যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষায় গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপে কী কাজ করতে হয়?
বিদেশে উচ্চশিক্ষার খোঁজ করতে গিয়ে ‘গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ’, ‘টিএ’ কিংবা ‘আরএ’ শব্দগুলো নিশ্চয়ই চোখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মাস্টার্স বা পিএইচডির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় খুঁজলে এসব শব্দ প্রায়ই দেখা যায়। কোথাও লেখা থাকে অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের সঙ্গে স্টাইপেন্ড দেওয়া হবে, কোথাও টিউশন সহায়তার কথাও থাকে।
তখন প্রশ্ন আসতেই পারে, গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ আসলে কী? এটি কি বৃত্তি, নাকি চাকরি? আর একজন শিক্ষার্থীকে এর জন্য কী কাজ করতে হয়?
সহজভাবে বললে, গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ হলো মাস্টার্স বা পিএইচডি শিক্ষার্থীর পড়াশোনার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাজে যুক্ত থাকার একটি ব্যবস্থা। শিক্ষার্থী শিক্ষকতা, গবেষণা বা বিভাগীয় বিভিন্ন কাজে সহায়তা করেন এবং এর বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা পান। বিশ্ববিদ্যালয় ও পদের ধরন অনুযায়ী এই সুবিধার মধ্যে স্টাইপেন্ড, টিউশন সহায়তা বা স্বাস্থ্যবিমা থাকতে পারে। তবে সব বিশ্ববিদ্যালয় বা সব অ্যাসিস্ট্যান্টশিপে একই সুবিধা থাকে না।
গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপে শিক্ষার্থীরা সাধারণত টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট বা রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট
টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট বা টিএ সাধারণত শিক্ষকতা-সংক্রান্ত কাজে যুক্ত থাকেন। তবে টিএ হলেই পুরো একটি ক্লাস একা পড়াতে হবে বিষয়টি সব ক্ষেত্রে এমন নয়। কেউ শিক্ষকের অধীনে একটি বড় ক্লাসে সহায়তা করেন। শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট বা পরীক্ষার খাতা দেখা, নম্বর দেওয়া, ক্লাসের উপকরণ প্রস্তুত করা কিংবা শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া তার দায়িত্ব হতে পারে। আবার কোনো কোনো বিভাগে টিএকে ল্যাব বা ছোট ক্লাস সেকশন পরিচালনা করতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ের ক্লাস পড়ানোর দায়িত্বও দেওয়া হয়।
রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট
রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট বা আরএ মূলত গবেষণার কাজে যুক্ত থাকেন। সাধারণত কোনো অধ্যাপক, গবেষণাগার বা নির্দিষ্ট গবেষণা প্রকল্পের সঙ্গে কাজ করেন তারা। গবেষণার বিষয় অনুযায়ী কাজও আলাদা হয়। সাহিত্য পর্যালোচনার জন্য গবেষণাপত্র খোঁজা, তথ্য সংগ্রহ, সাক্ষাৎকারের প্রতিলিপি তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ কিংবা গবেষণার অন্যান্য কাজে সহায়তা করতে হতে পারে। বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়ে ল্যাবের কাজও দায়িত্বের অংশ হতে পারে। আরএ হিসেবে কাজ করা নিজের গবেষণার দক্ষতা তৈরির সুযোগও এনে দেয়। বিশেষ করে ভবিষ্যতে পিএইচডি বা গবেষণায় যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে বাস্তব গবেষণা প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা কাজে আসতে পারে।
সব অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ সরাসরি শিক্ষকতা বা গবেষণার মধ্যে পড়ে না। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা ‘গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্ট’ বা জিএ পদও থাকে। এসব পদে কোনো বিভাগ, কেন্দ্র বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজে সহায়তা করতে হতে পারে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ, অনুষ্ঠান আয়োজনে সহায়তা, তথ্য গুছিয়ে রাখা বা বিভাগের নির্দিষ্ট প্রকল্পে কাজ—দায়িত্বের ধরন পদভেদে বদলে যায়। তাই শুধু ‘জিএ’ লেখা দেখে কাজ কী হবে, সেটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। নিয়োগপত্র বা পদের বিবরণ ভালোভাবে পড়তে হবে।
সপ্তাহে কত ঘণ্টা কাজ করতে হয়?
কাজের সময় বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের ধরন অনুযায়ী আলাদা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০, ১৫ বা ২০ ঘণ্টার অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ দেখা যায়। পূর্ণকালীন শিক্ষার্থী হিসেবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজের নিয়ম থাকে। তবে কাগজে লেখা ঘণ্টাই পুরো গল্প নয়। টিএ হলে পরীক্ষার সময় খাতা দেখার চাপ বাড়তে পারে। আরএ হলে গবেষণার নির্দিষ্ট সময়সীমার আগে কাজ বেশি থাকতে পারে।
বিনিময়ে কী পাওয়া যায়?
এখানেই গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ নিয়ে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপে শিক্ষার্থী নিয়মিত পারিশ্রমিক পান। এর সঙ্গে পুরো বা আংশিক টিউশন সহায়তা এবং স্বাস্থ্যবিমার সুবিধাও থাকতে পারে। তবে সুবিধার ধরন বিশ্ববিদ্যালয়, বিভাগ এবং পদের ওপর নির্ভর করে। তাই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে শুধু অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ দেখেই ধরে নেবেন না যে আপনার পুরো টিউশন মওকুফ হবে। কত টাকা স্টাইপেন্ড, কতটুকু টিউশন সহায়তা এবং স্বাস্থ্যবিমার খরচ কে বহন করবে—এসব আলাদাভাবে দেখে নিন।
বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের কাজের ঘণ্টা ও বেতনের পরিমাণ ভিন্ন হয়। ১০, ১৫ বা ২০ ঘণ্টার অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ থাকে, আর কাজের ঘণ্টার ওপরই সাধারণত বেতন নির্ধারিত হয়। একই বিশ্ববিদ্যালয়েও মাস্টার্স ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদের বেতনের পরিমাণ এক রকম নাও হতে পারে। পিএইচডি শিক্ষার্থীরা মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের তুলনায় বেশি বেতন পান, যদিও এটি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগের নীতির ওপর নির্ভর করে।
আবার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতনের পার্থক্যও বেশ বড় হতে পারে। কোথাও ২০ ঘণ্টার গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপে মাসে প্রায় এক হাজার ডলার দেওয়া হয়, আবার কোথাও একই ধরনের দায়িত্বের জন্য এর দ্বিগুণ বা তারও বেশি বেতন পাওয়া যায়। তাই শুধু অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ আছে কি না দেখলেই হবে না, কাজের ঘণ্টা, বেতনের পরিমাণ এবং টিউশন-সহায়তার ধরনও ভালোভাবে দেখে নেওয়া উচিত।
আরেকটি বিষয় হলো, সব সেমিস্টারে একই ঘণ্টার অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ পাওয়া যাবে এমন নিশ্চয়তা থাকে না। বিভাগীয় চাহিদা, তহবিল বা পদ খালি থাকার ওপর নির্ভর করে কাজের ঘণ্টা কম-বেশি হতে পারে। যেহেতু বেতন কাজের ঘণ্টার ওপর নির্ভর করে, তাই বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ২০ ঘণ্টার অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ ধরে রাখতে চান। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্ধারিত ন্যূনতম জিপিএ বজায় রাখতে না পারলে অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ কি ভর্তির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায়?
সব ক্ষেত্রে নয়। কোনো কোনো প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের জন্য বিবেচনা করা হয়। কোথাও আলাদা আবেদন করতে হয়। আবার কিছু পদ বিভাগ বা নির্দিষ্ট অধ্যাপকের গবেষণা তহবিলের ওপর নির্ভর করতে পারে। এমনকি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি বিভাগেও নিয়ম আলাদা হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ অংশ ভালোভাবে পড়ুন। প্রয়োজন হলে গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম পরিচালক বা বিভাগে ই-মেইল করে জানতে পারেন।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা কি অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ পান?
হ্যাঁ, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ পেতে পারেন। তবে পদের জন্য একাডেমিক যোগ্যতা, বিভাগীয় চাহিদা এবং নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম মানতে হয়। বিশেষ করে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টের ক্ষেত্রে ইংরেজিতে ক্লাস পরিচালনা বা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের সক্ষমতা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা শর্ত থাকতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক আবেদনকারীদের টিএ-সংক্রান্ত ভাষাগত যোগ্যতার নিয়মও দেখে নেওয়া উচিত।



