বিশ্ব বাণিজ্যে আমেরিকার নতুন চাল: কতটা ঝুঁকিতে বাংলাদেশ?
বিশ্ব বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্র এক নতুন ও অত্যন্ত চতুর চাল চেলেছে। এবার তাদের হাতিয়ার কোনো চড়া শুল্ক বা মুদ্রাস্ফীতির অভিযোগ নয়, বরং হাতিয়ারের নাম— জোরপূর্বক শ্রম।
আপাতদৃষ্টিতে একে একটি দারুণ নৈতিক পদক্ষেপ মনে হতে পারে। কারণ জোরপূর্বক শ্রমের পক্ষে কে-ই বা সাফাই গাইতে চায়? কিন্তু এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের বাজার রক্ষার এক সূক্ষ্ম কৌশল, যা বিশ্ব বাণিজ্যের হিসাব-নিকাশ পালটে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযোগকে সামনে এনে নতুন চাপ তৈরি করছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর। আর সেই তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশও।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (ইউএসটিআর) সম্প্রতি প্রায় ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ করেছে। অভিযোগ—এসব দেশের সরবরাহ ব্যবস্থায় এমন পণ্য ঢুকছে, যেগুলো কোনো না কোনোভাবে জোরপূর্বক শ্রমের সঙ্গে যুক্ত। বিষয়টি মানবিক ও নৈতিক হওয়ায় এর বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেওয়াও কঠিন। আর এখানেই কৌশলটা সবচেয়ে কার্যকর হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মূল অভিযোগ দুটি। প্রথমত, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করতে কার্যকর আইন নেই। দ্বিতীয়ত, বাস্তবে যেসব নিয়ম আছে, সেগুলোরও যথাযথ প্রয়োগ দেখা যায় না। মার্কিন বাণিজ্য আইনের ভাষায় এসবকে বলা হচ্ছে ‘অযৌক্তিক বাণিজ্যচর্চা’। আর এই শব্দটাই ভবিষ্যৎ শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তিটা অর্থনৈতিক দিক থেকে বেশ হিসাবি। তাদের দাবি, কোনো দেশ যদি এমন সরবরাহ ব্যবস্থার পণ্য ব্যবহার করে যেখানে জোরপূর্বক শ্রম রয়েছে, তাহলে সেই দেশ আসলে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। কারণ তাদের উৎপাদন খরচ কমে যায়। শ্রম যাচাই, অডিট, কমপ্লায়েন্স বা মানবাধিকার মানদণ্ড মানতে যে অতিরিক্ত খরচ লাগে, তা তারা এড়িয়ে যেতে পারে। ফলে তাদের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে কম দামে বিক্রি হয়। এতে মার্কিন উৎপাদকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে—এটাই ওয়াশিংটনের বক্তব্য।
অবশ্য বিষয়টি পুরোপুরি নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৩০ সাল থেকেই জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা রেখেছে। পরে ২০২১ সালে চীনের শিনজিয়াং অঞ্চল থেকে আসা সব পণ্যকে সন্দেহের তালিকায় ফেলে আরও কঠোর আইন করা হয়। অর্থাৎ, এই নীতির ভিত্তি আগেই তৈরি ছিল।
তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের আগের বড় শুল্কনীতিগুলো আদালতে ধাক্কা খেয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত ব্যাপক শুল্ক আরোপকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেয়। ফলে ওয়াশিংটনের সামনে নতুন আইনি পথ খোঁজার প্রয়োজন দেখা দেয়।
সেই জায়গায় সামনে আসে ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১। এই আইন ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র এখন ‘ফোর্সড লেবার’বা জোরপূর্বক শ্রমের ইস্যুটিকে নতুন বাণিজ্য অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। অর্থাৎ, মানবাধিকার প্রশ্ন এখন শুধু নৈতিক ইস্যু নয়, বাণিজ্যনীতিরও অংশ হয়ে উঠেছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাংলাদেশ একা নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ানের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও এই তদন্তের আওতায় এসেছে। অর্থাৎ, ওয়াশিংটন এমন একটি বৈশ্বিক মানদণ্ড তৈরি করতে চাইছে, যার নিয়মও তারা ঠিক করবে, প্রয়োগও করবে তারাই।
তবে সব দেশের ক্ষেত্রে একই আচরণ করা হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র একটি স্তরভিত্তিক কাঠামো তৈরি করেছে। যারা সহযোগিতা করছে না, তাদের জন্য প্রস্তাবিত অতিরিক্ত শুল্ক ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশ তুলনামূলক কিছুটা ছাড় পেয়েছে। কারণ ঢাকা জোরপূর্বক শ্রমবিরোধী কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সে কারণে বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত অতিরিক্ত শুল্ক ১০ শতাংশ।
কিন্তু এই ছাড়কে স্বস্তি ভাবার সুযোগ খুব কম। কারণ ইউএসটিআরের অবস্থান পরিষ্কার—বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে তারা দুর্বল মনে করছে। অর্থাৎ, বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশকে সাময়িক সুবিধা দিলেও অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়নি।
বাংলাদেশের জন্য সময়টাও খুব কঠিন। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে। সমুদ্রপথে পরিবহন খরচও বাড়ছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের শিল্পখাত ইতোমধ্যেই চাপের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে আবার নতুন শুল্কের ঝুঁকি তৈরি হলে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিখাত আরও চাপে পড়তে পারে।
তবে এখনো সবকিছু চূড়ান্ত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে মতামত জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে আগামী ৬ জুলাই পর্যন্ত। এরপর ৭ জুলাই হবে শুনানি। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সামনে এখনো কূটনৈতিক ও নীতিগতভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ আছে।
কিন্তু পুরো ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা আরও গভীর। একসময় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্বচ্ছতা অনেক দেশের জন্য সুবিধা ছিল। এখন সেই যুগ বদলাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে দিচ্ছে—কোনো দেশের কারখানা, বন্দর বা সরবরাহ ব্যবস্থায় কী ঘটছে, সেটি এখন তাদের বাণিজ্যনীতির অংশ।
যুক্তরাষ্ট্র নতুন যে দেয়াল তৈরি করছে, তা ইস্পাত বা কংক্রিটের নয়। এটি তৈরি হচ্ছে কমপ্লায়েন্স, মানবাধিকার যাচাই আর কাগজপত্রের কঠোর শর্ত দিয়ে। আর এই দেয়াল টপকানো হয়তো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন হবে।