ঈদেই কেন বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে
ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মিশে আছে এক গৌরবোজ্জ্বল ও সোনালী অধ্যায়। এক সময় এ দেশে নিয়মিত নির্মিত হতো অসংখ্য ব্যবসাসফল ও মানসম্মত চলচ্চিত্র, যা দর্শকদের হলমুখী করতে জাদুর মতো কাজ করত।
তখন কেবল ঈদ বা বিশেষ উৎসব নয়, সারা বছরজুড়েই বড় বাজেটের সিনেমাগুলো প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেত। তবে সময়ের বিবর্তনে সেই চিরচেনা চিত্র এখন অনেকটাই ম্লান।
গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তির জন্য নির্মাতারা এখন কেবল দুই ঈদকেই বেছে নিচ্ছেন, যা চলচ্চিত্র পাড়াকে যেন কেবল উৎসবকেন্দ্রিক করে তুলেছে।
বিষয়টি নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন কয়েকজন নির্মাতা ও শিল্পী।
‘উৎসব’ ও ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ঢালিউডের আলোচিত দুই সিনেমা। দুটি সিনেমাই পরিচালনা করেছেন তানিম নূর। তিনি বলেন, আমাদের এখানে সিনেমা প্রযোজনা করাটাই ঝুঁকিপূর্ণ; সহজে কেউ প্রযোজনায় আসতে চান না। না চাওয়ার অন্যতম কারণ হলো—লগ্নিকৃত টাকা তো ফেরত আসতে হবে।
তিনি আরও বলেন, একটা সময় ছিল, ঈদ ছাড়া সারা বছর সিনেমা মুক্তি দিয়ে সেই বিনিয়োগ তুলে আনা সম্ভব হতো। এখন তা আর সম্ভব হচ্ছে না। ঈদে মুক্তি দেওয়া হলে তবুও কিছুটা টাকা উঠে আসার সম্ভাবনা থাকে, কিছুটা স্বপ্ন বেঁচে থাকে।
‘এ কারণেই আমি মনে করি, ঈদ ছাড়া বড় বাজেটের সিনেমা এ দেশে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না। তবে এই জায়গা থেকে বের হয়ে আসা দরকার।’
মিশা সওদাগর অসংখ্য সিনেমায় অভিনয় করেছেন। তার ক্যারিয়ারে বহু ব্যবসাসফল সিনেমা যুক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, শুধুমাত্র ঈদের সময় বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি দিলে উন্নতি হবে না; সারা বছর ধরেই সিনেমা মুক্তি দিতে হবে। তাহলেই ঢাকাই সিনেমা চাঙা হবে। অন্তত ১২ মাসে ১২টি হিট সিনেমা দরকার।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ধরুন বারো মাসে এক বছর—আমি এক মাস খেলাম, আর এগারো মাস না খেয়ে থাকলাম; তাহলে জীবন চলবে না, থেমে যাবে। সেভাবেই যদি দুটি ঈদে বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি দেওয়া হয়, তাহলে কীভাবে চলচ্চিত্র শিল্প টিকে থাকবে, ঘুরে দাঁড়াবে? প্রথমত ভালো সিনেমা এবং দ্বিতীয়ত বড় বাজেটের সিনেমা—দুটিই বছরব্যাপী মুক্তি পেতে হবে।
‘মনপুরা’খ্যাত পরিচালক গিয়াসউদ্দিন সেলিম বলেন, আমাদের ভঙ্গুর চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য ঈদকেন্দ্রিক বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি কোনোভাবেই ফলপ্রসূ হতে পারে না, হবেও না। এভাবে চলতে পারে না। চলচ্চিত্রশিল্পকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে অবশ্যই সারা বছর কিছু কিছু বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি দিতে হবে এবং ভালো সিনেমা নির্মাণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের এখানে যারা প্রযোজনা করেন, তাদের কাছে অনুরোধ, বছরব্যাপী সিনেমা মুক্তি দিন। পরিকল্পনা করে এগোতে হবে। সারা বছর দর্শকদের জন্য সিনেমা উপহার দিতে হবে; এর কোনো বিকল্প নেই।
তৌকীর আহমেদ এ পর্যন্ত সাতটি সিনেমা নির্মাণ করেছেন। তার সিনেমা শুধু দেশে নয়, বিদেশেও প্রশংসা ও সম্মান পেয়েছে। তিনি বলেন, এটুকু বলতে পারি যে ভালো গল্পের সিনেমা হলে দর্শক তা দেখেন; এটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে। দর্শকরা ভালো গল্পের সিনেমাই চান। কাজেই ঈদের সময় দর্শক বেশি পাওয়া যায়, কিন্তু অন্য সময় পাওয়া যাবে না, তা নয়। চেষ্টা করলে সবই সম্ভব। এজন্য বলতে পারি, বারো মাসই সিনেমা মুক্তি পেতে পারে। তাহলে দর্শকরা দেখবেন, ভালো সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে—তখন তারা হলে যাবেন।
চঞ্চল চৌধুরী অভিনীত বেশিরভাগ সিনেমাই দর্শকদের কাছে পৌঁছেছে; তার সিনেমাভাগ্য ভালো বলা যায়। দেশের বাইরেও তিনি সিনেমা করেছেন। বছরব্যাপী সিনেমা মুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের সিনেমার সোনালি অতীত রয়েছে, এবং একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্যও আছে। একইসঙ্গে বলব, এখনো দর্শকরা ভালো সিনেমার অপেক্ষায় থাকেন এবং ভালো সিনেমা হলে গিয়ে দেখেন। এর সর্বশেষ প্রমাণ এবারের ঈদের সিনেমাগুলো।
তিনি বলেন, আমি মনে করি, বছরজুড়ে সিনেমা মুক্তি পাওয়া দরকার। শুধু কেন দুটি ঈদে বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি পাবে? স্বীকার করছি, ঈদে দর্শকরা বেশি করে হলমুখী হন; কিন্তু আমরা যদি ১২ মাস ধরে ভালো সিনেমা মুক্তির বিষয়টি নিয়ে না ভাবি, তাহলে হবে না। ভাবতে হবে এবং সে অনুযায়ী কাজও করতে হবে।
ঢাকাই সিনেমার দর্শকপ্রিয় নায়ক সিয়াম আহমেদ। তার ঝুলিতে বেশ কিছু সফল সিনেমা যুক্ত হয়েছে। ‘জংলি’ সিনেমা দিয়ে গত বছর তিনি বেশ আলোচিত হন। এ বছর ‘রাক্ষস’ সিনেমায় নতুনভাবে দর্শকদের সামনে এসেছেন এবং প্রশংসা কুড়াচ্ছেন।
সারাবছর সিনেমা মুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, চলচ্চিত্রের একজন শিল্পী হিসেবে আমি মনে করি, সারাবছর বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি পাওয়া দরকার। পাশাপাশি ভালো ভালো সিনেমাও সারা বছর জুড়ে মুক্তি পাওয়া উচিত। তাহলে দর্শকরা বেশি করে ভালো সিনেমা দেখতে পারবেন। এ বিষয়ে প্রযোজক ও পরিচালকদের আরও বেশি করে ভাবতে হবে।