২৫ বছরে দুগ্ধশিল্পের বাজার ১২ হাজার কোটি টাকা
প্রায় ২৫ বছর আগে দেশের বাজারে প্রথম প্যাকেটজাত তরল দুধ নিয়ে আসে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ‘প্রাণ’। তখন দেশে বিপুল পরিমাণ গুঁড়া দুধ আমদানি হতো। প্রাণের উদ্দেশ্য ছিল সহজ—তরল দুধের উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আনা। কারণ, কৃষির পর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দ্বিতীয় বড় আয়ের উৎসই গবাদিপশু পালন।
দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ সফল হওয়ার পর প্রাণ ঘি ও চিজের মতো দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন শুরু করে। তবে সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। পাস্তুরিত দুধ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বড় ধরনের বিনিয়োগ লাগলেও এসব প্রথাগত পণ্যে মুনাফার হার বেশ কম।
এই সংকটের পথ খুঁজতেই কৌশল বদলায় প্রতিষ্ঠানটি। কেবল তরল দুধে সীমাবদ্ধ না থেকে বৈচিত্র্যময় দুগ্ধজাত পণ্যের প্রসার শুরু করে তারা। একপর্যায়ে মিষ্টি, দই, লাবান, মাঠা ও লাচ্ছি, লাবানসহ দুই ডজনেরও বেশি পণ্য বাজারে নিয়ে আসে প্রাণ।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বাংলাদেশিরা মিষ্টি ভালোবাসেন। সেটা ভালো মিষ্টি হতে হবে। আর এটাই আমাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।’
তিনি বলেন, ‘প্রায় এক দশক আগে ঢাকার অভিজাত এলাকার মানুষই কেবল চড়া দামে প্রিমিয়াম মিষ্টি কিনতেন। আমরা ভাবলাম, এসব পণ্য নিজেরাই তৈরি করে সাশ্রয়ী দামে সবার কাছে কেন পৌঁছে দিচ্ছি না?’
সেই চিন্তা থেকেই ২০১৫ সালে যাত্রা শুরু করে মিষ্টি ও বেকারি ব্র্যান্ড ‘মিঠাই’।
প্রাণের এই যাত্রার সঙ্গে আড়ং, মিল্ক ভিটা, প্যারাগন, আকিজ ও আরডি মিল্কসহ দেশের অন্যান্য বড় দুগ্ধ কোম্পানির গল্পেরও অনেকটা মিল রয়েছে। তারাও দুধ বিক্রির গণ্ডি পেরিয়ে দুগ্ধজাত পণ্যে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে। এসব কোম্পানি মিলে এখন প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার বাজার গড়ে তুলেছে এবং বছরে ৬ থেকে ৮ শতাংশ হারে বাড়ছে এই বাজার। একসময় নির্মাণ ও আবাসন খাতও এমনই গতিতে বাজার বড় করেছে।
বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক এই দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
উৎপাদকদের মতে, নগরায়ণ, জীবনযাত্রার ধরনে পরিবর্তন, ব্যয়যোগ্য আয় বৃদ্ধি, ফাস্টফুডের প্রসার এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় গত দুই দশকে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়েছে।
তবে একটি মৌলিক সমস্যাও সামনে এসেছে। প্রক্রিয়াজাতকারীদের নিয়মিত দুধের সরবরাহ প্রয়োজন, অথচ দুধ উৎপাদনে আগ্রহী খামারির সংখ্যা কমছে।
এ ছাড়া, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ পণ্য নিয়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে জানিয়েছেন এক কৃষি অর্থনীতিবিদ।
দুধ থেকে দুগ্ধজাত পণ্যের নতুন সম্ভার
দুগ্ধজাত পণ্য বাংলাদেশে নতুন নয়। তবে বদলেছে এসব পণ্যের উৎপাদনের পরিসর ও বাজারের বিস্তৃতি।
আড়ং ব্র্যান্ডের দুগ্ধজাত পণ্য বাজারজাত করে ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজেস। প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র ডিরেক্টর মোহাম্মদ আনিসুর রহমান বলেন, উদ্বৃত্ত দুধ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই মিষ্টি দই, ছানা ও ঘির মতো ঐতিহ্যবাহী পণ্য তৈরি হয়ে আসছে। পরে ধীরে ধীরে এগুলো বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, ভোক্তাদের চাহিদা এখন ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির গণ্ডি ছাড়িয়ে টক দই, দুগ্ধভিত্তিক পানীয় ও বিভিন্ন ধরনের চিজেও বিস্তৃত হয়েছে।
আনিসুরের মতে, মিষ্টি ও দই এখনো সারা দেশে জনপ্রিয়। অন্যদিকে টক দই, দইয়ের পানীয় ও চিজ মূলত শহর ও মফস্বলে বেশি খাওয়া হয়।
তিনি বলেন, দেশে দুগ্ধজাত পণ্যের জন্য আলাদাভাবে কোল্ড-চেইন অবকাঠামো না থাকায় এসব পণ্যের বাজার বাড়াতে প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব হিমাগার ও বিতরণ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হয়েছে।
আনিসুরের মতে, কয়েকটি পণ্য এখন বিশেষ সম্ভাবনাময় হয়ে উঠছে। কোমল পানীয়ের স্বাস্থ্যকর বিকল্প খুঁজছেন ভোক্তারা। ফলে লাবান, মাঠা ও লাচ্ছির মতো দুগ্ধভিত্তিক পানীয়ের বাজার দ্রুত বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। ফাস্টফুড শিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে মোজারেলা, কটেজ চিজ ও ক্রিম চিজের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় চিজের বাজারও বিস্তৃত হচ্ছে।
তবে ঘি ও দুধের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ ও দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু ভোক্তা প্যাকেটজাত দুধের ব্যবহার কমাচ্ছেন। আবার অনেকে খাঁটি ঘির বদলে কম দামের বিকল্প পণ্য বেছে নিচ্ছেন।
আনিসুর বলেন, ‘চকলেট ও আমসহ বিভিন্ন ফ্লেভারড মিল্কেরও বাজার বৃদ্ধির জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।’
‘মিল্ক ভিটা’ নামে পরিচিত বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেডের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের ব্যবস্থাপক প্রীতম কুমার দাস বলেন, পাস্তুরিত দুধ, মাখন, ঘি ও গুঁড়া দুধ দিয়ে শুরু করে সমবায় প্রতিষ্ঠানটি এখন পণ্যের পরিসর বাড়িয়ে ২৪ ধরনের দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন করছে। তাদের পণ্যের তালিকায় এখন মিষ্টি, টক ও মিষ্টি দই, দুগ্ধজাত পানীয় এবং মোজারেলা চিজ রয়েছে।
প্রীতম বলেন, ‘মিল্ক ভিটার সবচেয়ে জনপ্রিয় পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে টক ও মিষ্টি দই। আর গ্রীষ্মকালে লাবানের চাহিদা বেড়ে যায়।’
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল জানান, তাদের পণ্যের মধ্যে দই, ঘি ও ফ্লেভারড মিল্কের বাজার সবচেয়ে বড়। ভবিষ্যতে হেলথ ড্রিংক, দই ও দুগ্ধজাত পানীয়র চাহিদা বাড়বে বলে তিনি আশা করছেন।
এই বাজারে নবাগত হিসেবে পা রেখেছে প্যারাগন। গ্রুপটির চেয়ারম্যান মশিউর রহমান জানান, তাদের প্রধান দুগ্ধজাত পণ্য হলো পাস্তুরিত দুধ, ফ্লেভারড মিল্ক, মাখন ও ঘি। এর মধ্যে পাস্তুরিত ও ফ্লেভারড মিল্কের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
তিনি বলেন, সরাসরি দুধ পান করার বদলে ভোক্তারা ফারমেন্টেড দুগ্ধপণ্য এবং তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর বিকল্পের দিকে ঝুঁকছেন।
ঘিয়ের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আরও বৈচিত্র্যময় পণ্য বাজারে আনার পরিকল্পনা করছে প্যারাগন। আইসক্রিমকে বড় প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করে মশিউর বলেন, ‘বর্তমানে এর চাহিদা সরবরাহের চেয়ে বেশি।’
খামারিদের ওপর ভর করে উত্থান, আগ্রহ হারাচ্ছেন তারাই
দুগ্ধশিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়তো ভোক্তার চাহিদায় নয়, বরং সরবরাহ শৃঙ্খলের অন্য প্রান্তে। ব্র্যাকের আনিসুর দুগ্ধ খামারিদের আগ্রহ কমতে থাকাকে এই খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তিনি বলেন, গরুর মাংস উৎপাদন তুলনামূলক সহজ ও বেশি লাভজনক হওয়ায় খামারিরা সেদিকেই ঝুঁকছেন। অন্যদিকে দুগ্ধ খামারিদের প্রতিদিন গবাদিপশুর যত্ন নেওয়া, গাভির দুধ দোহন ও নির্ভরযোগ্য বাজার খোঁজার ঝক্কি সামলাতে হয়। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই তারা সঠিক দাম পান না এবং অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয়ও তুলতে পারেন না।
তিনি বলেন, সবুজ ঘাসের সংকট, কৃষিজমির পরিমাণ কমতে থাকা এবং পশুখাদ্যের ব্যয় বৃদ্ধির কারণেও দুগ্ধ খামারির সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আরেকটি সমস্যা হলো, এই বাজার মূলত শহরকেন্দ্রিক। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কামরুজ্জামান বলেন, বিতরণ ও নির্ভরযোগ্য কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা প্রয়োজন হওয়ায় দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার মূলত শহর ও মফস্বলেই সীমাবদ্ধ।
প্যারাগন গ্রুপের মশিউর বলেন, সরকারি বিধিবিধান, প্রক্রিয়াজাতকরণসংক্রান্ত সমস্যা ও ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দুগ্ধ খাতের উন্নয়নে ওষুধ ও টিকাসংক্রান্ত বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।
চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে দেশীয় দুগ্ধশিল্প?
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, সরকার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তায় আরও বেশি কোম্পানি বিনিয়োগ করায় দেশে দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর বলেন, মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদাও বাড়ছে এবং এই বাজারও বড় হচ্ছে। তবে, এর পরবর্তী ধাপ নির্ভর করবে স্থানীয় উৎপাদকেরা ব্যয় কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন তার ওপর।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত দুগ্ধজাত পণ্যের দাম সাশ্রয়ী ও প্রতিযোগিতামূলক রাখতে উৎপাদন, বিপণন ও অন্যান্য ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। বলেন, ‘দেশে উৎপাদিত দুগ্ধজাত পণ্য প্রতিযোগিতামূলক দামে পাওয়া গেলে আমদানি করা পণ্যের ওপর ভোক্তাদের নির্ভরতা কমবে। এতে দেশীয় দুগ্ধশিল্প শক্তিশালী হবে।’
বাংলাদেশের বাজার আরও উন্মুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই চ্যালেঞ্জও বাড়ছে। কৃষি ও প্রাণিসম্পদ পণ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর বলেন, এর ফলে দেশীয় দুগ্ধশিল্পের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, দর-কষাকষির সুযোগ ছাড়াই সরবরাহকারীর নির্ধারিত দামে আমদানির অনুমতি দেওয়া হলে স্থানীয় উৎপাদকরা প্রতিকূল অবস্থায় পড়তে পারেন। ‘চুক্তিটি পর্যালোচনা করে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা করা উচিত।’