‘তোমার ওপর খুব রাগ হয়, কেন অভিনয় করো না?’

শাহ আলম সাজু
শাহ আলম সাজু

টেলিভিশন নাটকের একসময়ের জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী তনিমা হামিদ এখন পুরোপুরি মনোযোগী শিক্ষকতায়। প্রায় দেড় দশক ধরে অভিনয় থেকে দূরে থাকা এই শিল্পী বলছেন, ছেলে ও পেশাগত দায়িত্বের কারণেই তিনি অভিনয় কমিয়ে দিয়েছেন। সেইসঙ্গে শিক্ষকতা জীবনে তিনি আনন্দ খুঁজে পেয়েছেন।

নব্বইয়ের দশক ও পরবর্তী সময়ে টেলিভিশন নাটকের পরিচিত মুখ ছিলেন তনিমা হামিদ। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা এই অভিনেত্রী দীর্ঘ সময় ধরে নাটকে নিয়মিত অভিনয় করেছেন। বিশেষ করে বিটিভির বিভিন্ন নাটকে তাকে নিয়মিত দেখা যেত। সাহিত্যনির্ভর নাটকেও ছিল তার উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি।

বর্তমানে তিনি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করছেন। প্রায় ১৫ বছর ধরে নাটকে নিয়মিত নন। ২০১০ সালে ছেলের জন্মের পর থেকেই অভিনয় কমিয়ে দেন। ২০১৯ সালের পর আর কোনো নাটকেই কাজ করেননি।

তনিমা হামিদ
তনিমা হামিদ। ছবি: শেখ মেহেদী মোরশেদ/স্টার

অভিনয় থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তনিমা হামিদ বলেন, ‘মূল কারণ আমার ছেলেকে সময় দেওয়া। এ জন্যই অভিনয় কমিয়ে দিই।’

শিক্ষকতা পেশা নিয়ে তিনি বলেন, ‘খুব উপভোগ করছি। উপভোগ না করলে এত বছর থাকা হতো না। যে কাজটি ভালো লাগে, সেটিই করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা খুব এনজয় করছি।’

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন তিনি বলেন, ‘এত চমৎকার শিক্ষার্থী পেয়েছি, বলে শেষ করা যাবে না। ওদের সঙ্গে আমার সম্পর্কটাও ভালো। ১০ বছর আগের শিক্ষার্থীও আছে, অনেকে বিদেশে আছে, কিন্তু মাঝে মাঝে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে। কী যে ভালো লাগে।’

শিক্ষকতা জীবনের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এমনও হয়েছে আমার কোনো শিক্ষার্থী চাকরি পেয়েছে, প্রথম বেতন পেয়ে মাকে একটা শাড়ি কিনে দিয়েছে এবং আমার জন্য দুল কিনে নিয়ে এসেছে। আমি না করার পরও করেছে। এই অনুভূতিগুলো সুন্দর, অনুভূতিগুলো সুখের।’

একসময়ের জনপ্রিয় এই অভিনেত্রীকে অনেক শিক্ষার্থী শুরুতে অভিনেত্রী হিসেবে চিনতে পারে না বলে জানান তনিমা হামিদ।

বলেন, ‘আমি অনেক বছর ধরে নিয়মিত অভিনয় করি না। অনেক শিক্ষার্থী প্রথমে তো আমাকে অভিনেত্রী হিসেবে চিনতে পারে না। পরে জানতে পেরে ইউটিউবে আমার নাটক খুঁজে বের করে দেখে। ওদের বাবা-মার কাছে আমার কথা বলে। তখন দেখা যায় যে তাদের বাবা-মা আমার নাটক দেখেছেন।’

তিনি বলেন, ‘একদিন একজন ছাত্র এসে বললো, “ম্যাম, আপনার নাম পরিচিত লাগে। তারপর বাসায় বলার পর দেখি মা-বাবা আপনাকে চেনেন। আপনার অনেক নাটক তারা দেখেছেন। আমিও ইউটিউবে আপনার নাটক দেখেছি।”’

তনিমা হামিদ
একটি নাটকের দৃশ্যে তানিমা হামিদ ও শাহেদ শরীফ খান। ছবি: সংগৃহীত

তনিমা হামিদের অভিনয় জীবন শুরু মঞ্চে। ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি নিয়মিত মঞ্চে অভিনয় করেছেন। টেলিভিশন নাটকে দেখা না গেলেও মঞ্চে তিনি সক্রিয় ছিলেন।

তার নাট্যদলের নাম ‘নাট্যচক্র’। জন্মের মাত্র আড়াই বছর বয়সে প্রথম মঞ্চে অভিনয় করেন তিনি। নাটকটির নির্দেশক ছিলেন তার বাবা ম হামিদ। পরে বড় হয়ে আলোচিত ‘ভদ্দরলোক’ নাটকে অভিনয় করেন। নাটকটির নির্দেশনা দেন গোলাম সরোয়ার।

মঞ্চে বাবার সঙ্গে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তনিমা হামিদ বলেন, ‘“ভদ্দরলোক” নাটকে বাবার সঙ্গে অভিনয় করেছি মঞ্চে। উনার মেয়ের চরিত্রেই অভিনয় করি। সেসময় বেশ নার্ভাস ছিলাম। বহু বছর পরও বাবার সঙ্গে মঞ্চে অভিনয় করে নার্ভাসই হই। বাবা অসাধারণ একজন অভিনেতা। বাবা ভয়ংকর ভালো অভিনয় করেন। বাবা সারাজীবন বিটিভিতে, নিমকোতে, এফডিসিতে চাকরি করেছেন। আর মঞ্চে সময় দিয়েছেন।’

মঞ্চে তনিমা হামিদের আলোচিত নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ভদ্দরলোক’, ‘লেট দেয়ার বি লাইট’, ‘বিলকিস বানুর কন্যারা’ ও ‘হায়েনা’। এছাড়া ‘একা এক নারী’ নাটকে একক অভিনয়ও করেছেন তিনি।

তনিমা হামিদ
তনিমা হামিদ। স্টার ফাইল ছবি

অভিনয়ের ব্যস্ত দিনগুলো, লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের পরিবেশ মিস করেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তনিমা হামিদ বলেন, ‘মানুষ অভ্যাসের দাস। অভিনয় নিয়মিত করতে না পেরে মিস করি, তা না। শুরুর দিকে মিস করতাম। এখন করি না। তবে কখনো কখনো চমৎকার কিছু কাজ দেখে মিস করি। যা মিস করি তা হচ্ছে, চমৎকার কাজের অভিনয় মিস করি।’

সমসাময়িক সহশিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘খুব বেশি নেই। সবাই যার যার পেশায় ব্যস্ত। সহশিল্পীদের সঙ্গে সেভাবে দেখা হয় না, যোগাযোগও নেই। দীপা খন্দকারের সঙ্গে মাঝেমধ্যে ফোনে কথা হয়। দীপার সন্তান ও আমার সন্তান একই প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করে। সেজন্য যোগাযোগটা বেশি হয়, তাও ফোনে।’

দর্শকদের কাছ থেকে এখনও ব্যাপক সাড়া পান বলেও জানান তনিমা হামিদ। বলেন, ‘প্রচুর সাড়া পাই মানুষের কাছ থেকে। একবার এয়ারপোর্টে সিনিয়র এক দম্পতি বললেন, “তোমার অভিনয় খুব মিস করি। কেন নিয়মিত অভিনয় করো না?”’

আরেকটি ঘটনা তুলে ধরে বলেন, ‘একদিন বাবার সঙ্গে মার্কেটে গিয়েছি। মাস্ক পরা আমি। এক ভদ্রমহিলা কাছে এসে হাত ধরে বললেন, “তুমি কি তনিমা? তোমার চোখ এত পরিচিত! চিনে ফেলেছি। তোমার ওপর খুব রাগ হয়, কেন অভিনয় করো না? কত নাটক দেখেছি তোমার! কত মিস করি তোমার অভিনয়?” এমন বহু উদাহরণ আছে।’

ক্যারিয়ারে মা-বাবার অবদান সম্পর্কে জানতে চাইলে তনিমা হামিদ সংক্ষেপে বলেন, ‘শতভাগ অবদান মা-বাবার।’