সাক্ষাৎকার

ববিতার চোখে নায়ক ফারুক

শাহ আলম সাজু
শাহ আলম সাজু

স্বর্ণালি দিনের সিনেমার নায়ক ফারুক। ঢাকার সিনেমাকে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি। অনেক নায়িকার বিপরীতে জুটি বেঁধে আলোচিত হয়েছেন এবং দর্শকমহলে সাড়া ফেলেছেন। 

তার বিপরীতে অনেকগুলো সিনেমায় অভিনয় করেছেন ববিতা। 

ফারুক-ববিতা জুটির সাড়া জাগানো সিনেমা ‘নয়নমনি’, ‘লাঠিয়াল’, ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’, ‘আলোর মিছিল’।

মুক্তির সময়ে বিশেষ রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল ‘নয়নমনি’।

‘গোলাপি এখন ট্রেনে’ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও প্রশংসা পেয়েছে।

১৮ আগস্ট নায়ক ফারুকের জন্মদিন।

তাকে নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নায়িকা ববিতা।

ববিতা বলেন, ‘মাঝে মাঝে খুব কষ্ট লাগে যখন ভাবি ফারুক ভাই বেঁচে নেই। তার সঙ্গে এই জীবনে আর কখনো দেখা হবে না, কথা হবে না। তার হাসিমুখ আর কোনোদিন দেখতে পাব না, তিনি আড্ডা মাতিয়ে রাখবেন না, মন খুলে কথা বলবেন না। কেননা, তিনি তো পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন। তার চলে যাওয়ার কথা ভাবতেই খারাপ লাগে।’

শিল্পী হিসেবে নায়ক ফারুক কেমন ছিলেন, তা বলতে গিয়ে ববিতা বলেন, ‘বড় মাপের শিল্পী ছিলেন ফারুক ভাই। বড় মাপের শিল্পী তো বটেই, বড় মনের মানুষও ছিলেন। গ্রামের চরিত্রে তিনি দারুণভাবে মানিয়ে যেতেন। মনে হতো তিনি বুঝি সত্যি সত্যি গ্রামের মানুষ। গ্রামীণ গল্পের সিনেমায় তিনি ছিলেন অতুলনীয়। যা কল্পনাতীত। গ্রামনির্ভর গল্পের সিনেমা করে ভীষণ সুনাম অর্জন করেছিলেন এবং তার অভিনীত সেইসব সিনেমার আবেদন এখনো রয়ে গেছে।’

ফারুকের সঙ্গে শুটিং করার স্মৃতিগুলো এখনো মনে রেখেছেন ববিতা। সেইসব দিনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এমনও হয়েছে আমরা একসঙ্গে ৩–৪টি সিনেমার শুটিং করতে গিয়েছি। একটি সিনেমার শুটিং শেষ করে নতুন কোনো গ্রামে গিয়ে আরেকটি নতুন সিনেমার শুটিং করেছি। নবগ্রাম নামে একটি গ্রামের নাম আজও মনে আছে। ওই গ্রামে আমি ও ফারুক ভাই শুটিং করেছি। দিনের পর দিন ওই গ্রামে থেকেছি। এরপর একটি সিনেমার পুরো কাজ শেষ করে মানিকগঞ্জে গিয়ে আরেকটি সিনেমার শুটিং শুরু করেছি। এভাবেই শুটিং করেছি আমরা দুজনে।’

ববিতা বলেন, ‘আমি ও ফারুক ভাই “গোলাপি এখন ট্রেনে” সিনেমার শুটিং করেছিলাম মানিকগঞ্জে। ওখানে একটি ডাকবাংলোয় আমরা থাকতাম। প্রচণ্ড শীতে নদীর পাড়ে গিয়ে রাতেরবেলা শুটিং করেছি। এতটাই শীত ছিল যে মোটা কাপড় পরার উপায় ছিল না। কেননা, সিনেমায় যে শাড়ি পরে শুটিং করব, তা পরেই শীতের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো, শুটিং করতে হতো। একটি ভালো সিনেমার জন্য ফারুক ভাই অনেক কষ্ট করেছেন, অনেক পরিশ্রম করেছেন। এজন্যই বলি, ফারুক ভাই বড় মাপের শিল্পী ছিলেন।

ফারুকের বিয়ের স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে ববিতা বলেন, ‘ফারুক ভাই বিয়ে করার পর তার বাসায় একদিন নিমন্ত্রণ খেতে যাই। আমি, সুচন্দা আপা, চম্পাসহ গিয়েছিলাম। খুব অতিথিপরায়ণ ছিলেন তিনি। এরপর ভাবীসহ আমার বাসায়ও নিমন্ত্রণ করেছিলাম। তার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক ছিল এবং অনেক ভালো সম্পর্ক ছিল। তার চলে যাওয়াটা আসলেই কষ্টের। ভাবতে পারিনি এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন।’

তিনি বলেন, ‘সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা করার সময় কিছু ভিডিও দেখেছিলাম ফারুক ভাইয়ের। তখন আশায় বুক বেঁধেছিলাম। ভাবতাম, তিনি ভালো হয়ে ফিরে আসবেন আমাদের সবার মাঝে। কিন্তু, তা তো হলো না। তার সঙ্গে স্মৃতিগুলো ভুলবার মতো নয়। সবসময় মনে পড়বে।’

ববিতা আরও বলেন, ‘আলোর মিছিল সিনেমায় শুটিং করার কথা মনে পড়ছে। এতগুলো সিনেমা করেছিলাম আমরা একসঙ্গে। আরও কত সিনেমা করেছি। ওই সিনেমার কথা মানুষ এখনো মনে রেখেছেন। এখনো অনেকে আলোর মিছিল সিনেমা দেখেন। কেউ কেউ আমাকে এখনো সিনেমাটির কথা বলেন।

সেই সময়ে নায়ক-নায়িকার সিনেমা হলে যাওয়ার কথা বলতে গিয়ে ববিতা বলেন, ‘দেখুন, তখন একজন নায়ক সিনেমা হলে যেতে পারতেন। ফারুক ভাই পারতেন। তারপরও ভিড় হতো খুব। কিন্তু একজন নায়িকা হিসেবে আমার কিংবা অন্য কারও হলে যাওয়া কষ্টের ছিল। কারণ, মানুষ চিনে ফেলবে, ভিড় করবে। তখন হলে গিয়েছি বোরকা পরে। আলাদাভাবে যেতাম। ফারুক ভাই হয়তো একভাবে যেতেন, আমি হয়তো বোরকা পরে যেতাম। বোরকা পরে না গেলে ভক্তরা পাগল করে দিত।’

‘সেই সময় সিনেমা মুক্তির আগে এফডিসিতে একটা শো হতো। যেখানে সিনেমার শিল্পী ও কলাকুশলীরা থাকতেন। পরিচালক-প্রযোজক থাকতেন। ফারুক ভাই এবং আমি অভিনীত সিনেমাগুলো মুক্তির আগে এফডিসিতে ওই শো দেখতাম। এত সুন্দর সুন্দর সিনেমার নায়ক ছিলেন তিনি। যা তাকে বছরের পর বছর নায়ক হিসেবে বাঁচিয়ে রাখবে’, যোগ করেন ববিতা।

সবশেষে ববিতা বলেন, ‘ফারুক ভাই যেখানে আছেন, শান্তিতে থাকুন। জন্মদিনে তার প্রতি ভালোবাসা এবং প্রার্থনা।’