বিশ্ববাজারে কমল তেলের দাম, যেভাবে বাজারে আসছে ১৬ কোটি ব্যারেল তেল
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে সৌদি আরবের পতাকাবাহী তিনটি সুপার ট্যাঙ্কার। বিশ্ববাজারে ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের দাম দেড় থেকে দুই শতাংশ কমেছে এবং ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই দাম সর্বনিম্ন।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে বিশ্ববাজারে সব মিলিয়ে ১৬ কোটি ব্যারলের বেশি তেল সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে আগামী কয়েক মাস তেলের দাম নিম্নমুখী থাকবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে বৈশ্বিক তেলের বাজারে কী প্রভাব পড়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স।
হরমুজে জাহাজ চলাচল শুরু
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইতোমধ্যে হরমুজ পার হওয়া সৌদি পতাকাবাহী তিনটি সুপার ট্যাঙ্কারে প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রয়েছে।
জাহাজ পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টদের বরাতে রয়টার্স জানায়, হরমুজে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থায় ফিরতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। কারণ, সমুদ্রে পাতা মাইন এখনো পুরোপুরি অপসারণ করা হয়নি, তবে কাজ চলছে।
পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হচ্ছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ইতোমধ্যে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করতে শুরু করেছে তেল ও পণ্যবাহী জাহাজগুলো। একইসঙ্গে হরমুজ দিয়ে চলাচলের প্রস্তুতিও নিচ্ছে তারা।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর নিরাপত্তাজনিত কারণে হরমুজসহ পারস্য উপসাগরে অবস্থানরত বিভিন্ন জাহাজ তাদের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখত। এই যন্ত্র মূলত সাগরে জাহাজের অবস্থান শনাক্ত করতে ব্যবহার করা হয়। সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর নিরাপত্তা ঝুঁকি কমে যাওয়ায় ট্রান্সপন্ডার চালু করছে জাহাজগুলো।
কমতে শুরু করেছে তেলের দাম
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গত সাড়ে তিন মাসের মধ্যে এই প্রথম বিশ্ববাজারে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে তেলের দাম।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, আজ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১ দশমিক ২৮ শতাংশ কমে ৭৮ দশমিক ৫৩ ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে ৭৫ দশমিক ৩১ ডলারে নেমেছে।
যেভাবে বাড়বে তেল সরবরাহ
সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে। একইসঙ্গে ৬০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনা চলবে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে থাকা কয়েক কোটি ব্যারেল তেল বিশ্ববাজারে প্রবেশ করবে। ফলে সরবরাহ বেড়ে তেলের দাম কমবে বলে ধারণা তাদের।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণ ও জ্বালানি বাজার বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ খুললে পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে আসতে পারে। আর ইরানের তেলের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে আরও প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল বিশ্ববাজারে যুক্ত হতে পারে।
ক্লেপলারের সিনিয়র জ্বালানি বিশ্লেষক মুইউ শু বলেন, ‘সব মিলিয়ে প্রায় ১৬ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল যুক্ত হতে পারে আন্তর্জাতিক বাজারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানি তেলের সরবরাহ বাড়তে থাকবে।’
তবে সরবরাহ বাড়লেও তেলের দাম খুব দ্রুত কমবে না বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তাদের মতে, এশিয়ার বেশিরভাগ শোধনাগার জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রয়োজনীয় তেল আগেই কিনে ফেলেছে।
এ ছাড়া, সম্প্রতি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল ব্যবহারকারী দেশ চীন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তাদের বেশ কয়েকটি বড় বড় তেল শোধনাগার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখবে। এ সময়ের মধ্যে দেশটি তেল আমদানি না-ও করতে পারে বলে ধারণা করছেন কেউ কেউ।
লন্ডনভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি অ্যাসপেক্টসের তথ্য মতে, জুলাইয়ে দৈনিক প্রায় ১৮ লাখ ব্যারেল তেল পরিশোধন বন্ধ রাখবে চীন। পাশাপাশি দেশটিতে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধির কারণেও জ্বালানি তেলের চাহিদা কমছে।
পূর্বাভাসে যা আছে
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষ নাগাদ উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল রপ্তানি যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরতে পারে এবং অক্টোবরের মধ্যে উৎপাদনও স্বাভাবিক হতে পারে।
তবে ফ্রান্সের ব্যাংক ন্যাশনাল ডি প্যারিস পারিবা’র (বিএনপি পারিবা) মতে, ঘাটতি ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে শিগগির ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ৭৫ ডলারের নিচে নামার সম্ভাবনা কম।
তবে দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হলে এশিয়ার দেশগুলো আবারো ওই অঞ্চলের তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।