অ্যালেন গিনসবার্গ: বাংলাদেশের দুঃসময়ের অকৃত্রিম বন্ধু
‘আমি এই দেশে, এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশের নই, আমি সকল দেশের, সকল মানুষের’— বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই উচ্চারণ বিশ্বমানবতার এক অনন্য ঘোষণাপত্র। সাহিত্যিকের প্রকৃত পরিচয় কোনো ভূখণ্ডের সীমানায় আবদ্ধ থাকে না। তিনি মানুষের পাশে দাঁড়ান, মানবতার পক্ষে কথা বলেন।
অ্যালেন গিনসবার্গকে স্মরণ করতে গিয়ে নজরুলের এই কথাটিই বারবার মনে পড়ে। কারণ গিনসবার্গও ছিলেন তেমনই একজন কবি। যিনি জাতি, ধর্ম, রাষ্ট্র কিংবা ক্ষমতার সীমারেখা অতিক্রম করে মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। জন্মসূত্রে মার্কিন হলেও বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিনি এক বিশেষ আপনজন।
চলতি বছরের ৩ জুন মার্কিন কবি ও বিট আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পুরোধা অ্যালেন গিনসবার্গের শততম জন্মবার্ষিকী উদযাপিত হয়েছে। বিশ্বের নানা প্রান্তে তার সাহিত্য, চিন্তা ও সাংস্কৃতিক অবদান নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে নানা আয়োজন। নিউইয়র্ক থেকে সান ফ্রান্সিসকো, লন্ডন থেকে কলকাতা—সর্বত্র তাকে নতুনভাবে স্মরণ করা হয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশের জন্য তার গুরুত্ব কেবল একজন বিশ্বখ্যাত কবি হিসেবে নয়; বরং একজন মানবিক সাক্ষী হিসেবে, যিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দুর্দিনে নিপীড়িত মানুষের কান্নাকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিলেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে গিনসবার্গের সম্পর্কের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ভারতে এসে বাংলাদেশি শরণার্থী শিবিরগুলো ঘুরে দেখেন। যশোর রোডের দুই পাশে লাখো উদ্বাস্তু মানুষের জীবনসংগ্রাম, অনাহার, রোগব্যাধি ও অনিশ্চয়তা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি দেখেছিলেন শিশুদের কঙ্কালসার শরীর, মায়েদের অসহায় চোখ, ভাঙা পরিবারের আর্তনাদ।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই তার বিখ্যাত কবিতা সেপ্টেম্বর অন যশোর রোডের সৃষ্টি।
একাত্তরের সেই উত্তাল সময়ে ওয়াশিংটনের নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসন যখন ভূরাজনৈতিক স্বার্থের ছক কষে পাকিস্তানের বর্বর সামরিক জান্তাকে অন্ধ সমর্থন দিচ্ছিল, গিনসবার্গের মতো মুক্তমনা বুদ্ধিজীবীরা তখন শাসকের রক্তচক্ষুকে পরোয়া করেননি।
রাষ্ট্রের তৈরি কৃত্রিম কাঁটাতার আর অনৈতিক রাজনীতির মুখে চপেটাঘাত করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, ভূগোলের সীমানা ছাপিয়ে মানুষের আত্মিক বন্ধন কতখানি সত্য হতে পারে। সেই গভীর মানবিক তাড়না থেকেই আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে তিনি ছুটে এসেছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত এই জনপদে।
কবি খান মোহাম্মদ ফারাবীর অনুবাদের মাধ্যমে কবিতাটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে নতুন জীবন লাভ করে। কবিতার সেই বিখ্যাত পঙক্তিগুলো আজও আমাদের হৃদয়ে অনুরণিত হয়—
‘শত শত চোখ আকাশটা দেখে
শত শত শত মানুষের দল
যশোর রোডের দু-ধারে বসত
বাঁশের ছাউনি, কাদামাটি জল।’
এই কয়েকটি পঙক্তির মধ্যেই গাঁথা আছে একাত্তরের শরণার্থী জীবনের নির্মম বাস্তবতা। গিনসবার্গ কোনো দূরের পর্যবেক্ষক ছিলেন না। তিনি মানুষের যন্ত্রণা নিজের মধ্যে ধারণ করেছিলেন। ফলে তার কবিতা কেবল সাহিত্য নয়, হয়ে উঠেছিল ইতিহাসের একটি মূল্যবান দলিল।
গিনসবার্গের সঙ্গে সেই সফরে ছিলেন কবি ও সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সুনীল লিখেছিলেন, ‘চারদিকে বন্যা, কাদা আর দুর্ভোগের মধ্যেও গিনসবার্গ অবিশ্বাস্য ধৈর্য নিয়ে শরণার্থী শিবির ঘুরে দেখেছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটেছেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই তার কবিতাকে দিয়েছে এক বিরল মানবিক শক্তি।’
যে দুর্ভোগ গিনসবার্গ দেখতে পান, তার বিশদ বিবরণ কবিতাটিতে উঠে আসে। ফলে এটি শুধু একটি সাহিত্যকর্ম নয়; এক মানবিক দলিল। সেখানে যুদ্ধের রাজনীতি নেই, কূটনৈতিক হিসাব নেই, কোনো রাষ্ট্রীয় প্রচারণাও নেই। আছে মানুষের দুঃখ, বেদনা ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম। গিনসবার্গ বাংলাদেশের মানুষের মুক্তিকে দেখেছিলেন মানবমুক্তির অংশ হিসেবে। তাই তার কবিতায় বারবার উঠে এসেছে নির্যাতিত মানুষের কণ্ঠস্বর।
যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়ে তিনি বন্ধু বব ডিলান ও জোয়ান বায়েজের মতো শিল্পীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই কবিতাকে রূপ দেন গানে। একাধিক কনসার্ট আয়োজন করে শরণার্থীদের সহায়তার জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হয়।
ফলে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ শুধু একটি কবিতা হিসেবেই নয়, আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্বের বহু মানুষ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের মানবিক বিপর্যয়ের খবর জানতে পেরেছিল এই কবিতার মাধ্যমে।
আজও ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় কবিতাটির প্রদর্শন সেই ঐতিহাসিক অবদানের স্মারক হয়ে আছে।
সংগীতশিল্পী মৌসুমী ভৌমিক এই কবিতার একটি চমৎকার ভাবানুবাদ করে বিখ্যাত ‘যশোর রোড’ গানে রূপান্তর করেন। তার অনূদিত ও গাওয়া সংস্করণের শুরুটা ছিল এমন—‘শত শত চোখ আকাশটা দেখে, শত শত শত মানুষের দল...’।
তবে গিনসবার্গের গুরুত্ব কেবল ১৯৭১ সালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার সাহিত্য ও চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা আরও ব্যাপক। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে যখন আমেরিকান সমাজ ভোগবাদ, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক রক্ষণশীলতার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে উঠছিল, তখন গিনসবার্গ ছিলেন প্রতিবাদের অন্যতম কণ্ঠস্বর।
তার বিখ্যাত কবিতা ‘হাওল’ প্রকাশিত হলে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। প্রচলিত নৈতিকতা ও সাহিত্যিক রীতিনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি এমন এক ভাষা নির্মাণ করেন, যা ছিল মুক্ত, স্বতঃস্ফূর্ত ও সাহসী।
বিট আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য কেবল সৌন্দর্যচর্চার বিষয় নয়; এটি সামাজিক সত্য প্রকাশেরও মাধ্যম। তিনি যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, নাগরিক অধিকার আন্দোলন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যের পক্ষে সরব ছিলেন। তার কবিতায় যেমন আত্মস্বীকারোক্তি আছে, তেমনি আছে রাষ্ট্রীয় ভণ্ডামি ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ।
আজকের পৃথিবীতেও গিনসবার্গের এই অবস্থান অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, বৈষম্য, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও মতপ্রকাশের সংকোচন নতুন নতুন রূপে ফিরে আসছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে তথ্যের বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা। এই বাস্তবতায় গিনসবার্গ আমাদের মনে করিয়ে দেন—কবির দায়িত্ব কেবল শব্দ নির্মাণ নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোও।
গিনসবার্গের চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তার বিশ্বজনীনতা। তিনি পৃথিবীর নানা সংস্কৃতি, ধর্ম ও দর্শনের প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন। ভারতবর্ষে তার দীর্ঘ অবস্থান এ কারণেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
১৯৬২-৬৩ সালে তিনি কলকাতায় দীর্ঘ সময় কাটান ও বাংলা ভাষার কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, মলয় রায়চৌধুরীসহ হাংরি আন্দোলনের কবিদের সঙ্গে তার গভীর বন্ধুত্ব ছিল। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়ে তাদের লেখা প্রকাশে সহায়তা করেন। এর মাধ্যমে বাংলা ও পাশ্চাত্য সাহিত্যের মধ্যে এক নতুন সেতুবন্ধন তৈরি হয়।
ভারতীয় দর্শন, বৌদ্ধচিন্তা এবং আধ্যাত্মিকতার প্রতিও তার আগ্রহ ছিল প্রবল। কিন্তু তিনি কখনো অন্ধ অনুসারী ছিলেন না। বরং বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সংলাপ ও বিনিময়ের পথ খুঁজেছেন। তার এই মুক্তচিন্তা বর্তমান সময়ে বিশেষভাবে মূল্যবান।
কেননা আজকের বিশ্বে পরিচয়ের রাজনীতি প্রায়শই মানুষকে বিভক্ত করে। অথচ গিনসবার্গ আমাদের শেখান কীভাবে ভিন্নতা অতিক্রম করে মানবিক সংযোগ গড়ে তোলা যায়।
তার ব্যক্তিজীবনও ছিল প্রচলিত সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদ। তিনি নিজের পরিচয়, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা কখনো আড়াল করেননি। ফলে তার কবিতা হয়ে উঠেছে গভীরভাবে ব্যক্তিগত, আবার একই সঙ্গে সার্বজনীন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তিনি মানুষের সামগ্রিক অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করেছেন। এই সততা ও আত্মপ্রকাশের সাহসই তাকে অনন্য করে তুলেছে।
১৯২৬ সালের ৩ জুন নিউ জার্সির প্যাটারসনে এক ইহুদি পরিবারে জন্ম গিনসবার্গের। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তার সাহিত্যিক বিকাশ শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি জ্যাক কেরুয়াক ও উইলিয়াম বারোজের মতো লেখকদের সঙ্গে মিলে বিট প্রজন্মের বৌদ্ধিক ভিত্তি নির্মাণ করেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি কেবল একটি সাহিত্যিক আন্দোলনের প্রতিনিধি হয়ে থাকেননি; গিনসবার্গ পরিণত হন বিশ্বমানবতার কণ্ঠে।
বাংলাদেশের মানুষ তাকে স্মরণ করে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে। কারণ তিনি আমাদের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সবচেয়ে বড় উপায় কেবল তাকে স্মরণ করা নয়; বরং তার মানবিক চেতনা, স্বাধীনচিন্তা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী অবস্থানকে ধারণ করা।
শতবর্ষে অ্যালেন গিনসবার্গকে স্মরণ করা মানে কেবল একজন কবিকে স্মরণ করা নয়। এটি মানবিক সাহস, বিশ্বজনীন সংহতি ও স্বাধীনতার পক্ষে এক অমলিন কণ্ঠস্বরকে স্মরণ করা।
তিনি দেখিয়ে গেছেন, সত্যিকারের কবিতা কোনো দেশের নয়, কোনো জাতির নয়—তা মানুষের। আর এ কারণেই অ্যালেন গিনসবার্গ আজও বাংলাদেশের আপনজন, যেমনটা আপন তিনি বিশ্বের সব নিপীড়িত মানুষের।