তির অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছরে বাংলাদেশ প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের (১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার) মার্কিন এলএনজি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কিনবে বলে উল্লেখ রয়েছে। 

এ ছাড়া পারমাণবিক প্রযুক্তি নিয়েও একটি ধারা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেনা যাবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা কৌশলগত স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হতে পারে।

আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে মার্কিন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশি মালিকানার সীমা শিথিল করতে হবে। মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে এবং বকেয়া পাওনা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে।

চুক্তির এসব শর্তের ফলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে বিকল্প উৎস বেছে নেওয়ার স্বাধীনতায় চাপ অনুভব করতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে কখনো কাতার, ওমান বা অন্য দেশ থেকে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি পাওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি বাধ্যবাধকতা থাকলে সেই সুযোগ সীমিত হতে পারে।

রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ বা জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও নতুন কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

প্রতিরক্ষা খাত নিয়ে কী বলা হয়েছে?

চুক্তির অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা (৪ নম্বর ধারা) অংশে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ও রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু দেশের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা সীমিত করার ইঙ্গিতও রয়েছে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো—যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তাজনিত নিষেধাজ্ঞা দেয়, তাহলে বাংলাদেশকে সে বিষয়ে আলোচনা করে ‘সহায়ক’ বা ‘পরিপূরক’ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ কারণে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বা যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া দ্বন্দ্বে বাংলাদেশকে নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নিষেধাজ্ঞা বা ‘বাণিজ্যযুদ্ধে’ বাংলাদেশকে কার্যত একই অবস্থানে দাঁড়াতে হবে, যা দেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির পরিপন্থী।

বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে চীন ও রাশিয়া থেকে আসে। ফলে ভবিষ্যতে সেসব উৎস থেকে কেনাকাটা সীমিত হলে ব্যয় ও সরবরাহ—দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক নীতি ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে কেন প্রশ্ন উঠছে?

চুক্তির কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের স্বাধীন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

একটি ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি ‘নন-মার্কেট ইকোনমি হিসেবে চিহ্নিত কোনো দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তি করে, যা এই এআরটি চুক্তিকে দুর্বল করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল বা উচ্চ শুল্ক আরোপের মতো পদক্ষেপ নিতে পারবে। 

যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত চীন, রাশিয়া ও ভিয়েতনামকে এ ধরনের তালিকায় রেখেছে। নন-মার্কেট ইকোনমি ব্যবস্থায় পণ্যের দাম পুরোপুরি বাজারের নিয়মে ঠিক হয় না।

ডিজিটাল বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন কোনো নতুন চুক্তি করতে পারবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে। এমন হলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি চুক্তি বাতিলের ক্ষমতা রাখে।

এছাড়া খনিজ সম্পদ, টেলিযোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সমান সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আরও একটি আলোচিত বিষয় হলো রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি। চুক্তিতে বাংলাদেশের উৎপাদন খাতে দেওয়া বিভিন্ন ভর্তুকির তথ্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাজার প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করে—এমন ভর্তুকি কমানো বা বন্ধের বিষয়ও রয়েছে।

বাংলাদেশ এখনও একটি বিকাশমান অর্থনীতি। দেশীয় শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকার অনেক সময় নগদ সহায়তা, কর ছাড় বা ভর্তুকি দেয়। ভবিষ্যতে সেই নীতিগত সুযোগ সীমিত হলে স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম নিয়ে কেন আলোচনা হচ্ছে?

চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পণ্যে বাংলাদেশের শুল্ক প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসবে বলা হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত পাল্টা শুল্ক পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়নি। 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মোট দুই দফায় শুল্ক আরোপ করলেও মার্কিন আদালত তা বাতিল করে। ফলে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্প এখন ঠিক কত শতাংশ, তা নিয়ে ধোঁয়াশা আছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘মোস্ট ফেভারড নেশন (এমএফএন)’ নীতির প্রশ্ন উঠতে পারে। এই নীতি অনুযায়ী, একটি দেশকে দেওয়া বিশেষ শুল্ক সুবিধা অন্য সদস্য দেশগুলোকেও দিতে হয়।

ফলে বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া সুবিধা অন্য দেশকেও দেয়, তাহলে রাজস্বে বড় চাপ তৈরি হতে পারে। আর যদি না দেয়, তাহলে ডব্লিউটিওর নিয়ম নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।