বন্দর থেকে আদা খালাসে আমদানিকারকদের গড়িমসি, ঈদের আগে দাম বেড়ে দ্বিগুণ

মোহাম্মদ সুমন
মোহাম্মদ সুমন

ঈদুল আজহার আগে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে আদার দাম। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরে ১১ লাখ কেজি আদার চালান খালাস না করে ফেলে রেখেছেন আমদানিকারকরা।

মাংস রান্নায় অপরিহার্য এই মসলাটি মে মাসের শুরুতে প্রতি কেজি ১১০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে খুচরা বাজারে সারা দেশে ২০০ থেকে ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ভোক্তা অধিকারকর্মীরা বলছেন, দাম নিয়ন্ত্রণে কারসাজি করতে এর আগেও ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রাম বন্দরকে গুদাম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এই ঘটনা নতুন নয়।

এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, মত দেন তারা। তবে আমদানিকারকদের দাবি, নথি সংক্রান্ত জটিলতায় খালাসে দেরি হচ্ছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সূত্র জানিয়েছে, ২০ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত ১৪ জন আমদানিকারক ৪১টি কনটেইনারে প্রায় ১১ লাখ কেজি আদা আমদানি করেন। তবে এখনো সেসব চালান বন্দর থেকে খালাস করা হয়নি।

কাস্টমস ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ব্যবসায়ীদের আগামীকাল শনিবারের মধ্যে চালান খালাস করতে বলেছেন। এই সময়ের মধ্যে আদা খালাস করা না হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে আদার বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫ লাখ টন। এর মধ্যে আমাদের দেশে উৎপাদন হয় প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ টন। বাকিটা আমদানি করতে হয়।

ব্যবসায়ীদের মতে, মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহার আগে সাধারণত আদার চাহিদা বেড়ে যায়।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার নাজমুল হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, খালাস প্রক্রিয়ায় যুক্ত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের মঙ্গলবার  ডেকে দেরির কারণ জানতে চাওয়া হয়।

‘আমদানিকারকদের সঙ্গে যোগাযোগের পর তাদের এজেন্টরা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, শনিবারের মধ্যে তারা চালান খালাস করবেন,’ বলেন তিনি।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে আমদানিকারকরা বন্দরে চালান আটকে রাখছেন—এমন অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা কাস্টমস কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আশা করছি, দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।’

জাহিদুল ইসলাম বলেন, ঈদুল আজহার আগে নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা ও অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে বাজার তদারকি জোরদার করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘বাজার কারসাজি বা মজুতদারির প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৮ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রায় ৭৭ হাজার টন আদা আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ৭৯ হাজার টন।

কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ব্রাদার্স ট্রেড, ইফতি ইন্টারন্যাশনাল, সৌরভ ইন্টারন্যাশনাল ও নাঈম ট্রেডার্স খালাসে দেরি করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের চালান খালাসের দায়িত্বে রয়েছে মার্কো ইন্টারন্যাশনাল সিঅ্যান্ডএফ লিমিটেড।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. একরামুল হক ভূঁইয়া ইচ্ছাকৃতভাবে সরবরাহ সংকট তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, ‘কাগজপত্রসংক্রান্ত জটিলতার কারণে খালাসে দেরি হয়েছে। সব আমদানিকারকদের সঙ্গে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং আমাদের দায়িত্বে থাকা নয়টি চালান শনিবারের মধ্যে খালাস করা হবে।’

তিনি দাবি করেন, আদাভর্তি কনটেইনারগুলো প্রতিদিন ধাপে ধাপে খালাস করা হচ্ছে এবং বাকি চালানও পর্যায়ক্রমে ছাড়িয়ে নেওয়া হবে।

বন্দর বিধিমালা অনুযায়ী, পণ্য বন্দরে পৌঁছানোর চার দিনের মধ্যে খালাস করলে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত কোনো চার্জ দিতে হয় না। এরপর থেকে বিলম্ব মাশুল আরোপ করা হয়। ৩০ দিনের বেশি সময় পণ্য খালাস করা না হলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সেগুলো নিলামেও তুলতে পারে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘আমদানিকৃত পণ্য খালাসে দেরি করে বন্দরকে গুদাম হিসেবে ব্যবহারের এই চর্চা নতুন নয়।’

‘বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের নানা উদ্যোগের পরও এই চর্চা বন্ধ হয়নি। যথাযথ কারণ ছাড়া যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে পণ্য জব্দসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত,’ বলেন তিনি।