বিনিয়োগ টানতে বন্দর ও লজিস্টিকস খাতে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব
বৈদেশিক বিনিয়োগে আকর্ষণ, রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দেশের লজিস্টিকস খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে একগুচ্ছ নীতিগত সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল, অফডক ও ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি), এয়ার কার্গো ও বন্দর পরিচালনা খাতে নতুন সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এদিন বিকেলে জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, কাস্টমস আইনে নতুন অধ্যায় যুক্ত করে দেশে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (ফ্রি ট্রেড জোন) প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করা হবে। এসব অঞ্চলে রপ্তানির উদ্দেশ্যে পণ্য শুল্ককর ছাড়াই আমদানি, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং, উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত করা যাবে।
এ প্রস্তাব এমন সময়ে এলো, যখন সরকার চট্টগ্রামের আনোয়ারায় দেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। সেই লক্ষ্যে দুবাইয়ের জেবেল আলি ফ্রি জোনের আদলে পরিচালনার পরিকল্পনা করছে সরকার।
বাণিজ্য সহজীকরণের লক্ষ্যে বেসরকারি অফডক ও আইসিডি পরিচালনায় বিদেশি মালিকানার সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ সীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছে বাজেটে।
বর্তমানে দেশে ২৪টির বেশি বেসরকারি আইসিডি পরিচালিত হচ্ছে। এর কয়েকটিতে বিদেশি অংশীদারিত্ব রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে এ খাতে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
এদিকে, বন্দর খাতেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার। বন্দরসেবার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বেসরকারি বন্দর ও টার্মিনাল অপারেটর বিষয়ক পৃথক বিধিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামো পরিচালনায় বিদেশি অপারেটরদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় কনটেইনার টার্মিনাল নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, টার্মিনালটির আধুনিকায়ন ও পরিচালনায় প্রায় ২০ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে ডেনমার্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস। ৩০ বছর মেয়াদি কনসেশন চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটি ৫৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে।
এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) বিনিয়োগ এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ইউরোপীয় প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
টার্মিনালটি চালু হলে বছরে ৮ লাখের বেশি টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা যুক্ত হবে।
এছাড়া পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মেডলগ। এ প্রকল্পে প্রায় ৪ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
লালদিয়া ও পানগাঁও প্রকল্প মিলিয়ে প্রায় ৫৯ কোটি ডলারের নতুন বিদেশি বিনিয়োগের পথ তৈরি হয়েছে।
একইসঙ্গে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানগুলোকে এয়ার কার্গো ক্লিয়ারেন্স কার্যক্রমে যুক্ত করতে নতুন এয়ার কার্গো অপারেটর স্টেশন বিধিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরকারের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যায়ক্রমে পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিক হাবে পরিণত হবে এবং ই-কমার্স খাতের সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও বড় ধরনের প্রণোদনার প্রস্তাব এসেছে। সৌরবিদ্যুৎ শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও উপকরণ আমদানিতে আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও আগাম কর শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ সুবিধা ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

