বিশ্লেষণ

জ্বালানির দাম বাড়ানো কাম্য নয়, কিন্তু এশিয়ার অধিকাংশ দেশকে তা করতে হয়েছে

অরুণ দেবনাথ
অরুণ দেবনাথ

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো যেকোনো সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নামানোর জন্য যথেষ্ট। যাতায়াত ভাড়া বেড়ে যায়, খাবারের দাম বাড়ে, জীবনযাপনের ব্যয় বাড়ে, এমনকি পাড়ার চায়ের দোকানেও শুরু হয় অসন্তোষ। বিরোধী দলও সমালোচনার সুযোগ পায়। তবুও, এ বছর এশিয়ার প্রায় প্রতিটি তেল আমদানিকারক দেশই বাধ্য হয়ে এই কঠিন সিদ্ধান্তটি নিয়েছে। এটি আসলে দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা লোকসান কমানোর একমাত্র উপায়।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রবাহিত তেলের সিংহভাগই আসে এশিয়ায়, তাই এই পথ বন্ধ হওয়ার প্রভাব আমাদের দোরগোড়াতেই প্রথম আঘাত হানে। এর ফলে সব জায়গায় ডিজেলের দাম এক লাফে অনেকটাই বেড়ে যায়, যার প্রভাব আমাদের দেশেও পড়েছে। এই অবস্থায় প্রতিটি সরকারকেই ওই কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হয়েছে—হয় এখনই মানুষকে বাড়তি দাম দিতে হবে, অথবা এমন কোনো পন্থা হাতে নিতে হবে যাতে সেটা সহজে চোখে পড়বে না।

বাংলাদেশ দুটোই কিছুটা অবলম্বন করেছে। গত এপ্রিলে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বেড়ে ১১৫ টাকা হয়। পাঁচ মাস সেই দামে থাকার পর গত ২১ সেপ্টেম্বর তা আরও বেড়ে ১৩৫ টাকায় পৌঁছায়। এই ডিজেলই দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, যা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের মোট বিক্রির প্রায় ৬৫ শতাংশ।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এর সঙ্গে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার কারণে জাহাজ ভাড়া আকাশচুম্বী হয়েছে। ফলে মার্চ থেকে আগস্ট—এই ছয় মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা।

কর্মকর্তাদের আশা, নতুন দামের ফলে বার্ষিক লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে। একইসঙ্গে এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাশ্রয় হবে এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে জ্বালানি পাচার ঠেকানো সহজ হবে, কারণ সেসব দেশে তেলের দাম আরও বেশি।

তবে আসল সমস্যা অন্য জায়গায়। তেলের দাম না বাড়িয়ে কৃত্রিমভাবে ধরে রাখলে সেই বিশাল লোকসান গায়েব হয়ে যায় না; বরং তা সরকারের ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দেয় এবং জ্বালানি সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধে বিলম্ব ঘটায়। পাম্পে তেলের দাম কমিয়ে রাখা বা স্থিতিশীল রাখা আপাতদৃষ্টিতে জনবান্ধব মনে হলেও এটি আসলে সরকারের আর্থিক বোঝার চাপকে জনগণের চোখের আড়ালে রাখার একটি কৌশল মাত্র।

বাংলাদেশ তার চাহিদার ৯৫ শতাংশ তেল এবং ৩০ শতাংশ গ্যাস আমদানি করে। তাই বিশ্ববাজারে তেলের যে দাম, তা-ই আমাদের দেশের দাম নির্ধারণ করে। অর্থাৎ, বিশ্ববাজারে তেলের দাম যা, আমাদের তা-ই গুনতে হয়।

তাহলে সঙ্গত প্রশ্ন হলো—‘কেন আমরা এই পদ্ধতি অনুসরণ করছি, আর যারা এই দামের ধাক্কা সামলাতে পারছে না, তাদের কী হবে?’

এক্ষেত্রে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর অবস্থা একবার দেখে নেওয়া জরুরি। কারণ একই জ্বালানি সংকট তারাও মোকাবিলা করছে। পাকিস্তানের কথাই ধরা যাক। তারা এখন প্রতিদিন জ্বালানির দাম নির্ধারণ করে। ১ সেপ্টেম্বর ডিজেলের দাম প্রায় ৩৭১ রুপি ছিল। সেটা ১৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বেড়ে প্রায় ৪২৫ রুপিতে দাঁড়িয়েছে। ব্যবস্থাটি কঠোর মনে হলেও পুরোপুরি স্বচ্ছ। তবে সে দেশের সরকার মোটরসাইকেল, রিকশা এবং ছোট গাড়ির জন্য লিটারপ্রতি ১০০ রুপি ছাড় দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কিছুটা কমিয়েছে।

শ্রীলঙ্কার দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২২ সালের জ্বালানি সংকটের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তারা ভোলেনি। তাই তারা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল একটি পথ বেছে নিয়েছে। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তারা ধীরে ধীরে ডিজেলের দাম বাড়ালেও জুনের শেষে বিশ্ববাজারে দাম কমতেই তারা সঙ্গে সঙ্গে তেলের দাম কমিয়ে দেয়। তাদের এই মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতিটি দুই দিক থেকেই (দাম বাড়া ও কমা) সমান কার্যকর। এর সঙ্গে তারা পরিবহন ও মৎস্য খাতের জন্য নির্দিষ্ট সহায়তা এবং দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ব্যবস্থা রেখেছে।

এদিকে ভারত এই সংকট এড়াতে গিয়ে বড় ধরনের মাশুল দিয়েছে। সরকার মার্চে আবগারি শুল্ক কমিয়ে পাম্পে দাম অপরিবর্তিত রেখেছিল এবং রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগারগুলোকে লোকসান টানতে বলেছিল। কিন্তু রাজ্য নির্বাচনের পর দাম বাড়াতে বাধ্য হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের রাজস্বের বিপুল ক্ষতি হয়ে যায়। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লেও খুচরা বাজারে দাম না বাড়ানোয় ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলোকে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি রুপি লোকসান গুনতে হয়।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চিত্রটাও প্রায় একই রকম। ফিলিপাইনে তেলের দামের ওপর কোনো সরকারি সীমা বা ক্যাপ নেই, তারা বাজারের ওপরই সব ছেড়ে দিয়েছে। তবে এর বিপরীতে তারা গাড়িচালক ও পরিবহন খাতের জন্য সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা রেখেছে। মালয়েশিয়া ডিজেলের দাম বাড়ালেও নাগরিকদের জন্য পেট্রোলের ওপর ভর্তুকি বজায় রেখেছে।

ইন্দোনেশিয়া তেলের দাম বাড়ালেও ভর্তুকির ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক তারা। প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর নির্দেশে জাকার্তা এখন দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করছে—বিলাসবহুল জ্বালানির দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর চাপ নিয়ে হলেও সস্তা জ্বালানির জোগান অব্যাহত রাখা হয়েছে।

দিনশেষে সবাইকে কোনো না কোনোভাবে এই দামের মূল্য চুকাতেই হয়—এটাই মূল কথা। পার্থক্যটা কেবল সময়ের হিসাবে, দাম বাড়ার বিষয়টি কতটা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে তাতে, আর আসল ভোগান্তিটা শেষ পর্যন্ত কাদের ওপর গিয়ে পড়ছে সেই জায়গায়।

তাহলে, বাংলাদেশ আসলে কোথায় ভুল করল? জ্বালানির দাম বাড়ানোটা ভুল নয়। ভুল আছে আরও তিনটি জায়গায়।

প্রথমত, মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি। জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখার ফলে যে বড় ধরনের ধাক্কা বা হুটহাট দাম বাড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা এড়াতেই ২০২৪ সালে বাংলাদেশ আইএমএফের পরামর্শে একটি নীতিমালা চালু করেছিল। কিন্তু এপ্রিল, জুন ও সেপ্টেম্বরে সেই নিয়ম না মেনে সরকার নিজের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী না চলে কেবল নিজের সুবিধামতো দাম বাড়ালে, সাধারণ মানুষ বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনিশ্চয়তায় ভোগে। ফলে ব্যবসায়ীরা কোনো কিছু ঘটার আগেই ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বাড়তি দাম ধরেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়।

দ্বিতীয়ত, মূল্যবৃদ্ধির মাত্রা। ব্র্যাক ইপিএলের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারে ডিজেলের দামের পার্থক্য লিটারপ্রতি প্রায় ৮৯ টাকা। এই বিশাল পার্থক্যের বিপরীতে মাত্র ২০ টাকা দাম বাড়ানোয় ডিজেল এখনো ‘প্রকৃত দামের’ অনেক নিচেই বিক্রি হচ্ছে। একদিকে সরকার দাম বাড়িয়ে রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে পড়ছে, অন্যদিকে বিশাল আর্থিক ঘাটতিও পূরণ হচ্ছে না। সেদিক থেকে সরকারের জন্য একে উভয় সংকট বলা যেতেই পারে।

তৃতীয়ত এবং সম্ভবত সবচেয়ে বড় ভুল হলো—কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী বা সুরক্ষার অভাব। পাকিস্তান মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের কথা ভেবেছে, শ্রীলঙ্কা মৎস্যজীবী ও সাধারণ যাত্রীদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নিয়েছে, আর মালয়েশিয়া সাধারণ গাড়িচালকদের একাংশকে ছাড় দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ কোনো ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি বা সাধারণ মানুষের জন্য লাইফলাইন ছাড়াই রাতারাতি দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা এখন দিশেহারা।

এই সংকটের সমাধান হয়তো সরকারের হাতেই ছিল—আর তা হলো বহুল আলোচিত ‘ফার্মার কার্ড’ বা কৃষক কার্ড। বিএনপি সরকার এর প্রচারণা চালিয়েছিল এবং এই কার্ড ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো বা অবকাঠামোও আগে থেকেই তৈরি হয়ে আছে। গত এপ্রিলে ২২ হাজার কৃষককে আড়াই হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে এর একটি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। সর্বশেষ দামবৃদ্ধির মাত্র তিন দিন আগে, অর্থাৎ ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১ লাখ ১০ হাজার ৩৬৪ জন কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করে আরও বড় পরিসরে এই কার্যক্রম শুরুর কথা ছিল। কিন্তু সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে এবং নতুন কোনো তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

ডিসেম্বরে বোরো মৌসুমে সেচ কাজ শুরু হওয়ার আগেই সরকারের উচিত দ্রুত কৃষকদের তালিকাভুক্তির কাজ সম্পন্ন করা। এই কার্ডের সঙ্গে ডিজেলের বাড়তি দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সেচ খরচ বাবদ বাড়তি অর্থ সহায়তা নিশ্চিত করা একান্ত জরুরি। জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধির যে তীব্র ধাক্কা মানুষ এখন অনুভব করছে, তা কিছুটা হলেও সামলাতে এই প্রকল্পটিকে এখনই ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।

পাশাপাশি, মূল্যস্ফীতির যে ভয়াবহ সতর্কবার্তা আমাদের সামনে জ্বলজ্বল করছে, তাকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। ২০২২ সালে যখন ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল, সে সময় মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। বাংলাদেশের ইতিহাসে একদিনে ওটাই ছিল তেলের সবচেয়ে বড় মূল্যবৃদ্ধি। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই ২৬টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে ২৫টির দামই ১৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল।

সে ঘটনার পরের মাসেই মূল্যস্ফীতি এক দশকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং দীর্ঘদিন সেই উচ্চ হারেই স্থির থাকে। আমাদের বর্তমান অবস্থাও স্বস্তিদায়ক নয়; যদিও মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, কিন্তু এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) আশঙ্কা করছে, জ্বালানি সংকট ও খরচ বৃদ্ধির চাপে চলতি অর্থবছরে তা আবারও ৯ শতাংশে উঠে যেতে পারে।

এখন সামনে এগোনোর পথটি হতে হবে স্পষ্ট: জ্বালানির দামের যৌক্তিক ফর্মুলায় ফিরে যেতে হবে, খরচ কীভাবে সমন্বয় করা হবে তার স্পষ্ট রূপরেখা প্রকাশ করতে হবে যেন মানুষ অন্ধকারে না থাকে এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন কৃষকদের সুরক্ষায় কৃষক কার্ডে নিবন্ধনের কার্যক্রম দ্রুততর করতে হবে।