আদর্শ ভিন্ন হলেও নারীবিদ্বেষে ঐক্য: রাজনীতিতে যেভাবে লক্ষ্যবস্তু জুলাইয়ের নারীরা
গত মে মাসে সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য নিযুক্ত হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীবিদ্বেষী আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন নুসরাত তাবাসসুম ও মানসুরা আলম। যেসব ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে তাদের প্রতি এসব আক্রমণ চালানো হয়েছে সেগুলো আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি ও উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হলেও বিস্ময়করভাবে তাদের আক্রমণের ভাষা ও অপমানের ধরন ছিল একই রকম [১, ২, ৩, ৪]।
উমামা ফাতেমা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় প্রধান সমন্বয়কের একজন নুসরাত তাবাসসুম জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর অন্যতম হয়ে ওঠেন। নেতৃত্বের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা ব্যাপক প্রশংসাও পান। তবে সেই প্রশংসা অভ্যুত্থানের পর আর টেকেনি। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তারাও নিয়মিত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।
সেই আক্রমণের ধরনও ছিল পরিচিত—তাদের শরীর, নৈতিকতা ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণ করা হয় [১, ২, ৩, ৪, ৫ এবং ১, ২, ৩, ৪, ৫]। উমামাকে ‘শাহবাগি বামপন্থী’ ও ‘র’-এর এজেন্ট বলেও আখ্যা দেওয়া হয়েছে [১, ২, ৩, ৪]।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আলোচনায় আসা ১৫ জন নারীকে নিয়ে ফেসবুকে প্রকাশিত পোস্ট খুঁজে দেখেছে দ্য ডেইলি স্টার। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের মধ্যে প্রকাশিত এমন ১৩৯টি পোস্ট পাওয়া গেছে। সেখানে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে রাজনীতিবিদ মানসুরা আলম, তাসনিম জারা, ফারিয়া ইলা, মাহমুদা মিতু থেকে শুরু করে শিক্ষক ও অভিনেত্রীদেরও।
এসব পোস্টের পেছনের অ্যাকাউন্টগুলো আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও রাজনৈতিকভাবে অসংযুক্ত উগ্র ডানপন্থী নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত—যাদের মধ্যে নারীকে লক্ষ্যবস্তু বানানো ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে তেমন মিল নেই।
আক্রমণের ভাষা
বিশ্লেষণ করা ১৩৯টি পোস্টের মধ্যে ৮৮টি, অর্থাৎ ৬৩ শতাংশে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ গালি, অবমাননাকর ভাষা বা নারীদের চরিত্র নিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে। সব রাজনৈতিক পক্ষেই এটি ছিল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত আক্রমণের ধরন।
আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ৫৩টি পোস্টের মধ্যে ৪৭টিতে (৮৯ শতাংশ) যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বা যৌনভাবে অপমানজনক ভাষা ছিল। জামায়াত-সংশ্লিষ্ট ৩৫টি পোস্টের ১৭টি এবং বিএনপি-সংশ্লিষ্ট ২৮টি পোস্টের ১৪টিতে, অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক পোস্টেই এ ধরনের কনটেন্ট পাওয়া গেছে। রাজনৈতিকভাবে অসংযুক্ত উগ্র ডানপন্থী অ্যাকাউন্টগুলোর ১২টি পোস্টের মধ্যে ৪টিতেও এমন ভাষা ছিল।
দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত কৌশল ছিল বডি-শেমিং, যা অন্তত ২২টি পোস্টে পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জামায়াত ও ছাত্রশিবির-সংশ্লিষ্ট আটটি, বিএনপি-সংশ্লিষ্ট পাঁচটি, রাজনৈতিকভাবে অসংযুক্ত উগ্র ডানপন্থীদের তিনটি এবং আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট চারটি পোস্ট ছিল। বিশ্লেষণে ধর্ষণ বা অন্য ধরনের সহিংসতার সরাসরি হুমকি পাওয়া গেছে অন্তত ১১টি পোস্টে।
শনাক্ত করা ১৫ জন নারীর মধ্যে ১২ জনই দুই বা ততোধিক প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আক্রমণের শিকার হয়েছেন। আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি ও রাজনৈতিকভাবে অসংযুক্ত উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীর অ্যাকাউন্টগুলোও একই কৌশল অনুসরণ করেছে। তারা নারীদের রাজনৈতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, তাদের নৈতিকতা নিয়ে আক্রমণ করেছে এবং লিঙ্গভিত্তিক অপমান করে তাদের নীরব রাখার চেষ্টা করেছে।
পাশাপাশি আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো নারী আন্দোলনকারীদের জুলাই আন্দোলনের ভূমিকা খাটো করতে তাদের ‘রাজাকার’, ‘পাকিস্তানি বীজ’ বা ‘জামায়াতের দোসর’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
জামায়াত-সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো আন্দোলনকারীদের বারবার ‘শাহবাগি’ আখ্যা দিয়েছে এবং এই পরিচয়কে ইসলামবিরোধী ও ভারতপন্থী হিসেবে তুলে ধরেছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের দিল্লি বা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে যুক্ত বলেও দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘ওরা গোসল করে না’—এ ধরনের অবমাননাকর মন্তব্য করে তাদের শারীরিক ও নৈতিকভাবে ‘অপবিত্র’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে অসংযুক্ত উগ্র ডানপন্থী অনেক অ্যাকাউন্ট—যারা নিজেদের ‘তাওহিদি জনতা’ হিসেবে পরিচয় দেয়—তারা ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বা ‘নাস্তিক’ প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ভাষ্য দাঁড় করিয়ে ‘শাহবাগি বেশ্যা’র মতো গালিগালাজ ব্যবহার করেছে।
বিএনপি-সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো একই নারীদের অনেককে ‘জামায়াতপন্থী’ আখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি বডি-শেমিং ও যৌন অবমাননাকর ভাষাও ব্যবহার করেছে।
ভুক্তভোগী
নুসরাত তাবাসসুমকে প্রধানত আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো লক্ষ্যবস্তু বানায়। নারীর পোশাক নির্বাচনের স্বাধীনতার পক্ষে নুসরাতের পুরোনো একটি ভিডিওকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ১১টি পোস্ট প্রকাশ করেছে। জামায়াত-এনসিপি জোটের মনোনীত সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হওয়ার পর এই প্রচারণা আরও তীব্র হয়। একই বিষয় নিয়ে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট থেকেও তাকে লক্ষ্য করে চারটি পোস্ট করা হয়।
উমামা ফাতেমার ওপর আক্রমণ প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর একই ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর একটি উদাহরণ। আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট থেকে তার বিরুদ্ধে ১০টি পোস্ট করা হয়। এসব পোস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠনের কমিটি ও ডাকসু নির্বাচন নিয়ে তার প্রকাশ্য বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তাকে একজন ক্যাম্পাস রাজনীতিক হিসেবে অযোগ্য প্রমাণের চেষ্টা করা হয়। এ ছাড়া জামায়াত-সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট থেকে তার বিরুদ্ধে একই ধরনের ছয়টি এবং উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পাঁচটি লক্ষ্যভিত্তিক পোস্ট শনাক্ত করেছে দ্য ডেইলি স্টার।
বিএনপি মনোনীত সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মানসুরা আলম এবং ডাকসু প্রার্থী ফারিয়া ইলা জামায়াত-সংশ্লিষ্ট পেজ ও প্রোফাইল থেকে ভয়াবহ নারীবিদ্বেষী অনলাইন আক্রমণের শিকার হন। মানসুরাকে যৌন বস্তুতে পরিণত করে এমন পাঁচটি এবং ফারিয়াকে লক্ষ্য করে তিনটি পোস্ট শনাক্ত করেছে দ্য ডেইলি স্টার। এসব পোস্টের মধ্যে সহিংসতা ও ধর্ষণের প্রকাশ্য উসকানিও ছিল [১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬]।
আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো এনসিপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা মিতু এবং ডাকসু নেতা ফাতিমা তাসনিম ঝুমাকে লক্ষ্য করে ছয়টি পোস্ট প্রকাশ করে। একই সময়ে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট থেকেও তাদের দুজনকে নিয়ে চারটি পোস্ট করা হয়। রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সমন্বিত এই আক্রমণে তাদের যৌন হয়রানির শিকার করা হয় [১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬]। একটি পোস্টে মিতুর বাসার ঠিকানা ও ফোন নম্বরও প্রকাশ করা হয়।
আন্দোলনের সময় গণমাধ্যমে উপস্থিতির জন্য প্রথমদিকে প্রশংসিত প্রাপ্তি তপশী [১, ২, ৩] সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হন [১, ২, ৩]।
আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের হামলায় আহত হন সীমা আখতার। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক সহযাত্রীরাই সমন্বিত অনলাইন হয়রানির মাধ্যমে তাকে লক্ষ্যবস্তু বানান। এর মধ্যে ছিল ‘স্লাট-শেমিং’ এবং বর্ণবাদী মন্তব্য [১, ২]।
সীমা আখতার বলেন, আন্দোলনের পর নারী ও পুরুষকে যে ভিন্নভাবে দেখা হয়েছে, সেটা অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মনে হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের “নায়ক” হিসেবে পুরুষদের তুলে ধরা হয়েছে, আর নারীদের নামিয়ে আনা হয়েছে “বেশ্যা” পরিচয়ে।’
তিনি বলেন, ‘যেসব নারী সামনের সারিতে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাদেরকে পরিকল্পিতভাবে অনলাইন হয়রানি ও “স্লাট-শেমিং”-এর মাধ্যমে মূলধারার রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক রাজনীতিক ডা. তাসনিম জারাকে প্রথমে তার যৌনস্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষামূলক কনটেন্ট বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়। দল ছাড়ার পর তার বিরুদ্ধে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আক্রমণ আরও বাড়ে। বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও অবমাননাকর নানা তকমাও দেওয়া হয় [১, ২, ৩, ৪, ৫]।
আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা ছিলেন গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সোচ্চার কণ্ঠ। তবে পরে তাকে কথিত বামপন্থী মতাদর্শের অভিযোগ তুলে পরিকল্পিত উসকানিমূলক প্রচারণার মুখে পড়তে হয় [১, ২]।
অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনও ‘স্লাট-শেমিং’-এর শিকার হন এবং তাকে ‘লাল বাঁদর’ আখ্যা দেওয়া হয় [১, ২, ৩]।
২০২৫ সালের মার্চে প্রকাশিত এক গবেষণার জন্য ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ) ৩৩টি দেশের ১৫০ জন নারী সংসদ সদস্য ও সংসদীয় কর্মীর সাক্ষাৎকার নেয়। এতে দেখা যায়, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৬০ শতাংশ নারী অনলাইনে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, ভুয়া তথ্য, ছবি ব্যবহার করে হয়রানি বা ব্যক্তিগত তথ্য অননুমোদিতভাবে প্রকাশের শিকার হয়েছেন—যা আইপিইউর হিসেবে বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অনলাইন হয়রানি এখনো নারীদের রাজনীতিতে আসার পথে ‘একটি বড় সামাজিক প্রতিবন্ধকতা’ হিসেবে রয়ে গেছে বলে দ্য ডেইলি স্টারকে জানান উমামা ফাতেমা। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো সামনের সারিতে নারীদের তুলে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। ‘তারা সাধারণত সংরক্ষিত আসনের মধ্যেই নারীদের জন্য সুযোগ সীমাবদ্ধ রাখেন কিংবা রাজনৈতিক পরিবার থেকে আসা ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেয়। সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করে না।’
উমামা আরও বলেন, রাজনীতিতে নারীরা পর্যাপ্ত সুরক্ষা পান না। ফলে তারা অনলাইন ও অফলাইন দুই ধরনের হয়রানির ঝুঁকিতেই থাকেন। তিনি বলেন, ‘অনলাইন হয়রানির বাইরেও সবসময় অফলাইন হয়রানির ঝুঁকি থাকে।’
সীমা আখতারের মতে, এই হয়রানির মধ্যে একটি সচেতন বার্তা রয়েছে। তার ভাষায়, ‘দৃশ্যমান কয়েকজন নারীকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে পরবর্তী প্রজন্মকে বোঝানো হচ্ছে যে রাজনীতিতে এলে একই ধরনের অপমান ও অবিচার সহ্য করতে হবে। এর পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর মৌলিকভাবে পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো কাজ করছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘নারীরা আন্দোলনে ততক্ষণই গ্রহণযোগ্য থাকেন, যতক্ষণ তারা অন্যদের প্রত্যাশা অনুযায়ী চলেন। ভিন্ন মত প্রকাশ করলেই গালি, অশ্লীল ভাষা, এমনকি ধর্ষণের হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়।’
মেটার নীতি, মেটার ব্যর্থতা
বিশ্লেষণ করা ১৩৯টি পোস্টের অধিকাংশই মেটার নিজস্ব ‘বুলিং অ্যান্ড হ্যারাসমেন্ট’, ‘অ্যাডাল্ট সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন’ এবং ‘প্রাইভেসি/ডক্সিং’ নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে।
লক্ষ্যবস্তু হওয়া ব্যক্তি অফলাইনে ক্ষতির উচ্চ ঝুঁকিতে থাকলে ‘ডিরেক্টেড মাস হ্যারাসমেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত কনটেন্ট সরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে মেটা। তাদের সংজ্ঞা অনুযায়ী, এই শ্রেণিতে মানবাধিকারকর্মী ও ‘নির্বাচনকালীন ঝুঁকিপূর্ণ দেশের বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব’রাও অন্তর্ভুক্ত।
তবে বিষয়টিকে জটিল করে তুলেছে দুটি দিক।
প্রথমটি হলো নীতিমালার প্রয়োগ। জনপরিচিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব সুরক্ষার কয়েকটি কার্যকর হয় কেবল তখনই, যখন ভুক্তভোগী নিজে কনটেন্টটি রিপোর্ট করেন। ফাতিমা তাসনিম ঝুমা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবকে জানান, তার বিকৃত করা ছবি তিনি মেটার কাছে রিপোর্ট করেছিলেন, কিন্তু সেগুলো সরানো হয়নি। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেও কাজ হয়নি।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, মেটার নীতিমালাই পরিবর্তিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি মেটা তাদের ‘হেটফুল কন্ডাক্ট’ নীতিমালা সংশোধন করে। এতে লিঙ্গ বা যৌনতার ভিত্তিতে মানসিক অসুস্থতার অভিযোগ তোলা এবং নির্দিষ্ট কিছু লিঙ্গভিত্তিক গালিগালাজের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়। এই বিশ্লেষণের ১৩৯টি পোস্টের মধ্যে ১৩১টি ওই পরিবর্তনের পর প্রকাশিত। ২০২৫ সালের এপ্রিলে মেটার নিজস্ব ওভারসাইট বোর্ড এই পরিবর্তনের সমালোচনা করে জানায়, এটি ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়া থেকে সরে এসে তড়িঘড়ি করে’ ঘোষণা করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে কী ধরনের মানবাধিকারভিত্তিক মূল্যায়ন করা হয়েছে, সে সম্পর্কে জনসম্মুখে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। বোর্ড মেটাকে মানবাধিকারগত প্রভাব মূল্যায়ন করে তা প্রকাশের আহ্বান জানায়। তবে, এখনো সেই মূল্যায়ন প্রকাশ করেনি মেটা।
আরও একটি পরিবর্তন নজরের বাইরেই থেকে গেছে। মেটার নিজস্ব পরিবর্তন-তালিকা অনুযায়ী, অন্তত ২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত তাদের ‘বুলিং অ্যান্ড হ্যারাসমেন্ট’ নীতিমালা ‘নারীবিদ্বেষী গালিগালাজসংক্রান্ত অবমাননাকর শব্দ’ থেকে সবাইকে সুরক্ষা দিত। বর্তমান সংস্করণে সেই সুরক্ষা কেবল অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীদের জন্য সংরক্ষিত স্তরে রাখা হয়েছে। পৃষ্ঠাটির সংরক্ষিত সংস্করণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৫ এপ্রিলের মধ্যে নতুন ভাষা কার্যকর হয়েছিল। তবে মেটার পরিবর্তন-তালিকায় এই সংশোধনের কোনো তারিখ উল্লেখ নেই।
এই পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষিত তথ্যেও স্পষ্ট। এই বিশ্লেষণে নারীদের উদ্দেশে ব্যবহৃত সবচেয়ে প্রচলিত বাংলা গালিগালাজ থাকা ৪৭টি পোস্টের মধ্যে ৩২টিতে এমন শব্দ রয়েছে, যেগুলোর বিরুদ্ধে এখনো সবার জন্য সুরক্ষার কথা বলে মেটা। বাকি ১৫টিতে এমন গালিগালাজ রয়েছে, যা বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী মেটা অপসারণের প্রতিশ্রুতি দেয় কেবল তখনই, যদি লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তি শিশু হয়।
প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন: মীর রওনক