কারখানা ভবনগুলো পড়ে আছে, নেই শুধু কর্মসংস্থান

সৌরভ হোসেন সিয়াম
সৌরভ হোসেন সিয়াম
জাগরণ চাকমা
জাগরণ চাকমা
মহিউদ্দিন আলমগীর
মহিউদ্দিন আলমগীর

আগস্টের শুরুতে রূপগঞ্জে নিজের কারখানাকে জ্বলতে দেখেছিলেন মোহাম্মদ ইপন। আকাশে তখন কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছিল কালো ধোঁয়া। কারখানা থেকে বেশ খানিকটা দূরে ভাড়া বাসায় বসে ইপন বুঝতে পারছিলেন বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল তার।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গাজী টায়ারস কারখানার ভেতরে দাহ্য পদার্থের অভাব ছিল না। রাবার, কেমিক্যালসহ এমন সব জিনিসপত্র সেখানে মজুত ছিল, যাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আগুন জ্বালে। অনেকক্ষণ চেষ্টার পর ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কিন্তু ততক্ষণে ইপনের আট বছরের চেনা কারখানাটির আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।

আগুন নেভার পরক্ষণেই শুরু হয় লুটপাট। কয়েক সপ্তাহ পার হয়ে লুটপাট মাসে গিয়ে গড়ায়। তত দিনে শেরপুর থেকে আসা ইপনের আর কোনো কাজ ছিল না। 

ইপনের জীবন পাল্টে যায়। টায়ার কারখানায় চাকরি হারানোর পর সংসার চালাতে কয়েক মাস তিনি কাছাকাছি একটি কারখানায় কাজ করেন। এরপর পরিবার নিয়ে ফিরে যান গ্রামের বাড়ি। এখন সেখানে কৃষিকাজ করে দিন চলছে তার।

পুড়ে যাওয়ার আগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজীর মালিকানাধীন গাজী টায়ারস ছিল দেশের সবচেয়ে বড় টায়ার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। রূপগঞ্জের কর্ণগোপ এলাকায় থাকা গাজী গ্রুপের আরেকটি কারখানাও একইভাবে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

ওই দুই কারখানার প্রায় ৭ হাজার ২০০ কর্মীর বেশির ভাগই ছিলেন ময়মনসিংহ, শেরপুর, মাদারীপুর, বরিশাল ও কুমিল্লার। তাদের অনেকেই এখন নিজেদের গ্রামে ফিরে গেছেন। 

তবে এমন পরিণতি শুধুমাত্র গাজী টায়ারসের কর্মীদেরই হয়নি।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের আগে ও পরে দেশের প্রায় তিন ডজন শিল্পকারখানায় এমন অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। হামলার শিকার হওয়া বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের মালিকেরই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল।

তবে কারণ যা–ই হোক না কেন, কর্মীদের কাছে ঘটনার পরের পরিস্থিতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিক্ষোভ, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা হঠাৎ কোনো পটপরিবর্তনে যখন একটি কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, তখন এর সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসে পড়ে কর্মীদের ওপর। খেসারত হিসেবে তাদের মজুরি, চাকরি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সব একসঙ্গে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর গাজী টায়ারস, বেক্সিমকোর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক এবং বেঙ্গল গ্রুপের কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও তাদের ওপর নির্ভরশীল মানুষেরাও চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন।

প্রভাব পড়ে সবার ওপর

আবু বকর গাজী টায়ারস কারখানার কাছেই রূপসী বাজারে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে একটি দোকান চালাতেন। তার বেশির ভাগ ক্রেতাই ছিলেন ইপনের মতো কারখানার কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। চা, কেক, পাউরুটিসহ প্রাত্যহিক জীবনের ছোটখাটো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে তারা বকরের দোকানে আসতেন।

কর্মীরা মজুরি পেতেন, বকর তাদের কাছে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রি করতেন এবং পরদিন তারা আবার আসতেন। কিন্তু কারখানা বন্ধ হওয়ার পর ওই চক্রটি একেবারেই থমকে যায়। বিক্রি কমে গেলেও বকর কয়েক মাস দোকানটি কোনোমতে চালিয়ে নেন। কিন্তু একসময় বাধ্য হয়ে তাকে দোকানটি ছেড়ে দিতে হয়।

এই ক্ষতি কোনো না কোনোভাবে পুরো অর্থনীতির ওপরই গিয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ এর আগেও এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। হরতালের কারণে দৈনিক শত শত কোটি টাকা ক্ষতিরও নজির রয়েছে। ২০০৫ সালে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়, হরতালের কারণে তখন দেশের জিডিপির গড়ে ৩ থেকে ৪ শতাংশ ক্ষতি হতো। এর মধ্যে ছিল আয়, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন কমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি।

২০১২ সালের শেষ দিক থেকে ২০১৩ সালের শুরু পর্যন্ত টানা হরতালের সময় ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, বাংলাদেশ (আইসিসিবি) জানিয়েছিল, হরতালের কারণে তখন দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার।

সাম্প্রতিক গবেষণায় ব্যবসার ওপর রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়েছে। ২০১৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ সেন্টারের এক ওয়ার্কিং পেপারে দেখা যায়, টানা সাত দিনের হরতালে একটি প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি পারফরম্যান্স সাড়ে ৪ শতাংশ কমে যায়। এর সবচেয়ে বড় শিকার হয় ছোট রপ্তানিকারক ও সাধারণ বিক্রেতারা। বাধ্য হয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানকে তখন আকাশপথে পণ্য রপ্তানি করতে হয়।

ক্ষতি কেবল কর্মীদের নয়

গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে বেঙ্গল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সাভারে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) কাছে বেঙ্গল গ্রুপের তিনটি কারখানায় আগুন দেওয়া হয়। বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন জানান, ওই কারখানাগুলোতে প্রায় ৩ হাজার কর্মী কাজ করতেন এবং আগুনে তাদের এক হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে।

আগুনে পুড়ে যাওয়া ওই তিনটি কারখানার প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার ব্যাংকঋণ ছিল। কারখানা বন্ধ হওয়ায় এই ঋণ যখন খেলাপি হয়ে যায়, তখন বেঙ্গল গ্রুপের সামগ্রিক ঋণ প্রোফাইল খারাপ হয়ে পড়ে। এর ফলে গ্রুপের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলাও কঠিন হয়ে যায়।

জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের প্রায় ২৬টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে একটি কারখানা খেলাপি হলে পুরো গ্রুপকেই বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয়।’

রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শিল্প খাতে কীভাবে ক্ষতি হতে পারে, বেক্সিমকো তার আরেকটি উদাহরণ। গত ডিসেম্বরে বেক্সিমকো গ্রুপ তাদের ১৫টি পোশাক কারখানার প্রায় ৪০ হাজার কর্মী ছাঁটাই করে। গাজীপুরের উপকণ্ঠে অবস্থিত তাদের রপ্তানিমুখী পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানাগুলোতে পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশ না থাকায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানানো হয়।

বেক্সিমকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওসমান কায়সার চৌধুরী জানান, ৫ আগস্টের পর তাদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে হামলা চালানো হয়। কারখানাগুলোতে আগুন দেওয়া হয় এবং প্রায় ৮০০ কোটি টাকা মূল্যের কাঁচামাল ও তৈরি পণ্য ধ্বংস করা হয়।

বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা। তার গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলো বেক্সিমকোতে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়। বিপুল খেলাপি ঋণের কারণে প্রতিষ্ঠানটি তাদের বেশির ভাগ কারখানাই আর চালু করতে পারেনি।

ব্যাংকগুলোতে বেক্সিমকোর ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। ওসমান কায়সার জানান, কারখানাগুলো আবার চালু করা সম্ভব হলে তারা রপ্তানি আয় দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঋণ পরিশোধ করতে পারতেন।

কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানেই। আগুনে পুড়ে যাওয়ার পরও মেশিন রক্ষা পেতে পারে, ভবন মেরামত করা যেতে পারে। কিন্তু কারখানা চালু করার মতো মূলধন না থাকলে এসবের কোনো মূল্যই থাকে না।

কায়সার বলেন, ‘আমাদের মেশিন আছে, কারখানাও আছে। এখন আমাদের যা প্রয়োজন, তা হলো চলতি মূলধন এবং ব্যাংকের সহায়তা। এটি ছাড়া উৎপাদন পুনরায় শুরু করা অসম্ভব।’

গাজী গ্রুপের কারখানার ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা কাটেনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রুপের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, তারা কারখানাগুলো আবার চালু করতে চান। তবে বিমা-সংক্রান্ত কিছু জটিলতাসহ বেশ কিছু সমস্যা এখনো ঝুলে আছে।

কারখানা বন্ধ হওয়ার আগে গাজী গ্রুপ দেশের টায়ারের মোট চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ পূরণ করত। ২০২৪ সালের ধারাবাহিক হামলা ও অগ্নিসংযোগে রূপগঞ্জে তাদের দুটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্লকের প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠে তারা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। ওই কর্মকর্তা জানান, সরকারের পক্ষ থেকে তারা নীতিগত সহায়তার আশ্বাস পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অতীতে আমাদের ব্যাংকিং লেনদেন ভালো ছিল বলে ব্যাংকগুলোও আমাদের সহযোগিতা করছে। আমরা ক্ষতি কাটিয়ে উঠে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।’

অপেক্ষার প্রহর ফুরায় না

রাজনীতির প্রভাব কর্মক্ষেত্রে পড়ার ঘটনা শুধু বাংলাদেশেই প্রথম নয়। ১৯৮০ সালে পোল্যান্ডের গদানস্ক শিপইয়ার্ডে একটি সাধারণ ধর্মঘট থেকে দেশব্যাপী শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়। ২০১১ সালে মিসরে হোসনি মোবারকের পতনের পর শ্রমিকেরা বেতন ও কর্মপরিবেশের উন্নতির দাবিতে ধর্মঘটে নামেন।

২০১৯ সালে হংকংয়ে কয়েক মাসের টানা বিক্ষোভে সেখানকার দোকানপাট, পরিবহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অচল হয়ে পড়ে। ওই বছর চিলিতে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এক বড় সংকটে রূপ নেয়, যার জেরে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। লেবাননেও সে বছর একই অবস্থা তৈরি হয়—ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়, ব্যবসা স্থবির হয়ে পড়ে এবং কর্মীরা এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন।

মিয়ানমারের অবস্থা আরও ভয়াবহ। ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর টানা বিক্ষোভ, ধর্মঘট ও অর্থনৈতিক ধসের কারণে সেখানে লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারান।

দেশ ভিন্ন হতে পারে, রাজনীতি আলাদা হতে পারে, রাজপথের দৃশ্যপটও ভিন্ন হতে পারে; কিন্তু একটি বিষয় সব জায়গায় একই রকম। যখন রাজপথ উত্তপ্ত হয়, তখন সবচেয়ে আগে এর আঁচ পান খেটে খাওয়া মানুষেরা। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভাবতে হয়, আগামী সপ্তাহটা কীভাবে পার হবে।

এই ভাবনাই ভর করেছে রহমত আলীর। তিনি এখনো অপেক্ষায় আছেন কবে আবার কারখানার গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারবেন। এক বুধবার বিকেলে রূপগঞ্জে গাজী টায়ারসের কারখানার বন্ধ প্রধান ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি ভেতরে উঁকি দিচ্ছিলেন। কিন্তু ভেতরে যাওয়ার কোনো উপায় ছিল না।

কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাধ্য হয়ে শরীয়তপুরে গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেছেন রহমত। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, ‘কারখানাটা আবার খুলল কি না, তা দেখার জন্য আমি প্রায়ই এখানে আসি। যদি কারখানা আবার চালু হয়, আমি এখানেই কাজ করতে চাই।’