বেসরকারি খাতে আসছে বড় প্রণোদনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ে শঙ্কা
ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণের চাপ ও শিল্প খাতের স্থবিরতার মধ্যে বেসরকারি খাতে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বড় প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বন্ধ কারখানা চালু হবে, নতুন বিনিয়োগ বাড়বে এবং ২৫ লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের একাংশ সতর্ক করে বলছেন, সরবরাহ সংকট ও ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানো না গেলে এই প্রণোদনা উল্টো মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াতে পারে।
গতকাল শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, শিল্প খাতের অচলাবস্থা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং কর্মসংস্থানের সংকট মোকাবিলায় এই প্যাকেজ নেওয়া হয়েছে।
এই প্যাকেজের দুটি মূল অংশ রয়েছে। প্রথম অংশ হলো ৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল। ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে কমপক্ষে তিন বছরের জন্য ১০ শতাংশ সুদে দীর্ঘমেয়াদি আমানত নেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই অর্থ ৪ শতাংশ সুদে পুনঃঅর্থায়ন করবে এবং বাকি ৬ শতাংশ সরকার ভর্তুকি দেবে।
দ্বিতীয় অংশে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে গঠিত ১৯ হাজার কোটি টাকার তহবিল। এই অর্থ সরকারের গ্যারান্টিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব উৎস থেকে দেওয়া হবে।
এই পরিকল্পনার আওতায় বড় ঋণগ্রহীতারা প্রায় ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন। তবে পরিচালন ও প্রশাসনিক ব্যয়ের কারণে ছোট ঋণের সুদের হার কিছুটা বেশি হতে পারে। বাস্তবায়নের বিস্তারিত নির্দেশনা পরে সার্কুলারের মাধ্যমে জানানো হবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের সবচেয়ে বড় অংশ, অর্থাৎ ২০ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য। এছাড়া কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা, ক্ষুদ্র, মাইক্রো ও কুটির শিল্প খাতের (সিএমএসএমই) জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকা এবং উত্তরবঙ্গ কৃষি হাব উদ্যোগের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নের ১৯ হাজার কোটি টাকার অংশ থেকে ১০টি বিশেষ কর্মসূচিতে অর্থায়ন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে শিপমেন্ট-পূর্ব রপ্তানি অর্থায়ন, সিএমএসএমই সহায়তা, প্রবাসী কর্মসংস্থান অর্থায়ন, স্টার্টআপ তহবিল ও তরুণদের কর্মসংস্থান কর্মসূচি।
এছাড়া সৃজনশীল শিল্প খাতে সহায়তার জন্য করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে। এই অর্থ ফেরত দিতে হবে না।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকার (২৮টি আলাদা কর্মসূচির অধীনে) প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন এই উদ্যোগ সেই সময়ের পর সবচেয়ে বড় প্রণোদনা প্যাকেজ।
গভর্নরের ভাষ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। এটি আরও কমে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ইস্পাত, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি এবং উৎপাদন খাতের স্থবিরতা অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়া এবং ঋণের উচ্চ সুদ এসএমই খাতের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত করেছে।
গভর্নর আরও বলেন, অর্থ পাচার ও আর্থিক অনিয়ম ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করেছে এবং তারল্য সংকট বাড়িয়েছে। তার মতে, অনেক খেলাপি ঋণ ব্যবসায়িক ব্যর্থতার কারণে নয়, বরং যথাযথ জামানত ছাড়াই অর্থ সরিয়ে নেওয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, এই প্যাকেজের জন্য নতুন টাকা ছাপানো হচ্ছে না। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পড়ে থাকা অলস অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা হবে।
তিনি জানান, কিছু ব্যাংকে অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে, আবার কিছু ব্যাংক তারল্য সংকটে আছে। পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে এই অলস অর্থ অর্থনীতির সক্রিয় খাতে প্রবাহিত করাই মূল লক্ষ্য।
গভর্নর আরও জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১৯ হাজার কোটি টাকার তহবিলের মধ্যে ইতোমধ্যে ৬ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্বৃত্ত মুনাফা থেকে সরবরাহ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি স্বীকার করেন, কোভিডকালীন প্রণোদনা কর্মসূচিতে কিছু বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বেশি সুবিধা পেয়েছিল। এবার সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে বলে জানান তিনি।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশাবাদী হলেও ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা এই প্যাকেজের নকশা, তহবিলের উৎস, বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা এবং এর ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন এই উদ্যোগকে ‘চমৎকার পরিকল্পনা’ বললেও বাস্তবায়নকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।
তার ভাষ্য, ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্যের বড় অংশ ইতোমধ্যে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা আছে। পাশাপাশি দৈনন্দিন কার্যক্রমের জন্যও ব্যাংকগুলোকে কিছু অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। ফলে এই তহবিলে অংশ নেওয়া সহজ নাও হতে পারে।
তিনি পরামর্শ দেন, বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের বিপরীতে রেপো রেট কমাতে পারত অথবা সিআরআর কমিয়ে ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত তারল্য দিতে পারত। এতে প্যাকেজ বাস্তবায়ন আরও সহজ হতো বলে তিনি মনে করেন।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানও বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, বন্ধ বা ব্যর্থ কারখানায় ঋণ দেওয়া ব্যাংকগুলোর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব প্রতিষ্ঠান চালু করতে ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন, নতুন কর্মী নিয়োগ এবং আর্থিক পুনর্গঠন প্রয়োজন হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে প্রায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। এর কারণ তারল্যের অভাব নয়, বরং ভালো ঋণগ্রহীতার সংকট। পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক বলেন, প্যাকেজটির উদ্দেশ্য ভালো হলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল। তার মতে, এই ধরনের বড় প্রণোদনা বাজারে মূল্যচাপ বাড়াতে পারে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়াতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, সাধারণত অর্থনীতিতে চাহিদা কমে গেলে এবং মূল্যস্ফীতি কম থাকলে এ ধরনের প্রণোদনা কার্যকর হয়। কিন্তু বাংলাদেশ এখন একই সঙ্গে ধীর প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মুখে রয়েছে।
তার মতে, সরবরাহব্যবস্থার সমস্যাগুলো সমাধান না করে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ করলে উৎপাদনের চেয়ে পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ার ঝুঁকিই বেশি থাকবে।