নতুন জেমস বন্ডের খোঁজ শুরু, ০০৭ চরিত্রটি কেমন হবে

স্টার অনলাইন ডেস্ক

'নামটা বন্ড, জেমস বন্ড'—দীর্ঘ ৬ দশক ধরে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় এই ডায়ালগটি এবার কার কণ্ঠে শোনা যাবে?

১৯৬২ সালে ‘ড. নো’ সিনেমার মাধ্যমে প্রথম জেমস বন্ড চরিত্রটির যাত্রা শুরু। এই চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেছিলেন শন কনারি। এরপর গত ৬ দশকে মোট ২৭টি সিনেমায় ৬ জন বিখ্যাত অভিনেতা এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

সবশেষ ২০২১ সালে ‘নো টাইম টু ডাই’ সিনেমার মাধ্যমে ড্যানিয়েল ক্রেইগ বিদায় নিলে শূন্য হয়ে যায় জেমস বন্ডের সিংহাসন।

অবশেষে বন্ডপ্রেমীদের প্রায় ৫ বছর অপেক্ষার অবসান শেষ হচ্ছে।

শুরু হয়েছে পরবর্তী জেমস বন্ড চলচ্চিত্রের অভিনয়শিল্পী বাছাই বা অডিশন প্রক্রিয়া।

গত সপ্তাহে সিনেমার প্রযোজনা সংস্থা ‘অ্যামাজন এমজিএম স্টুডিওস’ এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ঘোষণা দিয়েছে ‘পরবর্তী জেমস বন্ডের খোঁজ শুরু হয়েছে।’

স্টুডিও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন ০০৭ খোঁজার প্রক্রিয়া শুরু হলেও অডিশন চলার সময় কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখা হবে। সঠিক সময়েই আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ০০৭ এর নাম প্রকাশ করা হবে।

গত বছর অ্যামাজন জেমস বন্ডের স্বত্ব কিনে নেওয়ার পর থেকেই বন্ড ব্র্যান্ডকে নতুনভাবে বাঁচিয়ে তুলতে একটি ক্রিয়েটিভ টিম গঠন করেছে। এর মধ্যে রয়েছেন বিখ্যাত পরিচালক ডেনিস ভিলনেভ ও চিত্রনাট্যকার স্টিভেন নাইট।

অভিজ্ঞ কাস্টিং ডিরেক্টর নিনা গোল্ডের ওপর দায়িত্ব পড়েছে কয়েক ডজন সুদর্শন তরুণের মধ্য থেকে যাচাই-বাছাই করে একজনের হাতে 'লাইসেন্স টু কিল' তুলে দেওয়ার।

কিন্তু নতুন বন্ডের মধ্যে কী খুঁজছেন তারা, আর কার মধ্যেই বা আছে সেই গুণ?

বন্ড বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্দায় এই কালজয়ী গুপ্তচর হয়ে উঠতে নতুন অভিনেতার মধ্যে অবশ্যই নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী থাকতে হবে।

সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে আসে নতুন ০০৭ এর মধ্যে যে ৫টি প্রধান গুণ থাকতে হবে তার তথ্য।

ব্রিটিশ (কিংবা কাছাকাছি সংস্কৃতির) হতে হবে

জেমস বন্ড ব্রিটেনের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতীক। তাই অ্যামাজন এই পরিচয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে চায় না।

যদিও সম্ভাব্য অভিনেতাদের বেশিরভাগই যুক্তরাজ্যের। তবে অতীতে বাইরের দেশ থেকেও অভিনেতা নেওয়ার নজির রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার জর্জ ল্যাজেনবি একটি মুভিতে বন্ড হয়েছিলেন। আর আইরিশ অভিনেতা পিয়ার্স ব্রসনান চারটি মুভিতে এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন। দুজনই পর্দায় নিজেদের আসল উচ্চারণ কিছুটা বদলে ব্রিটিশদের মতো করে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিনেতা যদি ব্রিটেনে পড়াশোনা করেন এবং উচ্চারণ ও আচরণে নিজেকে ব্রিটিশ প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে তার জন্ম কোথায়—সেটি বড় বিষয় নয়।

তবে উচ্চারণ যতই নিখুঁত হোক না কেন আমেরিকান অভিনেতাকে বন্ড হিসেবে সহজে মেনে নেবে না দর্শকরা।

চিত্রনাট্যকার ব্রুস ফেয়ারস্টেইন বিবিসিকে বলেন, ‘বন্ড আন্তর্জাতিকভাবে এত জনপ্রিয় হওয়ার বড় কারণ হলো, সে আমেরিকান নয়।’

জেমস বন্ড চরিত্রে যুক্তরাজ্যের অভিনেতাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। ছবি: সংগৃহীত

তরুণ হতে হবে

জেমস বন্ড চরিত্রটি সাধারণত অভিজ্ঞ ও পরিণত বয়সের একজন মানুষ। যিনি সিক্রেট সার্ভিসে যোগ দেওয়ার আগে রয়্যাল নেভির কমান্ডার ছিলেন এবং ‘ডাবল জিরো’ স্ট্যাটাস পাওয়ার আগে পুরো পৃথিবী চষে বেড়িয়েছেন। ফলে বন্ড চরিত্রে অভিনেতাদের বয়স সাধারণত ২৯ থেকে ৪৪ বছরের মধ্যে থাকত।

তবে এবার নতুন প্রজন্মের দর্শকদের টানতে ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী বন্ডকে খোঁজা হচ্ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।

‘সাম কাইন্ড অব হিরো: দ্য রিমার্কেবল স্টোরি অব দ্য জেমস বন্ড ফিল্মস’ এর সহ-লেখক ম্যাথিউ ফিল্ড বলেন, ‘আমার ধারণা, নতুন জেমস বন্ডের বয়স হবে ৩০ বছরের নিচে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জেমস বন্ড চরিত্রটি কেবলমাত্র চার-পাঁচটি সিনেমার জন্য নয়। এটি আজীবনের দায়িত্ব। ব্রসনান ২৫ বছর আগে বন্ড জ্যাকেট তুলে রেখেছেন, কিন্তু আজও প্রতিটি সাক্ষাৎকারে এ প্রসঙ্গে কথা বলতে হয় তাকে।’

বিখ্যাত হলে চলবে না

ইতিহাস বলে, জেমস বন্ড চরিত্রটি কখনোই খুব বেশি বিখ্যাত তারকাদের কপালে জোটেনি।

বন্ডের মূল প্রযোজক অ্যালবার্ট আর ব্রকোলির বিশ্বাস ছিল, ‘বন্ড চরিত্রটাই আসল তারকা।’

জর্জ ল্যাজেনবি ছিলেন প্রায় অজানা মুখ। শন কনারি, টিমোথি ডালটন বা ড্যানিয়েল ক্রেগ অভিনয় জগতে পরিচিত হলেও তারা বন্ড হওয়ার আগে বড় মাপের তারকা ছিলেন না।

শন কনারি, ড্যানিয়েল ক্রেগ ও টিমোথি ডালটন। ছবি: সংগৃহীত

বন্ড বিষয়ক লেখক মার্ক এডলিটজ বলেন, অ্যামাজন সম্ভবত খুব পরিচিত কাউকে নেবে না। বরং এমন কাউকে নেবে যিনি প্রতিভাবান ও অভিজ্ঞ, কিন্তু এখনো পুরোপুরি তারকা হয়ে ওঠেননি।

তার মতে, নতুন বন্ড তারকাকে নিয়ে দর্শকদের মনে আগে থেকে কোনো বদ্ধমূল ধারণা না থাকলেই ভালো। কারণ বন্ডের মধ্যে কিছুটা রহস্য থাকা দরকার

রসবোধ থাকতে হবে

পরিচালক এডগার রাইটের মতে, প্রতিটি নতুন বন্ডের সঙ্গে চরিত্রের মেজাজেও পরিবর্তন আসে।

ড্যানিয়েল ক্রেগের সময়ের বন্ড ছিল বাস্তবধর্মী ও আবেগপ্রবণ। তাই এবার হয়তো আরও হালকা, রসিক ও আকর্ষণীয় বন্ড দেখতে চান নির্মাতারা।

চিত্রনাট্যকার ব্রুস ফেয়ারস্টেইন বলেন, ‘প্রতিটি অভিনেতাকেই ভাবতে হয়—কীভাবে আমি এই চরিত্রটিকে নিজের করে তুলব?’

তার মতে, ক্রেগের সময়কার বৈশ্বিক বাস্তবতায় গম্ভীর বন্ড দরকার ছিল। কিন্তু এবার হয়তো পুরোনো দিনের আকর্ষণীয় ও মজাদার বন্ডকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।

চেহারায় থাকতে হবে নির্মমতা

বন্ডের বাইরের আকর্ষণীয় চেহারার আড়ালে এক ধরনের নির্মমতাও থাকতে হবে। মূলত এই দ্বৈত চরিত্রই তাকে আলাদা করে তোলে।

ইয়ন ফ্লেমিংয়ের উপন্যাসে বন্ড ছিলেন জুডো বিশেষজ্ঞ। পরবর্তী সিনেমাগুলোতে তার শারীরিক সক্ষমতা ও অ্যাকশন দক্ষতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

‘ক্যাসিনো রয়্যাল’ মুভিতে ড্যানিয়েল ক্রেগের পেশিবহুল সুঠাম শরীর নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছিল।

১৩টি বন্ড ছবির কাস্টিং পরিচালক ডেবি ম্যাকউইলিয়ামস বলেন, বন্ডের কাজের বিবরণীতেই 'লাইসেন্স টু কিল' লেখা আছে। দর্শক যদি বিশ্বাসই না করতে পারে যে সে খুন করতে পারে, তবে এখানেই খেলা শেষ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নৃশংসতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও নির্বিকার থাকাই বন্ডের আসল বৈশিষ্ট্য।

আলোচনার কেন্দ্রে যারা

অস্ট্রেলিয়ায় ব্রিসবেনে জন্ম নিলেও অস্কার মনোনীত তারকা জ্যাকব এলর্ডি এই অডিশনে অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন।

এ বছর ‘উদারিং হাইটস’ চলচ্চিত্রে হিথক্লিফ চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয়ের পর তিনি এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

২০২৩ সালের ‘সল্টবার্ন’ চলচ্চিত্রে এলর্ডি দেখিয়েছেন যে, একজন উচ্চশিক্ষিত ব্রিটিশ নাগরিকের মতো বাচনভঙ্গি ও আচরণে পারদর্শী তিনি।

ইয়ান ফ্লেমিংয়ের মূল উপন্যাসের বন্ডের বাবা ছিলেন স্কটিশ আর মা সুইস এবং তার শৈশব কেটেছিল বিদেশে। তাই অভিনেতার ব্যাকগ্রাউন্ডে কিছুটা অস্পষ্টতা থাকলে তা খুব একটা বড় সমস্যা নয়।

‘বুলেট ট্রেন’ ছবিতে হাস্যরসাত্মক অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন অ্যারন টেলর জনসন। একইসঙ্গে ‘টেনেট’ ও ‘টুয়েন্টি এইট ইয়ারস লেটার’ মুভিতে কঠোর চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় করেছেন তিনি। তাই নতুন বন্ড হিসেবে অ্যারন টেলর জনসনের নামও জোরালোভাবে উঠে আসছে।

কম বয়সী জেমস বন্ড হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন ২২ বছর বয়সী লুই পার্টট্রিজ। নেটফ্লিক্সের 'হাউস অব গিনেস' সিরিজে চিত্রনাট্যকার স্টিভেন নাইটের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।

২৯ বছর বয়সী হ্যারিস ডিকিনসনও একজন শক্তিশালী দাবিদার, তবে স্যাম মেন্ডেসের বিটলসের চারটি বায়োপিক নিয়ে তিনি আগামীতে বেশ ব্যস্ত থাকবেন।

বয়স কিছুটা বেশি হলেও সঠিক সীমার মধ্যে আছেন 'ওয়েস্টম্যান' খ্যাত ডেভিড জনসন ও টম ব্লিথ। তাদের বয়স ৩০ এর শুরুর দিকে এবং বন্ড হিসেবে তারা বেশ আকর্ষণীয় পছন্দ হতে পারেন।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, তুলনামূলক কম বিখ্যাত হওয়ায় আলোচনায় উঠে এসেছে ২৪ বছর বয়সী মঞ্চ অভিনেতা টম ফ্রান্সিসের নাম।

তবে বাস্তবে দক্ষতার কথা বিবেচনা করলে অ্যারন পিয়েরের নামও উঠে আসে। ৩১ বছর বয়সী এই অভিনেতা ব্রাজিলিয়ান জিউ-জিৎসু অনুশীলন করেছেন এবং ‘রেবেল রিজ’ ছবিতে তার শারীরিক গঠন ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে।

টম ফ্রান্সিস (বামে) ও অ্যারেন পিয়েরে (ডানে)। ছবি: স্টার অনলাইন গ্রাফিক্স

এখন কেন জেমস বন্ড

নতুন অভিনেতা নির্বাচনই সব নয়। নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছে ০০৭ কে আবারও প্রাসঙ্গিক করে তোলাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

চিত্রনাট্যকার ব্রুস ফেয়ারস্টেইনের ভাষায়, ‘প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—এখন কেন বন্ড?’

তিনি বলেন, আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায় যেখানে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা প্রায় নেই, সেখানে একজন গোপন এজেন্টের ভূমিকা কী? আধুনিক বিশ্বে ব্রিটেনের অবস্থান কোথায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েই নতুন বন্ডকে তৈরি করতে হবে।

হাস্যরস, মিম সংস্কৃতি ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন জেমস বন্ড কেমন হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় কৌতূহল।